সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

আশঙ্কার আবহে, যুক্তিবাদীদের কোন স্থান নেই



গৌরী লঙ্কেশ হত্যার দুদিন পরে, তার বন্ধু এবং তার একনিষ্ঠ সমর্থক কন্নড় লেখক যোগেশ মাস্টার দেখলেন একজন তাঁর গাড়ি দাঁড় করালো, ছবি তুলল এবং তারপর পালিয়ে গেল। “ঐ রাত্রেই (বৃহস্পতিবার) একটা লোক কিছুক্ষণ ধরে সন্দেহজনকভাবে আমাকে অনুসরণ করছিল। আমি বেশ কিছুদিন ধরেই ভয়ে ভয়ে আছি। কিন্তু এখন গৌরী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ভয়টা আরো বেড়েছে” – মি. যোগেশ বললেন।

২০১৫ সালে এম. এম. কালবুর্গি খুন হওয়ার পরে মি. যোগেশকে নিরাপত্তার কারণে একজন বন্দুকধারী দেওয়া হয়েছিল (ঘটনাক্রমে সেটা লঙ্কেশের জোরাজুরিতেই)। এখন আবার পুলিশী নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

১৮ জন লেখক, যুক্তিবাদী এবং কর্মীদের মধ্যে মি. যোগেশ একজন যাদের পুলিশী নিরাপত্তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে – প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে ভয়ের আবহ তৈরী হওয়ার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
এই লেখক বিতর্ক, ভয় এবং অপমানের সম্মুখীন আগেও হয়েছিলেন যার শুরুটা ছিও ২০১৩ সালে তার ‘দুন্ধি’ নামে একটি বই প্রকাশের সাথে সাথে। বইটিতে গণেশের উপস্থাপনায় দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলি খাপ্পা হয়েছিল এবং ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার কারণে তাঁকে অল্পকালের জন্য কারাবাসও বরণ করতে হয়। তখন থেকেই প্রতিবাদ তাঁর পিছু ছাড়েনি এবং মার্চ মাসে দাবানগেরেতে লঙ্কেশের বাবার স্মরণে একটি অনুষ্ঠানসভায় কিছু লোকের একটি দল এসে তার মুখে কালো তেল ঢেলে দেয়।

তিনি বলেন তাঁর কাজ কখনও দমে যায়নি। বিতর্কিত লেখক হিসেবে তাঁর খ্যাতির কারণে তাঁকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। থিয়েটার ও অন্যান্য লেখালিখির ক্ষেত্র যা তাঁর আয়ের একমাত্র উৎস ছিল, গত দুবছর ধরে তা ক্রমেই স্তিমিত হয়ে এসেছে।

“আমি বিপজ্জনক বলে লোকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো বন্ধ করেছে। ব্যবস্থাপকদের আগে পুলিশে খবর দিতে হয় এবং যাতে কোন গণ্ডগোল না বাধে তার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়। কে এইসব ঝামেলা নিতে চায়?” তিনি জানালেন।


হিটলিস্ট তালিকা
 
হুমকি ও হত্যা – এই একটি সূত্র যোগেশের সাথে মিলিয়ে দিয়েছে সুদূর ম্যাঙ্গালোরের যুক্তিবাদী কর্মী নরেন্দ্র নায়কেকও। নরেন্দ্রবাবুকে এখন দুজন দেহরক্ষী পালা করে নিরাপত্তা দিচ্ছে। “আমি তথাকথিত ঐ হিটলিস্টদের তালিকায় ৭ নম্বরে ছিলাম। তবে এখন একটা ঘর এগিয়েছি”, ওনার গলায় ব্ল্যাক হিউমার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস-বিরোধী সংস্থা ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান র‍্যাশানালিস্ট অ্যাসোশিয়েশনের ৬৬ বছর বয়সী এই কর্মাধ্যক্ষ শত্রুপক্ষের একটি তালিকা তৈরী করেছেন যার মধ্যে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন, বিভিন্ন মঠ এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলি রয়েছে।

২০১৬ সালে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হলে তিনি পুলিশে একটি অভিযোগ দায়ের করেন; এবছরের শুরুতে দুজন ব্যক্তি তাঁকে অনুসরণ করছে এই মর্মে তিনি থানায় অভিযোগ জানালে তাঁকে অতিরিক্ত পুলিশী নিরাপত্তা দেওয়া হয়।

পরিবারের চাপ এবং প্রাণনাশের হুমকির প্রত্যক্ষ চাপ সত্ত্বেও এই যুক্তিবাদী বলেন শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া ছাড়া তাঁর আর অন্য কোন পথ নেই। “গৌরীর মৃত্যুর পর থেকে সাময়িকভাবে বাইরের দেশে চলে যাওয়ার জন্য আমার কাছে কল আসছে। কিন্তু সমাজে যখন এত অন্যায় আর ত্রুটি রয়েছে, তখন কেন সেখান থেকে পালিয়ে যাব?’ নায়েকের প্রশ্ন।


বর্ধিত সতর্কতা
 
মি. নায়েকের মতোই একই হিটলিস্টে রয়েছেন কে. এস. ভগবান। এই লেখককে নিয়ে তিন দশক ধরে বিতর্ক চলে আসছে এবং ২০১৫ সালে হিন্দু পুঁথির ওপর তাঁর বক্তব্যের কারণে তাঁকে আক্রান্ত হতে হয়। দাবী করা হয়, তাঁর বক্তব্য ছিল নাকি হিন্দুধর্মের পক্ষে অবমাননাকর। প্রফেসর কালবুর্গির হত্যার পর এই অনলাইন পোস্ট অনুযায়ী মহীশূরের এই লেখকই ছিলেন পরবর্তী শিকার। তিনি কোথাও বেরোলে, এখন সবসময়ই তাঁর সাথে দুজন বন্দুকধারী থাকে এবং গৌরী লঙ্কেশের হত্যার পরে আরও দুজন নিরাপত্তা কর্মীকে রোজই কয়েক ঘণ্টার জন্য তাঁর সাথে রাখা হয়ে।

একদিকে যেমন বর্তমান আবহ ক্রমেই আতঙ্কগ্রস্ত ও একমুখী হয়ে পড়ছে, তেমনি অন্যদিকে কিন্তু মি. ভগবান তাঁদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে আশাবাদীই রয়েছেন। “এখন তো ভালোই বিক্রি হচ্ছে আমার বই, আর এখন আরো বেশি করে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাচ্ছি। আসলে, বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে একটা বড় অংশ আছে যারা নতুন ধারণা চায় যেগুলো বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত”। তিনি বললেন।

তবে দক্ষিণ মহারাষ্ট্রে যেখানে ২০১৩ সালে নরেন্দ্র দাভোলকার ও ২০১৫ সালে গোবিন্দ পানসারে খুন হয়েছিলেন সেখানে কিন্তু একটা ভয়ের আবহ রয়েই গেছে।

মহারাষ্ট্রের কৃষকদের স্বার্থে কাজ করে এমন একটি বামপন্থী সংগঠন ‘শ্রমিক মুক্তি দল’ – এর ৬৮ বছর বয়সী এক প্রবীণ কর্মী ভরত পতঙ্কর জানেন যে কোন হুমকিকেই অগ্রাহ্য করা যায় না। তিনি প্রথমে পুলিশী নিরাপত্তা নিতে অস্বীকার করলেও এখন একজন বন্দুকধারী তাঁর সাথে রাখতে সম্মত হয়েছেন। তিনি বলেন, জাতিভেদ প্রথা নির্মূল করবার পক্ষে এবং মুসলমান ও দলিতদের মত অত্যাচারিত গোষ্ঠীগুলিকে সংঘবদ্ধ করবার লক্ষে তিনি কাজ করেছেন বলেই হিন্দু মৌলবাদী দল ‘সনাতন সংস্থা’র তিনি চক্ষুশূল হয়েছেন; উল্লেখ্য, দুজন যুক্তিবাদীকে খুনের অপরাধে এই ‘সংস্থা’র সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পানসারে হত্যার দিন ‘সংস্থা’র মুখপাত্র ‘সনাতন প্রভাত’-এর একটি কপি মি. পতঙ্করের বাড়ী সামনে ফেলে যাওয়া হয়। “শুধু আমার আর আমার গ্রামের নাম তাতে লেখা ছিল। এটাই কি একটা স্পষ্ট হুমকি হয়?’ তিনি জানতে চাইলেন।

(তথ্য দিয়েছেন অলোক দেশপাণ্ডে, মহারাষ্ট্র এবং কে. সি. দীপিকা, বেঙ্গালুরু) 

[লেখাটি 'দ্য হিন্দু' পত্রিকার ১০.০৯.২০১৭ (রবিবার) সংখ্যার একটি নিবন্ধ থেকে অনুদিত।]