মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০১৪

নির্বাচন (পরমাণু গল্প)

“তোমরা যুদ্ধের জন্য তবে প্রস্তুত?” জানতে চাইলেন প্রধান।
সমস্বরে উত্তর আসে, “হ্যাঁ, জনাব। আমরা প্রস্তুত”।
প্রধানঃ ‘কি কি অস্ত্র আছে তোমাদের কাছে’।
প্রথম সৈন্যঃ ‘আমার তৈরী এই বোমায় সকল শত্রু নিমেষে ধ্বংস হবে’।  
দ্বিতীয় সৈন্যঃ ‘আমার এই বন্দুকের গুলিতে মানুষ তো দুরস্থ, কোনো প্রাণীও বেঁচে ফিরবে না’।
তৃতীয় সৈন্যঃ ‘আমার কাছে আছে এই বই। এ দিয়ে আমি শত্রুদের বোঝাব আমরা শত্রু নই’।
প্রধানঃ ‘তৃতীয় ব্যক্তি, রণভূমিতে নামো’।

                                                                              ............... – ঐশিকা বসু। 

রবিবার, ১২ জানুয়ারী, ২০১৪

অন্তরে নিহিত

স্বর্ণাকে সারাদিন গুমরে থাকতে দেখে রাতের দিকে অনুপ বিরক্তিতে বলে ওঠে, ‘তোমার কি হল বলতো? সারাদিন একঘেয়ে এই ঘরের কোণে চুপ করে বসে আছো যে? যাও যাও, ভাত বাড়ো, খেয়ে শুই’। স্বর্ণা খাট থেকে নেমে রান্নাঘরে যায়। এতগুলো কথার একটাও উত্তর সে করে না। কিন্তু অনুপ এদিকে গজগজ করেই চলেছে, ‘কি যে হয় তোমার মাঝেমাঝে, কিসুই বুঝি না’। খানিক বাদে স্বর্ণা ঘরে ঢুকে ভাতের থালাটা মেঝেতে ‘ঠকাং’ করে রেখে আবার রান্নাঘরে ফিরে যায়। তবে রান্নার কাজ এখন আর তার নেই। তাই চল্লিশ ওয়াটের বাল্বটাকে সে নিভিয়ে দেয়। তারপর চুন-পলেস্তারা খসা দেওয়ালটায় ঠেস দিয়ে বসে থাকে অন্ধকারে।
স্বর্ণার এই অন্ধকারটা ভালো লাগে, ভালো লাগে এই নিঃসঙ্গতাটাও। মন চায় একাকী থাকতে। ভালো লাগে না তার স্বামী, পুত্র, পরিবার। তার জীবনটা আজ নতুন মোড় নিলোএতদিন ধরে চলতে থাকা উৎকণ্ঠা, তার একটা পর্ব আজ শেষ। নতুন কোন চিন্তা আর সে চায় না এই চল্লিশোর্দ্ধ জীবনে। আসলে উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগের এই লড়াইটাই যে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল অহর্নিশ, এটা সে যেন আজ নতুন করে উপলব্ধি করতে পারল। সে অনুভব করে তার জীবনীশক্তি যেন আজ কিছুটা হলেও কমে এসেছে। এত পরিশ্রম শেষে সে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে চাইছে আজ পালিয়ে যেতে, দূরে, আরও দূরে, বহুদূরে। কিন্তু বাধা একমাত্র তার বারো বছরের কিশোর টুটুন; এখন যে পাশের পাড়ায় পড়ার ব্যাচে। আসতে তার এখনও যে দেড় ঘণ্টা বাকি। তার জন্যই তো শুধু অপেক্ষা করে স্বর্ণা। তার এই অপেক্ষা শেষে টুটুন এলে...
টুটুনের কথা মন বলতেই কে যেন তার মধ্যে শিহরণ জাগায়। কারুর উপস্থিতি হঠাৎ যেন টের পায় স্বর্ণা। কারো তপ্ত শ্বাস সেন তাকে ছুঁয়ে চলেছে আশিরনখ। কোন বিদেহী কি আছে এ ঘরে? না, সে তো অসম্ভব। তবে? অবচেতনে কি তবে সাড়া জাগায় সে? আজকের দিনটা তো তারই; সেই কি তবে ডাক দিল এভাবে? দশ বছরের ফেলে আসা স্মৃতি হঠাৎই ধরে ফেলে স্বর্ণাকে কোন এক অদৃশ্য চক্রব্যূহেরাতটা বড়ো বেয়ারা। অজ পল্লীতে দূরে শেয়াল কুকুরের উদাত্ত স্বর ভেসে ভেসে আসে। আলো জ্বালায় স্বর্ণা। নজরে আসে রান্নাঘরের কোণে স্তূপীকৃত বাসনকোসন। সেগুলো সরালে একটা লাল মোটা খাতা। স্বর্ণার জীবনের একমাত্র নীরব দর্শক। ধুলোর পুরু স্তর এর আভরণ। তবু এই ভালো। সকলের দৃষ্টির বাইরে আছে তা। সামনে এলেই এ ডায়রি পড়ে ফেলতে কেউ এতটুকু দ্বিধা করবে না; বিশেষতঃ তার স্বামী অনুপ। কিন্তু না। এসব নিয়ে অনেক সয়েছে স্বর্ণা। অনেক ব্যঙ্গ বিদ্রূপ, অনেক অপমান সে মুখ বুঝে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এ ব্যাপারে বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজন-পাড়া-প্রতিবেশী সবাই সমান। সবাই ওকে আজও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, অবজ্ঞা করে। কিন্তু সত্যিটা যে কেউ জানে না, একমাত্র সে আর তার এই ডায়রিটা ছাড়া।
ধুলো ঝেড়ে শেষ থেকে পাতা ওল্টায় স্বর্ণা। শেষ পাতায় কতকগুলো ছবি আঁকা রয়েছে। কিছু মেয়েপুরুষের হাসি কান্নার ছবি, স্মাইলি। আগের পাতা ফাঁকা। আজ অব্দি সে পাতায় কিছুই লেখা হয়নি। তার আগের পাতায় লেখা ভর্তি। শেষ লেখাটা চার বছর আগের। শখ বলতে তার কেবল এই ডায়রি লেখাটাই ছিল অবশিষ্ট। আজ নানা বাধায়, সাংসারিক চাপে তাও গেছে হারিয়ে। স্বর্ণা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে পড়তে থাকে ডায়রির শেষ থেকে। স্মৃতিগুলো আর একবার রোমন্থন হয়ে যাক। তার বিচিত্র জীবনের অভিজ্ঞতা সে ছুঁয়ে যাক আরও একবার।
১৪ই জুলাই, ২০০৯
আজ বড় নার্ভাস লাগছে। কি লিখব কিছু বুঝতে পারছি না। খুন হয়েছে। ও খুন হয়ে গেছে। স্মরণ্য...হ্যাঁ আমার স্মরণ্য আর নেই। ওকে ওরা খুন করেছে কাল মীনা যখন খবরটা দিল, সত্যি বলতে কি আমি বিশ্বাসও করতে পারিনি। বিশ্বাস না করার যদিও কিছুই ছিল না। কারণ আমিও তো সবটাই জানতাম। শুধু স্মরণ্যকেই সব জানাতে পারলাম না। অনুপ কাল সকালে বলে গেল, একটু আসছি। আজ এই সন্ধ্যেতেও তার দেখা নেই। জানি ও আজ আসবে না, করে আসবে তাও জানতে পারব না। কিন্তু বাড়িতে যদি পুলিস আসে, অনুপকে খোঁজে? কি জবাব দেব আমি? ভাবতেও গা হাত পা শিউরে ওঠে। কোনদিন এমনটা যে হবে তা তো ভাবতেও পারিনি। টুটুনটাও ছোট। কিচ্ছু বোঝে না, শুধু জানে দুষ্টু লোকেদের বাড়ি পুলিস আসে। জানি না ওর মনে কি ভয় ধরবে। ঈশ্বর রক্ষা করো।
৩০শে মার্চ, ২০০৯
যেটা শুনলাম সেটা কি সত্যি! জানি না, তবে সত্যি হলে বড্ড ভয়ের কথা। সন্ধ্যেবেলায় অনুপের প্রতিদল পার্টির কিছু লোক এসেছিল। ওদের জন্য চা বানাতে যখন রান্নাঘরে এসেছি তখনই শুনলাম ওরা স্মরণ্যকে নিয়ে কথা বলছে। সামনে ভোট। স্মরণ্য জনদল পার্টির হয়ে প্রচার চালাচ্ছে। এতেই রাগ ওদের। ওদের একজন বলছিল স্মরণ্যকে ওরা দেখে নেবে। কিন্তু ওরা স্মরণ্যকে ঠিক চেনে না। তাই ঠিক হয়েছে অনুপ ওদের চিনিয়ে দেবে। হ্যাঁ, অনুপ ওদের এই কথাই দিয়েছে। আমার ঘাম ঝরছিল দরদর। এখনও লিখতে গিয়ে হাত কাঁপছে। অনুপ কি সত্যি স্মরণ্যর বাড়ি চিনিয়ে দেবে? ওরা তো তাহলে ওকে ছাড়বে না। হয়তো মেরেই ফেলবে। আমি তক্ষুনি ফোন করেছিলাম স্মরণ্যকে। কিন্তু ওর ফোন না জানি কেন সুইচড অফ ছিল। কি করব আমি। ওর সাথে যোগাযোগের আর তো কোন রাস্তাই আমার নেই। কিন্তু অনুপ তো এটা বোঝে ওই গুণ্ডাগুলো ওকে মেরে ফেলবে, তা সত্ত্বেও ও স্মরণ্যকে চিনিয়ে দেবে? জেনেশুনে একটা মানুষকে খুন হতে দেবে? এত নীচ ও? ছিঃ। আমার আর কিচ্ছু ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে, সবকিছুর জন্য দায়ী আমিই। আর কাকেই বা দোষারোপ করব? আমারই পাপের ফল এসব।
এর আগে অনেকগুলো পাতা ছেঁড়া, স্বর্ণাই ছিঁড়েছে সেসব। নিজেকে আর নিজের জীবনকথা গোপন রাখতেই সে একাজ করতে বাধ্য হয়েছে। মনে পড়ে তার সেদিনগুলো। পাগলের মত লিখে চলত সে পাতার পর পাতা। ডায়রির পর ডায়রি ফুরিয়ে যেত নিমেষে। নিজের জীবনের সমস্ত কষ্টগুলোকে সে
এভাবে উজাড় করে দিত তখন। শেষ হয়ে গেলে ডায়রিগুলো ফেলেও দিত সে চুপিসারে, অন্ধকারে। অবশিষ্ট আছে শুধু এটাই। কারণ একমাত্র এতেই তার জীবনের সমস্তটা সে রেখে দিতে পেরেছে। একাত্ম হয়ে গেছে সে এই ডায়রিটার সাথে। কি করে ফেলে দেবে সে তার এতবছরের পুরনো বন্ধুকে? এরসাথে তো সে কথা বলে একান্তে, একে সম্বোধনও করে সে। তার জীবনের সমস্ত ঘটনার সাক্ষী আছে এই ডায়রিহোক না তার পাতা ছেঁড়া, হোক না তা খাপছাড়া। তবুও...
১১ই জানুয়ারি, ২০০৬
সারাদিন বাড়িতে থেকে থেকে আর ভাল লাগে না। স্মরণ্যর সাথে যাও বা দেখাসাক্ষাৎ হত, এখন তাও বন্ধ। ওর সাথে যার সবথেকে ভাল বন্ধুত্ব হয়েছে সে টুটুন। যখনই আসত স্মরণ্য ওর জন্য চকোলেট বা লজেন্স এনে দিত। খেলনা গাড়িও এনে দিয়েছে কতবার। আমি কোনদিনও ওকে বারণ করিনি। ও ছাড়া টুটুনকে আর এসব দেবেই বা কে? অনুপ তো ওকে দেখলেই শুধু ‘এটা করিস না, ওটা করিস না’ করে যায়। সবসময় বাচ্চাকে বাধা দিলে চলে? বাবাকে দেখলেই টুটুন এখন তাই ভয় পায়। সামান্য জল ঘাঁটলেও ওর বাবা মারধোর করে। আর পড়াশুনো নিয়ে মারামারি তো রোজকার ঘটনা বাইরে ঝামেলা করে ঘরে এসে ছেলেটাকে শুধু মারে। আমার একদম সহ্য হয় না এসবএভাবে ওর মনে ভয় ধরিয়ে লাভ কি? এতো নিষ্ঠুরতা। তাই টুটুনকে বলেছি বাবার কাছে থাকবি না। বাবা মারলে, আমার কাছে চলে আসবি। আর সেখানে স্মরণ্য ওকে কি ভালবাসে! টুটুনকে দেখলেই হল, কাঁধে চড়াবে, পিঠে চড়াবে, কত খেলা করে ওর সাথে। ওদের মধ্যে একটা সুন্দর একাত্মবোধ তৈরী হয়ে গেছে। দেখে আমার খুব ভাল লাগে। কিন্তু এতেই আরও রাগ অনুপের।
স্মরণ্যও তো ক’দিন হল আসছে না। কি জানি ওর কোন অসুখ হল কিনা। কিংবা অনুপ ওকে আবার কিছু বলেছে কিনা তাও বুঝতে পারছি না। সেদিন তো অনুপ আমায় বলেই দিল, ওর সাথে তোমার খুব বন্ধুত্ব তাই না? দাঁড়াও ঘোচাচ্ছি সব। আমি কোন উত্তর দিইনি সেদিন। জানি না ও যে আবার কবে আসবে। অপেক্ষা করে আছি। কেউই তো নেই আমার। একমাত্র স্মরণ্যই যা আসত। নতুন কোন মানুষের মুখই দেখি না। পাড়ায় বেরোলে লোকের গুজুর গুজুর শুনতে ভাল লাগে না। সবাই শুধু আমাদের এই সম্পর্ক নিয়ে তিলকে তাল করে, গল্প বানায়। এখানে যারা আমার ভালো বন্ধু ছিল, তাদের সাথেও আর যোগাযোগ রাখতে পারি না। আর রাখবই বা কিভাবে? বাড়ি থেকে বেরোলেই যে অনুপ নানারকম প্রশ্ন করে। কোথায় যাচ্ছ, কেন যাচ্ছ... ওফ্‌ আর ভাল লাগে না। কেন? আমি কি তোমার সম্পত্তি নাকি? যা বলবে তাই শুনতে হবে?
স্বর্ণা উল্টে চলে ডায়রির পাতা। কত ঘটনা, কত দুঃখ যন্ত্রণা লেখা সেসব পাতায়। ওল্টাতে গিয়ে সে একটা পাতায় হঠাৎ আটকে যায়।
১১ই জানুয়ারি, ২০০০
কাল সারাটা রাত আমি ঘুমোতে পারিনি। খুব নার্ভাস লাগছিল। স্মরণ্য আমার এ কি ক্ষতি করে দিয়ে গেল? কি করব আমি এখন? কাল সন্ধ্যেবেলায় যখন ও এলো, আমি তখনই বুঝেছি এ লোককে ঘরে ঢোকানো ঠিক হবে না। কিন্তু তবু আমি ওকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। কেন? শুধু ও কাকুতি মিনতি করেছিল বলে? নিজেও কি কিছু বুঝিনি তখন? না সে কথা তো বলতে পারি না। তা না হলে ঘরে যখন কেউ নেই, অনুপ নেই, বাবা বাইরের ঘরে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে, ঠিক তখনই ও এলোআর আমিও বোকার মত পেছনের দরজা খুলে দিলাম। স্মরণ্যকে ঘরে ঢুকতে দিলাম লুকিয়ে অন্ধকারে। আর লোকে যদি দোষ দেয় তো আমাকেই দেবে। কিই বা করবো আমি? সবই তো তুমি জান। আমার যে কি অবস্থা সে কথা তো সবই লিখেছি। আমিও তো একজন রক্তমাংসের মানুষ।
কাল সন্ধেবেলায় রান্নার কাজে যখন ব্যস্ত ছিলাম, হঠাৎ খেয়াল করলাম আলোটা কে যেন নিভিয়ে দিল। আমি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম এরপরই রান্নাঘরের দরজাটা নিঃশব্দে কেউ যেন বন্ধ করে দিল। সবই বুঝেছিলাম। তবু টুঁ শব্দটিও করিনি। খানিকবাদে খেয়াল করলাম আমার শাড়ি নেমে আসছে খসখস। বুকে অজানা হাতের ছোঁয়া, ব্লাউজটা আমার মুখ থুবড়ে পড়ল। পিঠে নিঃশ্বাসের ওম। অচেনা নয় তবু অন্য অনুভূতি। একবারও তো বাধা দিই নি।
কেন? কেন? কেন আমি ওকে আটকালাম না? মন আজ শুধু নিজেকে বলে, ছিঃ স্বর্ণা, ছিঃ। ধিক তোমাকে। কিন্তু অন্তর্যামী, তুমি তো সব জানো। পারো তো আমাকে ক্ষমা করে দিও।
১৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯
কত যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়। এই আজ যেমন। রোজকার মত গতকালও অনুপ মদ খেয়ে হাসপাতালের মাঠে পড়েছিল। ফেরার পথে হয়েছে এক অ্যাক্সিডেন্ট। মোটরসাইকেলের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। রোজই যেমনটা হয় আর কি। যাই হোক চোট নাকি বিশেষ কিছু লাগেনি। শুধু পায়েই যা অল্পবিস্তর লেগেছিল। একটা লোক ওকে রিক্সা করে নিয়ে এলোঅদ্ভুত ব্যাপার! রিক্সার ভাড়া ঐ লোকটাই মিটিয়ে দিল। বলে, মোটরসাইকেলটা নাকি ও চালাচ্ছিল, তাই দোষটা ওরই। আচ্ছা, এমন লোকও কি আজকালকার দিনে পাওয়া যায়? আমি অনুপের জন্য বিশেষ একটা চিন্তা করিনি, কারণ প্রতিদিনই ও এরকম মদ খেয়ে টলতে টলতে বাড়ি ফেরে। ফেরার সময় কোথাও না কোথাও চোট পায়। আগে এসব নিয়ে চিন্তা করতাম। ওকে মদ খেতে বারণ করতাম। কিন্তু তার ফলটা যে কি হত সে তো তুমি জানোই। তাই আজকের ঘটনাটায় বেশী একটা ভাবিনি। কিন্তু অবাক লাগল আমার ঐ লোকটার আচরণে। আরো আশ্চর্য হয়েছিলাম, যখন ও পরের দিনও এলোঅনুপ কেমন আছে জিগ্যেস করল। অনুপ সেদিন অনেকখানি সুস্থ হয়ে গেছিল। গরম জলে পা সেঁকে স্বাভাবিকভাবেই হাঁটতে পারছিল। লোকটার সাথে পরিচয় করে আমার ভালই লাগল। বেশ গুছিয়ে কথা বলতে জানে। আমাকে সম্মান দিয়ে জানে। আমাকে ‘ম্যাডাম’, ‘আপনি’ করে কথা বলছিল। এখানে অন্য কেউ তো আমায় সে সম্মান দেয় না। তাছাড়া জানলাম ওর ডাক্তারি বিদ্যেও জানা আছে। হাতুড়ে ডাক্তার। আমাদের এখানে অনেকেই তাই ওর ওপর ভরসা করে। কিছু ওষুধও নিয়ে এসেছিল সেদিন। আর আলাপ হলেই যেমনটা বলতে হয় তেমনি আমিও বলে দিলাম, আবার আসবেন কিন্তু। জানি না, আর আসবে কিনা। যাবার আগে নামটা শুধু বলে গেল, স্মরণ্য।
সত্যি বলতে কি, এমন মানুষ আমি যেন বহুদিন পরে দেখলাম। এ বাড়ির সকলেই আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। অনুপের মা-বাবা আমায় গালাগালি দেয়, নানা ছোটখাটো কাজ নিয়েই তিরস্কার করে। আর অনুপ তো আগে রোজই মারধোর করত। আমি মাথা পেতে সব সহ্য করি। কিন্তু এখন বুঝি আমিও শুধুই অবহেলার যোগ্য নই। আমায় সম্মান না দিতে পারলে এবার আমিও ছেড়ে কথা বলব না।
৭ই অগাস্ট, ১৯৯৩
পাঁচ বছর পা হয়ে গেল আমাদের বিয়ে। তবুও মা হতে পারলাম কই? এখানে এসেই বুঝেছি এরা আমায় কেউ ভালবাসে না। এমনকি এদের নিজেদের মধ্যেও কোন মিলমিশ নেই। অনুপ নিজের মা-বাবাকে জোচ্চোর বলে, বেইমান বলে। ছিঃ, এই আমার স্বামী? অবশ্য স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতেও যার দ্বিধা হয় না তার মুখে কোন ভাল কথার আশা না করাই ভাল। দিনরাত মুখে গালাগালি আর অসভ্যতা। মদ, গাঁজা কি না খায়! বারণ করলেই গায়ে হাত তোলে। তাই ঠিক করেছি আর কিছু বলব না। ওর যা ইচ্ছে ও তাই করুক। কপাল করে স্বামী পেয়েছি বটে! আশা ছিল, ঘরে নতুন কেউ এলে আমার তাকে নিয়েই সময় কাটবে। তাকে আমি ভাল করে মানুষ করব। যেমন করে আমার মা-বাবা আমায় করেছিল। তাকে কিছুতেই আমি অমানুষ হতে দেব না। কিন্তু সবটাই কপাল। আমাদের কোন বাচ্চাই হল না।
শেষ লেখাটা ডায়রির প্রথম পাতায় ছিল। পড়া শেষ হতেই স্বর্ণা একটা পেন নিয়ে ডায়রির শেষ পাতাটায় লিখতে শুরু করে –
১৪ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩
আজকের দিনটা বড় আনন্দের। কারণ আজ দুটো খুনিই সাজা পেয়েছে। যাবজ্জীবন হয়েছে ওদের। স্মরণ্যের আত্মা আজ কিছুটা হলেও শান্তি পেল। আমার এতদিনের প্রতীক্ষা আজ শেষ হল। একথা মানি যে অনুপও দোষী। তাই নিয়মমতো ওরও শাস্তি হওয়া উচিৎ ছিল। অন্তত ওর শাস্তিটা আমি চেয়েছিলাম। কিন্তু ওর সাজা হল না
স্মরণ্য, তোমার সাথে তো শেষ দেখাটুকুও আমার হল না। অনুপ আমাদের মধ্যেকার সম্পর্কটা বুঝতে পেরেছিল। তাই তো ও তোমায় সরাতে চেয়েছিল। কিন্তু ও এটা জানে না যে টুটুন ওর নয় বরং তোমার ছেলে। চিন্তা নেই, এটা কোনদিন ও জানবেও না। এসব নিয়ে আর ভাবি না। কারণ অনুপ যদি দিনের পর দিন আমায় অসম্মান করতে পারে, আমার গায়ে হাত তুলতে পারে, তবে আমারও সহ্যের সীমা আছে। অনুপ সেটা বোঝেনি, কেউ বোঝেনি সেসব। কিন্তু তুমি তো সবই জানতে। কেউ না বুঝুক, একমাত্র তুমিই আমায় বুঝেছিলে। তোমার কথা আমার খুব মনে পড়ে স্মরণ্য। আর কিছু লিখব না। শুধু এটুকুই চাই, তুমি যেখানেই থাকো যেন শান্তিতে থেকো। আমি তো এখানে আছি শুধু টুটুনের জন্য। ওকে মানুষ করতে পারলেই আমার কাজ শেষ। তারপর আমিও চলে যাব তোমার কাছে স্মরণ্য। সেখানে আমাদের কে বাধা দেবে?

স্বর্ণা হঠাৎ খেয়াল করে ওর চোখদুটো জলে ভরে গেছে কোন এক অব্যক্ত কষ্টে। আর ঠিক তখনই সে শুনতে পায় অনুপের কাশির আওয়াজ, খুব কাছ থেকে।  

প্রকাশিত - ইতিকথা ওয়েবম্যাগাজিন