রবিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৪

এ দিল মাঙ্গে মোর




এক,
দুই,
তিন,
...
একশো। মানে একশো টাকা। অর্থাৎ মাসের এই শেষ দিনটাতে কুন্তল স্যারের ব্যাচে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই একশোটা টাকাই সম্বল। না, তার মানে এই নয় যে স্যারের মাইনে বাবদ সে এই টাকাটা নিয়ে যাচ্ছে। তার বন্ধুসার্কেলে টিকে থাকতে গেলে আজ টাকাটা জরুরী। ভীষণ জরুরী।
আসলে হয়েছে কি, অভিলাষের স্কুলে একটা বন্ধুগ্রুপ আছে। প্রতি মাসে প্ল্যান থাকে – তাদের মধ্যে যে কোন একজন মাসের শেষে অন্য বন্ধুদের খাওয়াবে। এই হিসাবে প্রত্যেক মাসেই চিকেন চাউ, ফিশফ্রাই, মোগলাই, এমনকি সেদিন তো বিরিয়ানিও সাঁটানো হয়ে গেল। হাবিব খাইয়েছিল সেবার। ওদের মহরম ছিল, সেই উপলক্ষেই...
কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই খাওয়ানোর পেছনে ওদের সব বন্ধুদের পকেট থেকেই বেশ কিছু খসলেও একজন এ ব্যাপারে মারাত্মক কঞ্জুস। সে আর কেউই নয়, এই অভিলাষ। ও ব্যাটা কিছুতেই খাওয়াবে না। আজ বলে, টাকা, নেই। সামনের মাসে খাওয়াব। আবার সামনের মাস এলে বলে, বাবাকে টাকা দিতে রাজী করানো গেল না। সবকিছু দেখেশুনে ছিটকিনি তাই গত সপ্তাহেই ডেডলাইন দিয়েছিল। পড়ার শেষে বেরোবার পথে কোন উপমা ছাড়াই সেদিন স্রেফ বলে দিল, ‘দেখ নেতাজী, তুই যদি এ মাসে আমাদের খাওয়াতে পারিস তো ভাল। নইলে এবারও যদি তো ঐ হ্যানাত্যানা বাহানা দেখি তবে তোর গোঁফটাই আমি কেটে নেবে’। কথা বলেই অন্যদের সাথে সে হো হো করে হেসে উঠেছিল। আর অভিলাষ পড়ল মহাবিপদের। তার বাবার কড়া হুকুম, তাকে গোঁফ রাখতেই হবে। নইলে এতদিন পর্যন্ত কি এর অস্তিত্ব বজায় রাখত সে? মরিয়া হয়ে তার বলতে ইচ্ছা হয়, ‘আরে তোরা আমার কথা বুঝিস না কেন? বাড়ি থেকে টাকে পেতে তো তোদের কোন অসুবিধাই নেই, এমনকি তোরা মাসকে মাস হাতখরচাও পাস। কিন্তু আমার যে সে সুযোগই নেই’। কিন্তু ওসব বলতে গিয়েও সে বলল না, কারণ সে জানে ওসব অজুহাত দেখিয়ে ওদের কাছে থেকে পার পাওয়া যাবে না। সে তাই মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলে, ‘খাওয়াব, খাওয়াব, নিশ্চয়ই খাওয়াব’। ছিটকিনি আগের মত কড়া হয়েই বলতে থাকে, ‘হ্যাঁ, খাওয়াবি না মানে? মাসের শেষে তোর হাতে যদি টাকা না দেখি তবেই...’ ‘ঘ্যাঁচ’ করে মুখ থেকে একটা শব্দ করে ছিটকিনি।
যদিও আজ টাকা এনেছে অভিলাষ। এদিকে ছিটকিনিও পড়তে আসেনি আজ। তবুও আরো তিনজন তো আছে। একশোটা টাকা হাতে। কম হয়ে গেল না তো? ভাবতে থাকে সে। কুন্তল স্যারের পড়ানো শুনে সবারই কেন জানি না ঘুম পায়। অন্যদিন হলে তো চার-পাঁচটা হাই তুলত অভিলাষও। কিন্তু আজকে তার ভাবনা অন্যদিকে।
অবশেষে মিলল স্বস্তি। কুন্তল স্যারের পড়া মিটল। ছুটির পর বাইরে বেরিয়ে সাইকেলটা নিতে যাচ্ছে অভিলাষ। হ্যাণ্ডেলটা চেপে ধরল বোগাস। ‘আগে টাকা বের কর, তারপর চ খাওয়াবি’। বিতান যেন একেবারে হামলে পড়ে। অভিলাষ পকেট থেকে একশোটা টাকা বের করে দিতেই অনিকেত বলে – ‘থ্যাঙ্কু। চ এবার টিফিন টাইমে যাই’।

সেদিন বাড়ি পৌছে এতসব কথা মাকে কিংবা বাবাকে বলেনি অভিলাষ। বাড়ি থেকে যে একশোটা টাকা দিনে দিনে জমিয়ে সে আজ ফুর্তি করেছে – একথাটা গোপন না করে অবশ্য তার উপায়ও ছিল না। বাড়ি ফিরে আর দিনের মতই পড়ার ব্যাগটা টেবিলে রেখে বইগুলো বার করে সে। বইগুলো গুছিয়ে জামাকাপড় পাল্টাতে বাথরুমে ঢোকে; কিন্তু টের পায় অনুভূতিগুলো যেন অন্যদিনের মত নয়। একটা আড়ষ্টতা, ভয় ভয় ভাব তার মধ্যে কাজ করে চলে নিরন্তর। বাথরুমে একটা বিরাট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে; নিজের প্রতিবিম্ব তাতে। কিন্তু ওকে দেখতে ইচ্ছে করছে না আজ। ও পাপী, ও চোর। হোক সে চুরি মাত্র একশো টাকার। তবু...
একটা দুশ্চিন্তা অভিলাষের সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে থাকে ধীরে ধীরে। এভাবে বাড়ি থেকে না বলে কয়ে কোনদিনও টাকা নেয়নি সে। ‘কি-ই বা হবে নিলে?’ – এমন এক অগ্রাহ্যতা নিয়েই এ টাকাগুলো নিয়েছিল। কিন্তু কাজটা কি ঠিক হল? বুঝতে পারে না সে। কয়েকটা শব্দ তার মাথার মধ্যে ভনভন করতে থাকে। টাকা, চুরি, একশো, চোর... ওফফফ। নাঃ। আর পারা যাচ্ছে না। নিজেরই যেন খেয়াল নেই, বাথরুম ছেড়ে সে কখন চেয়ার টেবিলে বসে পড়েছে। সামনে ফিজিক্স বই খোলা। কাল তাপস স্যার পরীক্ষা নেবে। তাই এখন এই সময়ে ভাল করে পড়া দরকার। কিন্তু কিভাবে সে পড়ায় মন দেবে এখন? মন এখন বিস্রস্ত, বিভ্রান্ত। একটা অপরাধবোধ...
কিন্তু এই অপরাধবোধের কি কোন মূল্য আছে? এ যে কাজ করেছে তা তো সে জেনেবুঝেই করেছে। বরং বলা যায় কিছুটা বিদ্রোহের জেরেই করেছে। বিদ্রোহ? হ্যাঁ, তারও বিশেষ কারণ আছে। তবে তার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে বেশ কয়েকটা মাস আগে।




ভাটপাড়ার কুল অমরকৃষ্ণ পাঠশালা। ক্লাস ইলেভেনের তখন অফ পিরিয়ড চলছে। আর অফ পিরিয়ড মানেই তো হো হো, হা হা, হি হি, চিৎকার-চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়। ওদিকের বেঞ্চগুলোয় গানের কম্পিটিশন হচ্ছে। কিঞ্জল, বিকাশ, তরুণ ‘তুনে মারি এন্ট্রি’ সুরে মজেছে, আর ওদিক থেকে রাহুল তাদের সাথে বেঞ্চে ‘সঙ্গত’ দিচ্ছে। মৃণাল, সন্তু মাঝে মাঝেই ফটাস্‌ ফটাস্‌ শব্দে হাততালি মারছে, কমেন্ট দিচ্ছে। আর একজন স্যারের টেবিলের ধারটা চক দিয়ে সাদা করে রাখছে। আসলে এরপর বিতান স্যারের ক্লাস, তিনি পড়ানোর সময় ঐ টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ান। ফলে...। ইতিমধ্যে দুইদিন ওরা এইভাবে স্যারের কালো প্যান্টে সাদা চকের দাগ লাগিয়ে দিয়েছে। আজ লাগাতে পারলে হ্যাট্রিক হবে।
কিন্তু এর মধ্যেও অভিলাষ বেশ বইয়ে বুঁদ হয়ে আছে। তবে পড়ার নয়, গল্পের বইয়ে। পাশ থেকে আলি একবার উঁকি মারে, ‘কি বই পড়ছিস রে, নেতাজী?’ অভিলাষ বইটা বন্ধ করে। বইয়ের কভারে নাম লেখা – ‘আরো সত্যজিত’। বইটা বেশ পুরোনো হলেও এর চকচকত্ব বেশ বজায় আছে। তাই দেখে আলির প্রশ্ন, ‘নতুন বই মনে হচ্ছে। মাধ্যমিকের পর গিফট পেয়েছিস বুঝি?’ মাথা নাড়ায় অভিলাষ। আলি বলে, ‘মাধ্যমিকের পর কি গিফট পেলি তাহলে?’ আবার মাথা নাড়ায় সে। আলি এবার অবাক হয়, বলে, ‘সে কি রে? মাধ্যমিকে স্কুলের থেকে ফার্স্ট হলি। নাইন্টি পার্সেন্টের ওপর তোর মার্ক্স। তবুও...’ অভিলাষ কোন উত্তর করে না। চোখদুটো তার গল্পের বইয়ের অক্ষরে পড়ে রয়েছে তখনও।
কিন্তু মন টালমাটাল। সত্যিই তো কথাগুলো তো কিছু খারাপ বলেনি আলি। সে মাধ্যমিকে যে নম্বর পেয়েছে তাতে তো তার বাড়ি থেকে গিফট পাওয়ার কথাই ছিল। বিশেষত যখন তার বাবা মা দুজনেই তাকে এ ব্যাপারে কথা দিয়েছিল। তারা যে বলেছিল মাধ্যমিকে স্কুলে থার্ড পজিশনের মধ্যে থাকতে পারলে তাকে এমপি থ্রি আইপড দেওয়া হবে। তারা কি সে কথা ভুলে গেল? রেজাল্ট বেরিয়েছে তো দুমাস হয়ে গেল। মা বাবা তো একবারের জন্যও তার সামনে গিফটের প্রসঙ্গ তোলেনি। এটা কি ইচ্ছাকৃত নাকি সত্যিই তারা ভুলে গেছে? চাইতে যে বড্ড খারাপ লাগে অভিলাষের। না হলে সে নিশ্চয়ই চাইত।
আলির কথায় চমক ভাঙে তার। আলি বলে, ‘এই শোন, একটা কথা আছে’। অভিলাষ আলির দিকে তাকায়। আলির চোখটা জ্বলজ্বল করছে। ‘আমি না একটা দারুণ গিফট পেয়েছি। কিন্তু সে কথা কাউকে এখন বলবি না। গিফটটা আমার ঠাকুমা আমাকে দিয়েছে। এখন বলব না সেটা কি। তবে এটা এখনও কেউ জানে না। শুধু তুই, হ্যাপি আর ছিটকিনি ছাড়া’। অভিলাষ মুচকি হাসে, তারপর মৃদু হেসে বলে, ‘কেন তুই জানিস না?’ বলেই ফিক করে হেসে ফেলে।

পরের দিন তখন ছুটির সময় হয়ে এসেছে প্রায়। আর এই স্কুলে ইলেভেনে তো সায়েন্সের ছেলেরা প্র্যাকটিকাল হওয়ার দিনগুলোতেই শুধু স্কুলে আসে। প্র্যাকটিকাল হয়ে গেলেই কেটে পড়ে। সেদিন আবার প্র্যাকটিকাল হয়ওনি। স্যার আসেনি সেদিন। তাইতে ছেলেদের পোয়াবারো। তারা টিফিন হতেই গুটিগুটি পায়ে কেটে পড়েছে স্কুল থেকে। ক্লাসঘরের শেষ বেঞ্চের এক কোণে তখন ওরা চারজন মাত্র রয়েছে – আলি, হ্যাপি, ছিটকিনি আর অভিলাষ।
আলি ব্যাগের চেনটা খুলতে খুলতে বলে, ‘যেটা তোদের দেখাব বলেছিলাম’। এই বলে সে ব্যাগ থেকে একটা অ্যাণ্ড্রয়েড ফোন বার করে দেখায়। সবাই চমকে ওঠে। হ্যাপি বলে, ‘আরিব্বাস! দারুণ তো সেটটা। ইস্‌ তোর ঠাকুমা কি ভাল রে’। ছিটকিনি বলে, ‘গান আছে?’ আলি সিকিউরিটি লক ওপেন করতে করতে বলে, ‘সব আছে’। হ্যাপি বলে, ‘বাংলা কি কি আছে?’ ‘রূপম, রূপঙ্কর, নচিকেতা, সুমন, শ্রেয়া, শুভমিতা’ একটানা গড়গড় করে বলে যায় আলি। ইতিমধ্যে ভিডিওস’ ফোল্ডারটা বেরিয়ে পড়তেই ওরা হাঁ হাঁ করে পড়ল। ছিটকিনি বলে, ‘দেখি দেখি কি কি ভিডিও আছে?’ আলি ফোল্ডারটা ক্লোজ করে দেয় সাথে সাথে। বলে, ‘দেখাচ্ছি পরে’। হ্যাপি বলে, ‘দেখলি ফোল্ডারটা দেখতে দিল না। তার মানে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। বল কি আছে?’ আলি চুপ করে থাকে। প্রসঙ্গ পালটে ছিটকিনি বলে, ‘নেট সাপোর্ট করে?’ ওরা কথা শুনে আলি বলে, ‘নেট সাপোর্ট করবে? তাও আবার আমার মোবাইলে? করত অবশ্য, তবে বাবা কনফিগারেশন পালটে দিয়েছে। এখন আর নেট খোলা যায় না’। হ্যাপি বলে, ‘ঠিক হয়েছে। নেট থাকলে তো এক্ষুণি ল্যাংটো মেয়ের ছবি দেখতিস’। হো হো করে হেসে ওঠে সবাই। তবু অভিলাষ প্রাণখুলে এই হাসিতে যোগ দিতে পারে না। পড়তে হবে’ বলে বেরিয়ে আসে সে স্কুল থেকে।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে এ ভাবে সবাই সুখী। একমাত্র সে ছাড়া। আলির কথা ছেড়েই দিলাম। হ্যাপির বাড়ি থেকেও সে হাতখরচার টাকা পায়। ও তাই দিয়ে বন্ধুদের বেশ এটা ওটা সেটা খাওয়ায়। আর ছিটকিনির বাইতে তো ও নিজে একটা ট্রাঙ্কই আছে। সেখানে সে নিজের নানা ব্যক্তিগত জিনিস কিনে জমায়। ওরা প্রত্যেকেই কিছু না কিছু গিফট পেয়েছে বাড়ি থেকে। হ্যাপি পেয়েছে হোম থিয়েটার। ও তাতে গান শোনে, সিনেমা দেখে। ছিটকিনি পেয়েছে কম্পিউটার। ওরা সবাই সেসব বন্ধুদের গর্ব করে দেখিয়েছে। কিন্তু সেখানে অভিলাষের কিছুই নেই দেখানোর মত। কেন? সে ত ওদের থেকে মাধ্যমিকে অনেক বেশি নম্বর পেয়েছে। সেই হিসেবে তারই তো ভাল জিনিস পাওয়ার কথা। কিন্তু ভাল জিনিস তো দূরস্থ, কিছুই পায়নি সে। ইস্‌ ছিটকিনির মত যদি তারও বাড়িতে একটা অমন ট্রাঙ্ক থাকত তবে সে কিশোরকুমারের গানের সিডি আর সত্যজিতের বইয়ে ভরিয়ে রাখত। কিন্তু এইভাবে সে ইচ্ছেগুলোকে কতদিন দমন করে যাবে? আর নয়, এবার চাইতে হবে। নিজের জন্যই চাইতে হবে তাকে। কাজটা ভাল হোক, খারাপ হোক যাই হোক না কেন। পিছিয়ে এলে চলবে না। সে ঠিক করল আজই সে মাকে বলবে। তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি তাকেই মনে করিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া এই কষ্ট থেকে বেরোনোর আর কোন পথ খোলা নেই তার সামনে।



পুরনো দিনের কথাগুলো মনের পরতে পরতে ভেসে ওঠে অভিলাষের। ভাবতে ভাবতে নিজের ভেতর তৈরি হওয়া অপরাধবোধটা অনেকখানি প্রশমিত হয়ে আসে। সে তার ‘চুরি’র পেছনে কারণ খুঁজে পায় এখন। যাকে সে যৌক্তিক বলেই মনে করে।
ইতিমধ্যে মা এসে ঢুকল ঘরে। ‘কি রে, বসে বসে কার ধ্যান করছিস?’ মা সবসময়ই খিঁচিয়ে কথা বলে। বড্ড বিরক্ত লাগে তার। মা বলে চলেছে, ‘স্যারের বাড়ি থেকে ফিরলিই তো ন’টায়। নাকি আজও আবার ঐ সব পিণ্ডি গেলন হয়েছে?’ অভিলাষ মাথা নাড়িয়ে জানায় – ‘হ্যাঁ’। সে আজ টিফিন টাইমে বন্ধুদের সাথে ফিশ ফ্রাই খেয়েছে। মা সেকথা শুনে তো রাগে অগ্নিশর্মা। ‘সত্যি বাবা, ভালই আছিস। এই ছেলে কিনা একবছর বাদেই হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে। ক্লাস সেভেন-এইটের ছেলেরাও বোধহয় পড়ায় এত ফাঁকি মারে না। সত্যি, যা পারিস কর। আর পরীক্ষায় গোল্লা নিয়ে আয়’।
প্রত্যেকদিন এই এক কথা শুনতে শুনতে অভিলাষের কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। দিনরাত শুধু এই এক কথা। একই ভাবে, একই ঢঙে। মাথাটা ঝাঁ ঝাঁ করে তার। অসহ্য লাগে। খানিক বাদে বকেঝকে মা চলে গেলে অভিলাষের সেই অপরাধবোধ তখন কোথায় হাওয়া। বরং তার জায়গায় ভিড় করে দাঁড়িয়েছে একরাশ বিরক্তি, ক্ষোভ।
একমূহুর্ত শান্তি নেই তার। সবসময় পড়াশুনো করতে হবে। যখন খেলার সময়, তখন তার সময় নেই, কারণ পড়াশুনো। যখন গল্পের বই পড়া কিংবা গান শোনার সময় তখন তার সময় নেই, কারণ পড়াশুনো। বন্ধুদের সাথে দুটো গল্প করবারও সময় তার নেই, তারও কারণ বাঞ্চোত পড়াশুনো। সবজায়গায় এই পড়াশুনো। ওফ্‌। মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে অভিলাষ। সামনে টেবিলে বই খোলা, সে ভাবছে। অপরাধ তো তার কিছুই নেই। সে তো ঠিকই করেছে। বন্ধুদের সাথে ফুর্তি করেছে, টাকা চুরি করেছে বেশ করেছে। এরপর আরো বেশি টাকা জোগাড় করবে সে। তারপর সামনের মাসে বিরিয়ানি খাবে সবাই মিলে। এক ঐ হাবিব ছাড়া আর কেউ বিরিয়ানি খাওয়াতে পারেনি। সে হাবিবের চাইতে আরো দামী বিরিয়ানি খাওয়াবে। বন্ধুদের সে তাক লাগিয়ে দেবে। মা বাবা যেমন তাকে কোনদিনও আনন্দ করতে দেবে না। সেও ঠিক করল সে তার নিজের পথ নিজের তৈরি করে নেবে।



এবার আমরা আবার ফিরে যাব সেই দিনটায় যেদিন অভিলাষ ভেবেছিল সে তার মা বাবার কাছ থেকে আইপড গিফট চাইবে। মাধ্যমিকের পর তাকে এটা উপহার দিতেই হবে।
সেদিন সন্ধেবেলায় শ্যামল এসেছিল। শ্যামল অভিলাষের বাবা পীযুষের ছোটবেলাকার বন্ধু। দুজনে একই পাড়ায় থাকত। একই স্কুলে পড়া, তারপর কলেজে ঢুকে দুজনের ‘দুটি পথ দুটি দিকে’ গেল বেঁকে। শ্যামল ইংলিশে অনার্স নিয়ে পড়তে চলে গেল দিল্লী ইউনিভার্সিটি আর পীযুষ বাংলা নিয়ে এই বাংলাতেই পড়ে রইল। যদিও কালচক্রে দুজনেই এখন বিদ্যাসাগর কলেজের প্রফেসর, তবে ইতিমধ্যে অনেক জলই গড়িয়ে গেছে। তা যাক, বন্ধুত্ব এখনও এমনই অটুট যে শ্যামল ওদের বাড়িতে এসে মনেই হয় না কোন অতিথি এসেছে। যেন বাড়ির লোক কয়েকদিন বাইরে গেছিল, আবার ফিরে এসেছে।
তো সেদিন পীযুষের কথা শুনে শ্যামল তো অবাক। সে বলে ওঠে, ‘সে কি রে কিছুই দিসনি? সত্যি তুই পারিসও’।
পীযুষ বলে, ‘না, না ওসব দেওয়া থোওয়া আবার কি? বেশি করলেই মাথা বিগড়ে যাবে। কই, আমাদের সময়ে তো এসব কিছু দেখিনি। আর এখনই যত...’ বলতে বলতে চা এসে গেল। সঙ্গে ফুলুরি। নীলা চায়ের প্লেটটা টিপয়ের ওপর রাখে। তারপর মুচকি হেসে শ্যামলকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘এরপর আপনি বাড়িতে এলে কিন্তু আর ঢুকতে দেব না’। শ্যামল বলে, ‘কেন? মহারাণীর কোন আজ্ঞাটা অধম পালন করেনি?’
নীলা কৃত্রিম রাগের সুরে বলে, ‘কেন মনে নেই? কতদিন বলেছি দিদিকে আর পুকাইকে নিয়ে আসবেন একদিন? এরপর ওদের দেখলে তো আর চিনতেই পারব না’।
শ্যামল জিভ কেটে বলে, ‘ও হো হো। সত্যিই তো, কিন্তু মুশকিলটা কি জানেন, পুকাইয়ের তো সামনের বছরই মাধ্যমিক। তাই...’
নীলা ওর কথা ফুরোতে দেয় না, ‘না না। ওসব শুনছি না। কবে নিয়ে আসবেন বলুন তো? আর পরীক্ষা তো আমার ছেলেরও রয়েছে। কিন্তু তাই বলে আমরা তো বাহানা করি না। গতবছরও তো আমার ছেলের মাধ্যমিক ছিল। কিন্তু আমরা তো সবাই মিলে বেশ আপনাদের বাড়ি গেছিলাম’।
শ্যামল বলে, ‘আপনার ছেলের মত যদি আমার ছেলে হত, তাহলে কি আর কোন চিন্তা থাকত? কিছুতেই বই নিয়ে বসবে না। ইতিহাসটায় কাঁচা। তবু কিছুতেই পড়বে না। কি যে ঝামেলায় পড়েছি’।
শ্যামলের কথায় কিছুটা গর্ব অনুভব করেও পীযুষ বলে, ‘ও সবই সমান। আমার ছেলেও তো কিছুতেই ভূগোল বই নিয়ে বসতে চাইত না। ঐ জন্যেই রেজাল্টেও টাঁয়টুঁয়ে লেটারটা জুটেছে’।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। তারপর নীলা বলে, ‘তারপর ইংরেজিটা কেমন করছে ছেলে?’ আসলে অভিলাষকে ইংরেজি পড়ায় শ্যামল। যদিও অভিলাষ তার কাছে ভর্তি হত না। কারণ প্রথমদিকে শ্যামল কিছুতেই টাকা নেবে না। আর মাইনে না দিয়ে পীযুষও তার ছেলেকে পড়াবে না। এই ভেবে সে একদিন শ্যামলকে বলেই দিল, ‘পড়াতে যখন পারবিই না, তখন বলে দে, এখানে ভাল ইংরেজির টিচার কে আছে?’ শ্যামল তাতে বাধ্য হয়েছিল তার ফি নিতে। নীলার কথা শ্যামল তাকে আশ্বস্ত করে বলে, ‘দাঁড়ান, দাঁড়ান। সবে তো ছেলেটা মাধ্যমিক দিল। এখনই কি আর বোঝা যাবে? ওকে একটু ভাল করে বোঝাতে হবে। আসলে সিলেবাসটা খুব বড় তো। তবে ওর যা ব্রেন তাতে ও...’
নীলা বাধা দিয়ে ওঠে, ‘হ্যাঁ, যা ব্রেন। আসল তো উচ্চমাধ্যমিক। সেটায় কি করে দেখা যাক। না, আমার আবার ওদিকে তরকারি চাপানো আছে। দেখি গে,’ নীলা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। পীযুষ ওকে ডাকে, ‘মনা, পড়তে গেছে তো?’
নীলা বলে, ‘হ্যাঁ, কেন?’
-      না এমনিই। ও গাঁইগুঁই করছিল, যেতে চাইছিল না তো তাই বললাম আর কি।
নীলা বেরিয়ে যেতেই শ্যামল বলে, ‘আর এখন হয়েছে এই এক সমস্যা। চব্বিশ ঘণ্টা শুধু পড়া আর পড়া’।
শ্যামলের কথা সায় দিয়ে পীযুষ বলে, ‘তা আর বলতে? এই তো দেখ না, এই বিকেল পাঁচটার সময় পড়তে গেল, ফিরবে সেই রাত্তির এগারোটা। চারঘণ্টা পড়ায় ভদ্রলোক। তাও কি এখানে নাকি, সেই গরিফায়’।
-      ওরে বাবা, তার মানে এ তো একেবারে ম্যারাথন পড়া রে ভাই। তা টিফিন দিয়ে দিস তো ছেলেকে?
-      সে তো দিতেই পারি। কিন্তু তা কি ছেলে নেয়? বলে, কোথায় খাব, কিভাবে খাব?
-      তাহলে ওকে কিছু হাতখরচা দিয়ে দে। কিছু কিনেটিনেও যাতে খেতে পারে। এই বয়সে বেশীক্ষণ খালি পেটে থাকা উচিৎ নয়।
-      নাঃ ওসব হাতখরচা-ফাতখরচা দিতে পারব না। ক’টা বিস্কুট ওর মা ওকে প্যাকেটে মুড়ে দিয়ে দেয়। ঐ খেয়েই থাকে।
পীযুষের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শ্যামল বলে, ‘সে কি রে? তুই ছেলেকে হাতখরচাও দিস না?’ পীযুষ বোঝাতে চায়, ‘দেখ, এই বয়সে টাকাপয়সার স্বাধীনতা না দেওয়াই ভাল। কারণ ওসব দিলেই ও এখন ফালতু খরচ করবে। আর যা যুগ পড়েছে, তাতে ও ছেলের মাথাই বিগড়ে যাবে। আর সঙ্গদোষে পড়লে তো কথাই নেই। আর দরকারই বা কি আছে ওসবে? আমরা তো আছিই। কিছু প্রয়োজন হলে আমাদেরকেই বলবে। আমরা ওর ভালমন্দ বুঝব। আর তাছাড়া ওর সব চাহিদাই যে মেটানো যাবে এমনটা তো নয়। আর দেখ না, আমাদের সময়ে তো এসব হাতখরচা-পাখরচা কিছু ছিল না। কই তাতে আমাদের কিছু এসে গেছে?’
হাসতে হাসতে শ্যামল বলে, ‘ভাল বলেছিস। তবে কি জানিস, যুগটা যে দিকে চলছে, তার বিপরীত দিকে চলার অনেক অসুবিধা আছে। আর এই ব্যক্তিস্বাধীনতার যুগে... ওরে বাবা, গল্প করতে করতে তো দেখছি এখানেই ন’টা বেজে গেল। না রে ভাই উঠি। এখন আর থাকলে চলবে না। আমাকে আবার দোকানে যেতে হবে।
সেদিন এ নিয়ে আলোচনাটা যেমন আর এগোল না, তেমনি এই বিতর্কের অবসানও হল না। তবে অবসান হয়েছিল, কিন্তু তা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক দিন পরে। অভিলাষ সেদিন বাড়ি ফিরেছিল রাত সাড়ে দশটায়। এদিন সাধারণত পড়ে আসার পর ও রাতের খাবার খেয়ে নেয়। বাড়ির তিনজনেই একই সাথে খেতে বসে। সেদিন খেতে খেতে বাবা ওকে বলছিল, ‘তুই মাকে বলেছিস তোর কোন বন্ধু নাকি মাধ্যমিকের পর অ্যাণ্ড্রয়েড ফোন পেয়েছে। তার ঠাকুমা নাকি তাকে গিফট দিয়েছে?’ সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ায় অভিলাষ। মুখের গ্রাসটা গিলে বাবা আবার বলে, ‘তোকেও আমরা আইপড দেব বলেছিলাম। দিইনি। তাই না?’ অভিলাষ এবার মৃদু হেসে শাকমাখা ভাতের একটা গ্রাস মুখে নেয়। কিন্তু কিছু উত্তর করে না সে। বাবা বলতে থাকে, ‘দিইনি কেন জানিস? তোর পড়ার ক্ষতি হবে বলে’। অভিলাষ এবার বলে ওঠে, ‘না না। পড়ার ক্ষতি হবে না, দেখ। আমার গান শোনা হয়ে গেলেই আমি তোমাকে ওটা ফেরত দিয়ে দেব’। বাবা ওর কথায় হাল্কা হেসে বলে, ‘তাই কি হয় রে ক্ষ্যাপা? ওসব নেশার জিনিস। আর এই সময় একবার নেশা লেগে গেলে একেবারে সাড়ে সর্বনাশ’।
মাও বাবার কথায় সায় দিয়ে তড়িঘড়ি বলে ওঠে, ‘না না। ওসব আইপড ফাইপড একদম নয়। সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা, কোথায় সেই চিন্তা করবে, তা নয়। মাথার মধ্যে ঘুরছে আইপড। এ ছেলের কিস্যু হবে না’।
মা বাবার কাছ থেকে এমন ব্যবহার অভিলাষের কাছে আশাতীত নয়। এমনটা ওরা আগেও করেছে। ওরা যা বুঝবে তা-ই করবে। ওদের গিফট দেওয়ার ইচ্ছা হলে তবেই দেবে। না হলে কিছুতেই দেবে না। এই সত্যটা আরো একবার অভিলাষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। সে আবারও ঠিক করল মা-বাবার কাছে আর কোনদিনও কিছু চাইবে না।



সেদিনের কথাগুলো মনে পড়তেই মনটা আজকে আবারও খিঁচিয়ে ওঠে তার। সামনে পড়ে রয়েছে ফিজিক্স বই। সমস্ত কথা ঝেড়ে ফেলে সে আবার পড়ায় মন দিতে গেল। বইয়ের পাতাগুলো একবার আঙুলের ডগায় ফররর করে উলটে গেল সে। হঠাৎ সে থেমে যায় একটা জায়গায়। পাতার ভেতরে ভাঁজ করা একটা খাম। এ তো স্যারেদের মাইনে দেওয়ার খাম। খামটা খুলে ভেতরে দেখে তাতে রয়েছে মোট চারশো টাকা। শ্যামলকাকুর মাইনে এটা। কিন্তু শ্যামলকাকুকে তো এ মাসে সে মাইনে দিয়েছে সে। তবে? ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। গত মাসে, হ্যাঁ গত মাসেই তো সে মাইনে দিতে ভুলে গেছিল। মাসের প্রথম দিকে তার জ্বর হয়েছিল বলে সে পড়তে যেতে পারেনি। আর শেষের দিনগুলোয় মাইনে দিতে তার মনেও ছিল না। কিন্তু এখন গত মাসের টাকা সে কি করে দেবে? দিতে গেলে শ্যামলকাকু যদি কথা শোনায়? থাক বাবা, দরকার নেই আর জলঘোলা করে। যেখানে আছে, এ টাকা সেখানেই থাক। এই ভেবে সে পুরোনো একটা বইয়ের পাতার ভেতর টাকাগুলোকে রেখে দিল সযত্নে।



এরপর কেটে গেছে প্রায় বছরখানেকেরও বেশি সময়। এক সকালে পীযুষ তখন ফোনে ব্যস্ত –
হ্যালো, বোসদা? হ্যাঁ, আমি পীযুষ বলছি। খবর শুনেছেন তো?.... হ্যাঁ, ছেলের তো এবার রেজাল্ট বেরিয়েছে। নাঃ, নাঃ ফার্স্ট হয়নি।...ফিফথ হয়েছে।...না না...খুব একটা ভাল না। অ্যাঁ? ঐ কোনরকম লেটার মার্ক্স।...হুঁ। আসলে আমি ভেবেছিলাম আরো ভাল হবে।...আরে ধুর, এই বাজারে, কি যে বলেন? এইসব লেটারের কি আর দাম আছে? এখন নাইন্টি পার্সেন্ট ছাড়া কোন কথাই হয় না।...অ আচ্ছা। আচ্ছা। ঠিক আছে, বেরোচ্ছেন যখন আর ডিস্টার্ব করব না।...হ্যাঁ, রাখছি।
ফোনটা কেটে দিতেই পীযুষ দেখে পাশে কখন নীলা এসে দাঁড়িয়েছে। ফোনের ব্যালেন্স দেখতে দেখতে পীযুষ বলে, ‘কি কিছু বলবে?’
আসলে কাল থেকেই পীযুষ আর নীলার মন খারাপ। মাধ্যমিকের পর থেকেই যে কি হল ছেলের? পড়াশুনোতে তেমন মন দেয়নি নিশ্চয়ই। নইলে যে ছেলের ফার্স্ট হওয়া কেউ আটকাতে পারত না। স্যারেরা পর্যন্ত তার মুখ দেখেই ভরসা করেছিল যে এবার উচ্চমাধ্যমিকে স্কুল থেকে নিশ্চয়ই ভাল রেজাল্ট হবে। সেই ছেলেই কি করে এত খারাপ রেজাল্ট করে?
বাইরের কেউ বুঝবে না। কারণ তারা জানে লেটার মার্ক্সটা মোটেই কিছু খারাপ নয়। কিন্তু পীযুষের ছেলে তো অন্য জিনিস, তার কাছ থেকে কি নাইন্টি পার্সেন্টের কম আশা করা যায়? তবু সবটাই মেনে নিয়েছে সে। অবশ্য ছেলের ইলেভেনের রেজাল্ট দেখেই তাদের সন্দেহ হয়েছিল। কারণ ধাক্কাটা প্রথম খেয়েছিল সে তো ইলেভেনেই। যখন সে ক্লাসে কোন পজিশনই পেল না। ছি ছি পড়ে গেছিল স্কুল, বন্ধু সার্কেলে। স্যারেরা তো তখন প্রায়ই তাকে জিগ্যেস করত, রেজাল্ট কেন খারাপ হল, কিভাবে হল...। সেসব শুনতে শুনতে মাথাই খারাপ হয়ে গেছিল ছেলের।
‘যাকগে। সেসব আর ভেবে লাভ নেই। যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন মন দিয়ে পরের বছরের জন্য পড়াশুনা কর’। বলেছিল বাবা। সঙ্গে সে এটাও দেখছিল যে ছেলে কোন মেয়ের পাল্লায় পড়ে বিগড়েছে কিনা। কিন্তু ব্যতিক্রমী শক্তি বটে ছেলের। কোন মেয়ে বন্ধুই তার নেই। তাই দুদিন তার ফোন কল, মেসেজ বোর্ড চেক করেও যখন কিছুই পাওয়া গেল না তখন পীযুষ নিশ্চিন্তই ছিল যে এবার উচ্চমাধ্যমিকে সে কিছু নিশ্চয়ই করে দেখাবে।
ভাল করে পড়লোও ছেলে। কিন্তু আবার বিপত্তি।
‘কি আর হবে ভেবে? এবার আসল কথা শুনলে চক্ষু চড়কগাছ হবে’। নীলার মন্তব্য শুনে চমকে ওঠে পীযুষ। বলে, ‘কি বললে? কেন? চক্ষু চড়কগাছ হবে কেন?’
নীলা এবার ঝাঁঝি মেরে ওঠে, ‘তা অমন গুণধর ছেলে হলে তার বাপের কি আর মাথার ঠিক থাকে?’
ভুরু কুঁচকে যায় বাপের, ‘কেন? ছেলে আবার কি করেছে? ঝেড়ে কাশো তো নীলা, কি হয়েছে খুলে বল?’
নীলা বেশ খানিকক্ষণ চুপ। পীযুষ ধৈর্যের সীমায় পৌছোয়, ‘কি বলবে তো নাকি?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে নীলা। তারপর বলে, ‘তোমার ছেলে নিজে নিজে আইপড কিনেছে’।
-কি? কি বলছ কি?
-হ্যাঁ, আর তাও আবার কিনেছে সে বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে। শুধু তাই নয়, তোমার বন্ধু শ্যামলকে মাসের পর মাস মাইনে না দিয়ে।
-তার মানে? তার মানে, ও আমাকে এভাবে ঠকাল নীলা?’ বিস্ময়ে অপমানে পীযুষ মুখ তখন শুকিয়ে গেছে।
এদিকে নীলা বলেই চলেছে, ‘আর কি? বেশি গর্ব তো তোমার ঐ ছেলেকে নিয়ে। আজ যখন ভাল মুখে বলতে গেলাম, বাবু, তোমার জন্যে বাবা এবার আইপড কিনেছে। ওমা, দেখি ছেলের মুখটা কেমন পাংশু হয়ে গেল। তখনই ধরেছি। তারপর তো জিজ্ঞাসা করতেই তো হরহর করে বলে গেল সব’। একটু থামে নীলা। তারপর কপাল চাপড়ে বলে, ‘হুঃ, ছি ছি ছি’। পীযুষ কোন কথা বলে না। তার মুখের কথা যেন কেউ কেড়ে নিয়েছে। সে চুপ করে বসে থাকে সোফার ওপর। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। কারুর মুখে কোন কথা নেই।
নীলা বলে এবার ছেলেকে আচ্ছা করে কিছু শিক্ষা দিতে হবে। নইলে...’
পীযুষ হাত নাড়িয়ে বলে, ‘না না নীলা। তা নয়। আমারই ভুল হয়েছে গো। অনেক কিছুই আমি বুঝতে ভুল করেছি’।
নীলা বলে, ‘তার মানে? কি বলতে চাইছ তুমি?
এর উত্তর না দিয়ে পীযুষ বলে, ‘ছেলে কখন ফিরবে?’
-      আটটা সাড়ে আটটা তো হবেই।
-      ঠিক আছে, তার পরে ওর সাথে কথা বলব।



সেদিন সন্ধেতে বেশ তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরল অভিলাষ। গিয়েছিল বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। ঘরে ঢোকবার সময় তাকে কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। ঘরে ঢোকামাত্র সামনে রাখা তক্তাটায় ধপ করে বসে পড়ে সে। ‘কি রে, বন্ধুদের সাথে আবার ঝগড়া ঝাঁটি করেছিস নাকি?’ মা তাকে ঐ বসে পড়তে দেখে শুধোয়।
কোন উত্তর না দিয়ে শুধু মাথা নাড়ায় অভিলাষ। মা বলে, ‘ওভাবে বসে না দেখে যা জামাপ্যান্ট ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে নে। তারপর কিছু খা’। মায়ের কথা শোনামাত্রই সে কিছুটা যান্ত্রিকভাবে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ঘরে পড়ার জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢোকে। বেশ খানিকক্ষণ পরে সে যখন রিল্যাক্স হয়ে চা খেতে বসেছে, পাশের ঘর থেকে বাবার গলার আওয়াজ এল। তাকে ডাকছে বাবা। মনে যেন একটা কাঁপুনি লাগে তার, একটা ভয় ভয় ভাব, বুকের কাছে একটা হাল্কা অস্বস্তি, দ্রুত নিঃশ্বাস। সে পাশের ঘরে গেল।
বাবা খাটের ওপর খবরের কাগজ পড়ছিল বাবু হয়ে বসে। তাকে দেখতে পেয়েই, ‘এসো, বাবা এসো’ বলে বাবা ওকে কাছে ডাকে। অভিলাষ অতি ধীর পায়ে এগোয়। বাবার কাছে যেতেই তাকে জড়িয়ে ধরে বাবা বলে, ‘কেন আমাদের না জানিয়ে তুমি আইপড কিনেছ বাবা? তোমার কিনতে ইচ্ছা হয়েছে, হতেই পারে। কিন্তু তুমি আমাদের বলতে পারতে তো?’
অভিলাষের মনে যদিও তখন এই প্রশ্নের অনেক উত্তরই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু সে তখন কিছুই বলল না, বা বলা ভাল বলতে তার ইচ্ছা করল না।
কিছুক্ষণ থেমে বাবা আবার বলে, ‘তুমি যে কাজ করলে বাবা, তাতে তো শুধু আমার নয়, তোমারও মানসম্মান নষ্ট হল। এটা কি ঠিক হল? তোমার নিজস্ব কিছু চাহিদা থাকতেই পারে, কিছু প্রয়োজন হতেই পারে। কিন্তু যা লাগবে তুমি আমাদের বলবে, কেমন?’
অভিলাষ ঘাড় নাড়ায়, কিন্তু এবারও কোন উত্তর করে না সে। মুখে ওর বিষণ্ণতার ছায়া স্পষ্ট। বাবা বলে, ‘দেখ, টাকার প্রয়োজন আছে জানি। তাই এবার থেকে আমরা ঠিক করেছি, তোমাকে আমরা প্রতি মাসে তিনশো টাকা করে দেব। তা দিয়ে তুমি সিনেমা দেখ, কি বন্ধুদের সাথে খাওয়াদাওয়া কোরো। আর ঐ ঘরের আলমারিটা আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম। ওখানে তুমি তোমার পছন্দমত জিনিস কিনে তাতে রেখে দিও, কেমন? ওখানে কেবল তোমারই জিনিসপত্র থাকবে’। বাবা যদিও একথা বলল না, সেই আলমারির একটা ডুপ্লিকেট চাবি তার কাছেও থাকবে।
কিন্তু অভিলাষ এবার মুখ খোলে। সে বলে, ‘বাবা, তোমার কেনা আইপডটা আমি বিক্রি করতে চাই’। এমন একটা আপাত অপ্রাসঙ্গিক একটা কথায় বিস্মিত হয়ে পীযুষ বলে, ‘কেন?’
-      আমার একজন বন্ধু সন্তু আলি। তোমাদের কাছে একদিন ওর গল্প করেছিলাম’।
-      হ্যাঁ, ঐ যার মা দমদমে সেলাইয়ের কাজ করে?’ মা পেছন থেকে বলে।
-      হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। কিন্তু দুঃখের কথা, ওর মায়ের চাকরিটা চলে গেছে। এখন ওর টিউশানিটুকু ছাড়া ওদের প্রায় কোনই আয় নেই। ওর দুটো বোন, একটা ছোট ভাই। ও বলছিল, পড়া ছেড়ে দেবে। তারপর কাজ খুঁজবে। আমিই ওকে বাধা দিয়েছি। বলেছি, তোর বই কেনবার কথা চিন্তা করতে হবে না। ও তো প্রথমে কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না। শেষমেষ ওকে জোরজার করে আমি বই দিতে রাজি করাই। ও ইংলিশে অনার্স নিয়ে পড়তে চায়। আমি তাই ঠিক করেছি আইপডটা বিক্রি করে সেই টাকাগুলো দিয়ে ওকে বই কিনে দেব’।
ছেলের কথায় পীযুষ প্রথমটায় হতচকিত হয়ে যায়। তারপর তার চোখদুটো হঠাৎ আর্দ্র হয়ে আসে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে সে বলে ওঠে, ‘খুব ভাল ভেবেছিস তো। তবে তাই করিস বাবা। আমি তোকে আশীর্বাদ করছি। তোর এই কাজের জন্য তোর সব অপরাধ আমি আজ ক্ষমা করে দিলাম’। বাবাকে জড়িয়ে ধরে ছেলে দেখে পাশে দাঁড়িয়ে মা। মায়ের মুখখানাও ভরে উঠেছে স্নিগ্ধ হাসির ছোঁয়ায়। মা বাবার কাউকেই অনেকদিন এত খুশি দেখেনি সে।

বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ব্যাগ



ব্যাগটা পড়ে ছিল ব্রিজের ঠিক গোড়াটায়, একটু আড়ালে। অন্ধকার। তাই হয়ত কারুর খেয়ালে পড়েনি। নইলে এখুনিই লোপাট দেখেই বোঝা যায়, একটা দামী হ্যাণ্ডব্যাগ। লেদারের মনে হচ্ছে। কালো রঙ, আলোতে আনলে চকচক করবে হয়ত। সন্ধ্যে নেমে গেছে ইতিমধ্যেই, কালো কালো ছায়াগুলো এবার গাঢ় হতে শুরু করেছে। ব্যাগটা পড়ে আছে বেবাক। লোক আসছে যাচ্ছে, স্টেশনে কতই না হৈ-হট্টগোল। কারুর খেয়ালই নেই সেদিকে। ব্যস্ততা। ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ডাউনের গাড়ির খবর হল। ভিড় বেড়েই চলল প্ল্যাটফর্মটার ওপর। ব্যাগটা তবু আছে, চুপচাপ। পেটে কি আছে তার? কে জানে?
মেয়েটা না বড্ড ভাবেবড় শখ তার সে বড় বাড়িতে থাকবে। গাড়ি থাকবে তার নিজের। অনেক দাসদাসী থাকবে। হুকুম পেলেই যারা ছুটবে, আদেশ শিরোধার্য। কিন্তু তার এই পোড়া কপালে কি সেসব আছে? কেন যে এইভাবে জন্মানো? এই ভিখিরির জীবন! মা কাজ করে বাড়ি বাড়ি। মাস গেলে কত যে ঢোকে সে হিসেব নেওয়ার ক্ষমতাও তাদের নেই। একবেলা ঠিকমত খেতে পায়। তো পরেরটায় পেট চোঁ চোঁ। মা বলেছিল তার কাজে সাহায্য করতে। সে কি মেয়ে শোনে? তার না বড় শখ সে অনেক বড় বাড়িতে থাকবে। মায়ের মতন কাজ করতে থাকলে সে তো নিজেই দাসী হয়ে যাবে, তখন কাকে সে হুকুম করবে? কি করে হবে তার গাড়ি?
সে ওসব কাজ করেনি। মায়ের ইচ্ছে মোতাবেক দু-ক্লাস পড়েছিল। তারপর থেকেই ফাঁকি শুরু। প্রথম প্রথম স্কুল পালিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা। আর সেই নিয়ে স্কুলের দিদিমণি একদিন চূড়ান্ত মেরেছিল তাকে। স্কেলের বাড়ি নয়, ছড়ি দিয়ে মেরেছিল তার পায়ে। অনেকক্ষণ যন্ত্রণা সহ্য করেছিল সে। তারপর আর পারেনি। দিদিমণির হাত জোরে কামড়ে দিল সে একসময়। দিদিমণির সে কি চীৎকার! ব্যস, সেই যে পালিয়ে এল স্কুল থেকে। তারপর আর ওমুখো হয়নি সে।
মেয়েটা বসেছিল। তার চোখে পড়েছিল সেই ব্যাগটাএকহাত দূরে, ব্রিজের গোড়ায়, ঝাপসা হয়ে এসেছে যেখানটায়। ভিড়, তবু বেশ কায়দা করে লুকিয়ে সে তুলে নিল সেটাতারপর জামার কোঁচায় লুকিয়ে দে-দৌড়।
ভাগ্য তার ভাল, তাই কেউ তাকে ঐ অবস্থায় দেখতে পায়নি। কিংবা দেখলেও অতশত বোঝেনি। নইলে...।
মায়ের বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে। দাদা আর ভাই গেছে সুশীলদার বাড়ি। সুশীলদা লজেন্স বিক্রি করে আর দুই ভাই তার প্যাকেট ভাঁজ করে। এতে অবশ্য রোজ রোজ তাদের অনেক লজেন্স খাওয়া হয়
ঘরেতে ঢুকেই ব্যাগটাকে খাটের তলায় চালান করে; বিমলটা মহাবদ। সব খোঁজ রাখে সে; তার মায়ের জন্যই অবশ্য তার এত সাহস। বাড়িউলির ছেলে কিনা। ‘কি র‍্যা, কই গেসিলি?’ মায়ের গলা শুনে হঠাৎ যেন চমক লাগে মেয়েটার। সে এতক্ষণ অনেক কথা ভাবছিল। ঠিকমত গুছিয়ে উঠতে পারল না সে, মায়ের গলা ফের, ‘অমন কি দ্যাখসিস! কই গেসিলি, জিগালাম যে। আমার হয়েছে মরণ। বাড়ি এসে দেখি কেউ নাই’।
‘মা একখান ব্যাগ পাইসি।‘ মেয়েটা কিছুটা ভয়গ্রস্ত।
‘কি কস?’ মা অবাকপানা দৃষ্টি ছেড়ে বলে। মেয়েটা মাকে বলে যায় সব কথা, খুব গাঢ়ভাবে। সবটা শুনে মা একটু সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠে। ব্যস্ত হয়ে পড়ে ব্যাগটা নিজের চোখে দেখবার জন্যে। মেয়ে ততক্ষণে সেটা বের করে এনেছে খাটের তলা থেকে। ‘কি আছে রে?’ মায়ের প্রশ্ন। ‘অত কি কি না করে দ্যাখই না। ভেতরটা দেখলে মকে উঠবা।‘ মা ব্যাগের চেনটা খোলে। দেখে দুটো সোনার চেন, একটা হীরে বসানো কানের দুল, আর একটা আংটি – সোনার। এতপর্যন্ত যা ছিল তাই দিয়েই অনেক টাকা পেত তারাকিন্তু ভগবান যব দেতা হ্যায় তো ছপ্পড় ভরকে দেতা হ্যায়। এর সাথে ব্যাগের আরও একটা পকেট আর তাতে নগদ একলক্ষ টাকা!
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! ব্যাগটা পেয়ে মায়ের মুখটা মোটেই খুশীতে ভরে উঠল না। বরং সে যেন আরো চুপসে গেল। সহসা মায়ের থেকে প্রত্যাশিত কোন ভাব না দেখে মেয়েটা যারপরনাই স্তম্ভিত। কি হল মায়ের? এত টাকা পেয়েও সে কি খুশী নয়? মেয়ের এই চিন্তা অমূলক। মা বলল, ‘তুই ব্যাগটা রেইখ্যে আয়। যেখান থেকে পাইসিলি, সেইখেনেই রেইখ্যে আয়।‘ মায়ের কথায় আরোই বেকুব বনে গেল সে। এ মায়ের কি হল? রোজদিন তাদের নুন পান্তা ফুরোয়, আর এদিকে যত্তসব গা জ্বালানি ঢং!
কিন্তু মায়ের মনে তখন ভাসছে সেদিনের কথা। সেই লোকটার কথা...   
লোকটা ছিল এক সাধারণ কর্মচারি নৈহাটি জুটমিলনিত্যনৈমিত্তিক কাজ ছিল সেখানেএমনই একদিন অফিসে গিয়ে সে দেখে অনেক লোক জমা হয়েছে মিলের গেটটার কাছে। হিন্দিতে কিসব বাকবিতণ্ডা করছিল ওরা। লোকটা কাছে যেতেই জানতে পারল – মিলের গেটে তালা ঝুলেছে। এরপর অনেক আন্দোলন হয়েছে, অনেক চিৎকার চেঁচামেচিও। ফলটা হল – মিলের তালা আবার খুলেছিল। আবার আশার মুখ দেখেছিল ওরা।
কিন্তু তা দিন দশেকের বেশি নয়। লণ্ঠনের তেল ফুরিয়ে এসেছে, শুধু আশায় তাকে জ্বালালে হবে না। শেষ নেভার আগে দপ করে জ্বলে ওঠে সেটা। তারপর আবার অন্ধকার – চিরতরে। লোকটা বাড়ি এল, একরাশ হতাশা নিয়ে। বাড়ির সামনের রোয়াকটায় বসে বিড়ি ফুঁকছিল সেতাকে সেদিন কিছু জিগ্যেস করবার সাহস হয়নি ওদের। কিন্তু ও এরপর দেখেছে উদ্‌ভ্রান্তের মত লোকটাকে ঘুরে বেড়াতে
ঠিক এমন সময় ওর জ্বর এল। আর এল তো এল, কিছুতেই কমে না। ডাক্তার দেখে বলল, ‘মনে হচ্ছে টাইফয়েড হয়েছে। কিন্তু আমি ঠিক সিওর নই। এই কতকগুলো টেস্ট লিখে দিলাম, এগুলো করিয়ে সামনের সপ্তাহেই দেখা করবেন’। কিন্তু ব্যস, ঐ অব্দিই। টেস্ট হল না। আর ওষুধও পড়ল না পেটে। আর পড়বেই বা কি করে? সামান্য বেঁচে থাকাটাও যে তখন ধার করে। যদিও ততদিনে মা বাড়ি বাড়ি কাজ ধরেছিল। আর লোকটা চাকরি খুইয়ে তখন মুদির দোকানের কর্মচারি। এখন তাদের টাকার দরকার, বেশ কিছু টাকা। অনেকগুলো টেস্ট করাতে হবে।
উপায়ান্তর না থাকায় এক বন্ধুর কাছে গিয়েছিল লোকটা একমাত্র মেয়ে। কি করে অবহেলা করে সে তাকে? তো যার কাছে হাত পাততে সে গিয়েছিল সে তার ছোটবেলাকার বন্ধু, যারা নাকি সবথেকে কাছের হয়। কিন্তু ব্যাপারটা অত মধুর হয়নি তার কাছে। প্রথমে সে তো দেখাই দিতে চায়নি। তারপর যা হোক করে বাড়িতে ঢোকা গেল। বন্ধু গদিওয়ালা চেয়ারটাতে গা এলিয়ে গোল্ডেন ফ্লেকে একটা সুখটান দিয়ে বলে, ‘নাও শুরু কর। তবে আমার কিন্তু ভাই সময় বেশি নেই। যা বলবার তাড়াতাড়ি বলতে হবে’।
মুখময় খোঁচা খোঁচা দাড়ি, একটু হাত বুলিয়ে সে বলে, ‘আসলে হয়েসে কি জান তো। আমার মেইয়েডার খুব অসুখ। ডাক্তারে কইসে টাইফয়েড। টেস্ট করতি হবে। আমি বলছিলাম কি, যদি ক’টা টাকা ধার দিতি পার। আমি তোমার টাকা ঠিক শোধ করি দিব
বন্ধু খানিকক্ষণ চিন্তা করে। তারপর কপালে ভাঁজ ফেলে বলে, ‘দেখ এখন আমার নিজের কাছেই এখন বেশি টাকা নেই। তুমি বরং কাল এসো। ঠিক আছে? আর কাল যদি না হয় রবিবার তো পাচ্ছইন্ধুর কথাগুলো নির্দ্বিধায় নির্দয়ভাবে বেরিয়ে আসে।
এখান থেকেও কিছু হল না দেখে ওর বাবা বেশ নিস্তেজ হয়ে পড়ল। বাড়ি ফিরে ঘনঘন পায়চারি আর মুখের দাড়িগুলোতে হাত বোলাচ্ছিল সে বারবার।
তবু হাল সে যখন ধরেছে, ছাড়বে না সহজে। কথামত পরেরদিন সে আবার হাজির আগের ডেরায়সেদিন বাড়িতে ছিল না কেউ। দ্যাবা-দেবী তখন অফিসে। এক আশি বছরের বৃদ্ধা মা। বৃদ্ধাশ্রম থেকে কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে এসেছেন। আতিথেয়তাটা বেশ ভালই ছিল তার। চা পেল, পেল বিস্কুটও। মনটা ভারি খারাপ লাগছিল রুগ্ন ছেলেদুটার আর জ্বরে-ধরা মেয়েটার কথা ভেবে। বুড়ি ফোন করল ছেলেকে, ‘কখন আসবি বাবা? তোর একটা বন্ধু এসেছে, কি যেন নাম?’
-অ্যাঁ!
-অ্যাঁ! বলিস কি রে?
মিনিট দুয়েক পরে সেই বুড়ির গলাতেই কি তেজ! বেরিয়ে যাও বাড়ি থেকে, কোন আক্কেলে তুমি ঢুকেছ এখানে? থতমত খেয়ে বিস্ময়ে তার যুক্তি, আমাকে তো আজকেই আসতে বলেছিল অমুক। তাই দেখা করতে এসেছি
-‘না কেউ আসতে বলেনি। ব্যাটা বেরও এখন
কিন্তু শূন্য হাতে ফিরতে সে তো আসেনি। তার মেয়ের জীবন মরণ সমস্যা। কিছু তো একটা তাকে করতেই হবে। একটা ছোট পাথরের মূর্তি। টিভির পেছনে পড়ে আছে অযত্নে। ধুলোমাখা, বোঝা যায় অনেকদিন কেউ ব্যবহার করে না সেটা। অনেকক্ষণ ধরে নজর করছিল সে।
পরের দিন কাজের লোক আসতেই হুলুস্থুলু কাণ্ড। কি হয়েছে, কি হয়েছে। না দশ বছর আগেকার সেই মূর্তিটা হাওয়া, টিভির পেছনে ছিল ওটা। আসলে অন্য কারুর নজরেই আসেনি সেটা। ফেলে দেওয়া হয়েছিল অপদার্থ হিসেবে। তাই কাজের মাসিরও একটা স্বপ্ন ছিল ওটাকে ঘিরেকিন্তু কে তার সেই প্ল্যান ভেস্তে দিল? পেলে তাকে হুল না দিয়ে সে ছাড়বে না।
বুড়ি মা বলল, ‘এ ক’দিন বাড়িতে তো কেউ আসেওনি রে। এক তোর ঐ বন্ধুটা...কি যেন নাম?’
নামটা মনে পড়তেই চমকে উঠল গৃহকর্তা কাম বন্ধু
জেলে যেতে পারত বাবা। অন্তত কেসটা সেইভাবেই সাজানো হচ্ছিল। কিন্তু বাদ সাধল সেই বন্ধুই। বাড়িতে এসে সে মাতৃভাষায়, নানান অভিধায় বর্ষণ করে গেল। যা কোনদিন তার ছেলেটা কিংবা মেয়েটা শোনেনিঅথচ বাবা তাদেরই সামনে অপমানিত হচ্ছে।
সেদিন রাতে খুব বমি করল বাবা। কিছুক্ষণের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে যেতে লাগল। তারপর হঠাৎই হার্ট অ্যাটাক। বাঁচানো যায়নি তাকে।
হাল্কা হাল্কা স্মৃতি, খুব ধূসর। তবু এখনও আঁচড় কাটে তার মনে। মায়ের কথাগুলোতে তার মনে ছবি এঁকে দিয়ে যায় কেউ। ‘তুই ওটা রেইখ্যে আয়। ওগুলোতে আমাদের কোন কাম নাই।‘ মায়ের সিদ্ধান্ত দৃঢ়।
মেয়েটা তবু ভাবে। তার যে শখ খুব বড় বাড়িতে সে থাকবে। অনেক টাকা ... অনেক স্বপ্ন যে তার। মায়ের কথাগুলো এমন বিষমাখা কেন? না, কিছুতেই নাসে এই টাকাগুলো কিছুতেই ছেড়ে দেবে না। কাউকে জানাবে না সে। গয়নাগাঁটি বিক্রি করে সে টাকা নিয়ে আসবে। অনেক টাকা আনবে। তারপর অনেক বড় বাড়ি করবে...
‘হ, সেই ভাল।‘ মেয়ের কথায় অনেক ভর্সা পায় মা।
                  *                                   *                             *
মেয়েটা চলে গেল। হাঁটতে হাঁটতে...। স্বর্ণকারের দোকান, তমুক জুয়েলার্স। একটা মোটা গোঁফওয়ালা, হৃষ্টপুষ্ট চেহারা, গায়ে রঙ অন্ধকার রাত। একটু কাছে এগোতেই সে চিনতে পারে মৌয়ের বাবাকে। ও আগে যে বাড়িতে থাকত, সেখানের প্রতিবেশী। স্বর্ণকার দোকানির সাথে বসে ল্যাদ খাচ্ছে। এখন সে এখানে কেন? মনটা চিড়বিড়িয়ে ওঠে তার। কিচ্ছুটি করবার নেই। তার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। কারণ মৌয়ের বাবা পুলিশে কাজ করে। গয়না বিক্রি করতে গেলেই কি না কি জিগ্যেস করবে।
পেটের কাছে একটা ব্যথা, ভয়ের ব্যথা। বুকে ধুকুপুকু। ‘এ লোকটা মহা খচ্চর, পরে আসব’ মনকে বলতে থাকে সে। কিন্তু বারবার মনে হচ্ছে, গোঁফওয়ালাটা তাকেই যেন দেখছে। দোকানের সামনে রাস্তা, রাস্তার ওপারে সে। সে দেখছে, ঘাড় ঘুরিয়ে অত কি দেখছে রাস্তার এদিকে? খেয়াল পড়ে, হাতে তার ব্যাগ। ব্যাগটাই কি দেখছে মৌয়ের বাবা?
লোকটা উঠে আসে তারপর রাস্তায় নামল। রাস্তা পারও হল তারপর। ‘কি রে, কেমন আছিস? অনেকদিন তোকে দেখিনি তো? বাড়ির খবর সব ভাল তো?’ মৌয়ের বাবার এতগুলো কথাতেও মেয়েটার মুখে রা কাড়ে না। অপ্রতিভ হয়ে সে মাথা নাড়ায়, সব ভাল। সব ভাল। তারপর পা চালায়, থানা।
               *                                      *                                         *
‘কোত্থেকে বললি? ব্রিজের তলা থেকে? বাঃ, বেশ ভাল। তুই তো দেখছি গুড গার্ল। তা নিয়ে এলি যে? ভাল লাগেনি বুঝি জিনিসগুলো? হাঃ হাঃ হাঃ।‘ পুলিশকাকুর হাসিতে কান্না আসে তার। তবু ব্যাগটা দিতে পেরে কেমন যেন হাল্কা লাগে। মায়ের কথা শুনেছে বলে নয়, মৌয়ের বাবা তাকে দেখেছে, অনেক লোকই তাকে দেখেছে...। একটা ভয় তো তার ছিলই। বাবার ঘটনাটা বারবার তাকে অন্য দুনিয়ায় নিয়ে যাচ্ছিল। বারবার বাধা পাচ্ছিল সে হাজার হোক এও তো একটা চুরি।
থানা থেকে বেরোতেই ধাক্কা খেল সে একটা লোকের সাথে, ‘আঃ দেখে চলতে পারেন না?’ ঝামটা দিয়ে ওঠে সে। মেজাজ যে তার এখন তিরিক্ষে
ওঃ সরিবলে লোকটা হন্তদন্ত হয়ে থানায় ঢুকে যায়। ভেতরে ঢুকে জিগ্যেস করে, ‘আচ্ছা, একটা মিসিং ডায়রি করব
(২)
(দু’মাসের বেশি কেটে গেছে)
রুকুদের বাড়ি থেকে চিৎকারের আওয়াজ আসছে। আমার আপনার হয়ত তাতে খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু কিই বা আর করা যায় বলুন। আশেপাশের সকলে বলতে বলতে এখন যে যার মত কান চাপা দিয়েছে। প্রথম প্রথম সত্যিই আমাদেরও সহ্য হত না, কি করে মারে? কি করে মারে একরত্তি মেয়েটাকে? তবু মেয়েটাকেও দুষি। বলি কেন, কিসের পিরীতে সে এখান ছেড়ে নড়ে না? আরে বাবা, এখন এই যুগে ঘর ঘর কাজের মাসি, পিসি, দিদি দরকার হয়ে পড়েছে। একটায় না পোষালে অন্যটায় দেখতে ক্ষতি কি?
হু হু বাবা, সেও সেয়ানা মাল। দেখেছে বড় ঘর। দুচার পাইস এদিক ওদিক থেকে ম্যানেজ করা যায়; ছড়িয়েই তো থাকে কত। এই যেমন আজকের বাণিজ্যে মিলেছে একটা ঘড়ি, কম্পিউটারের পাশে পড়ে ছিল নয় নয় করে দশ বারোদিন। ফেড হয়ে গেছে গোল্ডেন রিম, ব্যাণ্ডটাও ছেঁড়া, তবু তাই সই। দোকানে দিলে এখুনি সে তার একমাসের মাইনে জুটিয়ে দেবে।
কিন্তু সেদিন হল চূড়ান্ত। রুকুর মেয়েটা ঘুমিয়ে ছিল খাটেতার ওপর দায়িত্ব ছিল মেয়েটাকে দেখার। আসলে রুকুর মেয়েটা এখনও হামা দিতে শেখেনি। ঘুম থেকে উঠেই তার কাজ হচ্ছে এদিকওদিক এপাশওপাশ করা। এইভাবে সরতে সরতে সে খাটের একধারে চলে আসে। তারপর পপাত ধরণীতলে। একবার নয় দুবার নয়, কম করেও চার পাঁচবার সে খাট থেকে পড়েছে। এখন আর তাই রুকু মেয়েকে ছেড়ে যায় না। গেলেও ওর ওপর দায়িত্ব দেওয়া থাকে। যেমন আজ। রুকু স্নান করতে গেছিল। তাই ও পাশে বসেছিল।
‘এই আমার পাজামাটা কোথায় রে?’ গলা শুনে সে ঠিক বোঝে এটা মেসোর ডাক। তার জামাটা এক্ষুণি বের করে দিতে হবে। নইলে ক্যাটক্যাট ক্যাটক্যাট করেই যাবে।
উফফফ বলে সে উঠে আলমারিটা যেই খুলেছে। অমনি ‘ধপাস’ করে শব্দ। তারপরেই শুরু বিকট আওয়াজে কান্না। কান্নায় চমকে উঠে দেখে রুকুর মেয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে সে কোলে তুলে নেয় বাচ্চাটাকেকিন্তু ততক্ষণে তো যা হবার হয়ে গেছে। রুকু কোনরকমে ম্যাক্সি গলিয়ে চলে এসেছে। স্নানের জল ঝরছে গা থেকে।
‘এ কি রে? কি করলি তুই? হতচ্ছাড়া। মেয়েটাকে দেখতে বললাম, তুই সেটুকু কাজ পর্যন্ত ভাল করে করতে পারিস না?’
মেয়ে কেঁদে চলেছে তার মত। রুকু একের পর এক কিল চড় লাথি ঘুসি যা পারে চালাতে থাকে ওর ওপর। একটাও বাইরে যায় না। মারতে মারতে হাতের কড়ে আঙুলে, হাঁটুতে কালশিটে পড়ে যায় তার। সেদিন খুব কেঁদেছিল সে। তক্ষুণি ওবাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল। আর যায় নি সে
আসলে তার যে শখ ছিল সে অনেক বড় বাড়িতে থাকবে। কিন্তু কি করে থাকবে? সেখানে তো কেউ তাকে চায় না। কেউ তাকে আশ্রয় দেয় না। এর চেয়ে তার নিজের বাড়িই ভাল ছিল। হোক সে ছোট, কিন্তু তবুও অনেক ভাল। কথাগুলো এতদিনে মনে হয় তার। আবার বাড়ির দিকে ফিরতে চায় সে। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূয্যি তখন ডুবিডুবি।
সে বাড়ি পৌছল। কিন্তু বাড়িতে কেউ নেই। অরবিন্দ পল্লীর এই গলিটাতে সারি সারি ছোট বাড়ি। এখনও কুঁড়েঘরের থেকে এগোতে পারেনি এরা। পয়সাকড়ির অভাবেই। গলি শেষ হতেই একটা পচা ডোবা। তার ধারের বাড়িটাতে দরজা নেই। জানলাগুলোর একটাও পাল্লা নেই। শিকগুলোও হাওয়া। কি করে হল এই অবস্থা?
মনে পড়ে মায়ের সাথে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে চলে গেছিল সে। আর করবে নাই বা কেন? কি সুন্দর একটা ব্যাগ সে পেয়েছিল। সেটা তো ধরতে গেলে মায়ের জন্যই পুলিশের হাতে তুলে দিতে হয়েছে। তার না কত স্বপ্ন ছিল ঐ টাকাগুলো নিয়ে। সেইদিনই বাড়ি ফিরে মায়ের সাথে তাই তার তুমুল ঝগড়া। তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিল সে। অনেক কষ্টের শেষে একটা কাজও পেয়েছিল রুকুদের বাড়ি। সেখানেই সে থাকত। সেখানেই সে খেত। বড় বাড়ির মালিক তো আর সে হতে পারবে না। তাই সেই বাড়ির চাকর হয়ে থাকাও ভাল।
বাড়ির আর কোন খোঁজই আর নেয়নি সে। এখন চিন্তা হয় কি করবে সে? কোথায় যাবে? কেই বা আশ্রয় দেবে তাকে?
ঠিক এমনই সময় কেউ তার কাঁধে হাত রাখল।
চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে সে দেখে অপরিচিত এক লোক। মুখ ভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি, চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা। রোগা টিঙটিঙে চেহারা। মিটিমিটি হাসছে। তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে স্থির। মেয়েটা ভয় পেয়ে গেল। কে এই লোক?
কিন্তু সে কিছু বলবার আগেই লোকটাই বলে উঠল, ‘আমাকে দেখে ভয় লাগছে? ভয় পেয়ো না। তুমি আমাকে চিনবে না। কিন্তু আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে খুঁজছি’। বলতে বলতে লোকটা ভাবের গভীরে ঢুকে যায় যেন।
‘একটা ব্যাগ। আমার ঐ ব্যাগটাতে অনেক টাকা ছিল, অনেক গয়নাগাঁটিও। মেয়ের বিয়ের জন্যে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কি করে জানি, ব্যাগটা পড়ে গেল। পরে খুঁজেই পেলাম না। পুলিশ মিসিং ডায়রি করতেই দেখি ব্যাগটা সেখানে হাজির।
‘পুলিশকে আমি জিগ্যেস করি, কে দিয়েছে এই ব্যাগটা? ওরা বলে, এইমাত্র একটা মেয়ে বেরিয়ে গেল – সেই তো দিয়ে গেল। আমি তক্ষুণি ছুটে গেছিলাম। কিন্তু কোথাও পেলাম না তোমায়। এরপরেও তোমাকে খুঁজেছি।
‘খবর পেয়েছিলাম, তোমাদের বাড়িটা এখানেইগত পরশুদিন আমি প্রথম এসেছিলাম এখানে। কিন্তু এসে দেখি, তালা ঝুলছে। ভেবেছিলাম বোধহয় কিছুক্ষণ পর খুলবে। কিন্তু কোথায় কি? দুঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেও যখন কেউই বাড়িতে এল না। আমি চলে গেলাম।
‘কিন্তু আশা ছাড়িনি। প্রতিদিনই আমি আসতাম। কেন জানি মনে হত, একদিন না একদিন দেখা ঠিক হবেই। কালও এসেছিলাম। কাউকে না পেয়ে ফিরে গেছিলাম। পাশের বাড়ি থেকে খবর নিয়ে আজ জানলাম, এ বাড়িতে এক মহিলা থাকতেন। তার দুই ছেলে আর এক মেয়ে। মেয়েটা কয়েকদিন আগে থেকে বেপাত্তা। হয়ত কোন ছেলের সাথে পালিয়েছে। আর ছেলেদুটো তো কাজের জন্য কোথায় গেছে তার ঠিক নেই। মা এই বাড়িতে একা একা ছিল। তারপর একদিন সেও যে কোথায় চলে গেল কেউ জানে না।
‘আমি আজকে ফিরেই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এ বাড়ির সামনে কাউকে দেখে আমার ভারি অবাক লাগে। তাই দেখতে এলাম। এসে দেখি, হ্যাঁ তুমিই তো। তোমাকেই তো আমি থানায় দেখেছিলাম। মনে আছে?’
প্রশ্ন করে থেমে যায় লোকটা। মেয়েটা আস্তে আস্তে মাথা নাড়ায়, ‘হুম, আমিই ব্যাগটা থানায় দিয়ে এসেছিলাম’।
লোকটা আনন্দে জড়িয়ে ধরে মেয়েটাকে, ‘সোনা মেয়ে, লক্ষ্মী মেয়ে তুমি। তোমায় অনেক অনেক আশীর্বাদ করছি। তুমি অনেক বড় হবে। অনেক’। তারপর একটু থেমে বলে, ‘তুমি যে আমার কি উপকার করলে তা তো জানই না। মেয়ের বিয়েটা যে দিতে পেরেছি সে তো তোমারই জন্য। ভগবান তোমার কল্যাণ করবেন মা’
কিন্তু মেয়েটা তখন ভেবে চলেছে অন্য কথা। সে যে ব্যাগটা থানায় দিয়েছে, সে তো তার মায়ের কথাতেই। মা তাকে না বললে লোকটা তো কোনদিনও ঐ ব্যাগটা পেত না। তাই যা কৃতিত্ব, তা তো তার মায়ের।
লোকটা বলে, ‘কি ভাবছ অত?’
মেয়েটা শুষ্কভাবে বলে, ‘আমার মা কোথায়? খুঁজে পাচ্ছি না। মাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে জানেন?’
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর সে কথার উত্তর না দিয়েই বলে, ‘তুমি এখন কোথায় থাকবে?’
মেয়েটা নিরুত্তর। তাকে দেখে লোকটা বলে, ‘এসো আমার সাথে। আমার স্ত্রী তোমাকে দেখতে পেলে খুব খুশি হবে’। এই বলে সে মেয়েটার হাত ধরে, তাকে নিয়ে এগোতে থাকেহাঁটতে হাঁটতে তারা বেরিয়ে যায় গলিটা ছেড়ে। মেয়েটা তখনও ভেবে চলেছে তার মায়ের কথা।  কিন্তু কি আর হবে ভেবে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। আর আজ হয়ত এখান থেকে সে চিরদিনের মতই চলে যাচ্ছে। তার পাড়া, তার প্রতিবেশী...
মেয়েটা লোকটার পিছু পিছু চলতে থাকে নির্বাক। বড় রাস্তায় এসে পড়ে তারা। লোকটা দেখে মেয়েটা তার সাথে কিছুতেই সহজ হতে পারছে না। সে বলল, ‘আমার ঘরে থাকতে তোমার কোন অসুবিধা হবে না। অনেক বড় বাড়ি আমার। অনেক ঘর। গাড়িও আছে। তুমি আমার ঘরে কাজ করবে। সেখানেই থাকবে। আর চিন্তা কি? আর ইচ্ছে হলে নিজের বাড়িতে এসে দেখে যাবে, তোমার মা এল কিনা। কেমন?’ মেয়েটা তবু নিরুত্তর। এক পা এক পা করে সে হেঁটে চলেছে। অত্যন্ত ধীরে ধীরে।
হঠাৎ পেছন থেকে কার ডাক। মেয়েটার নাম ধরে ডাকছে। সুতীক্ষ্ণ গলার আওয়াজ। মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘মা ডাকছে’এই বলে সে লোকটার হাত ছাড়িয়ে ছুটে যেতে লাগল তার বাড়ির গলির দিকে। যেখান থেকে তার মায়ের গলা আসছে।