মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট, ২০১৪

এভাবেও মরা যায়

‘প্রশান্ত পৌঁছেছে?’ টেনে টেনে কথাগুলো উচ্চারণ করে দৃপ্ত। পাশে মৈত্রেয়ী দাঁড়িয়ে। উত্তর করে, ‘হ্যাঁ, এতক্ষণে মনে হয় পৌঁছে গেছে। একটু বাদেই ফোন করব’।
পাশ ফিরে শোয় দৃপ্ত। তার আর কথা বলার মত অবস্থা নেই। কিন্তু মনের চিন্তাটা থেকেই যায় তেমনিইউৎসব পত্রিকাটা কি তার লেখাটা ছাপাবে? প্রশান্ত জেনে আসবে। দৃপ্ত অনেক সাধ করে পাঠিয়েছে লেখাটা। অনেক দিন ধরে ভেবেচিন্তে যত্ন নিয়ে লিখেছে সে।
আপনারা হয়ত ভাবছেন এই দৃপ্ত আবার কে? কোন বড়সড় লেখক বোধহয়। কিন্তু তাহলে একটু বেশিই চিন্তা করে ফেলেছেন। না দৃপ্ত কোন বড় লেখক তো নয়ই, এমনকি ওর এই লেখক পরিচয়টাও বিশেষ বন্ধুবান্ধব ছাড়া আর কেউ জানে না। ওর দৌড় ঐ লিটল ম্যাগাজিন অব্দিই। এক অজানা অখ্যাত শখের লেখক, কে তাকে পাত্তা দেবে?
কিন্তু ওর বড্ড ইচ্ছা, সে বড় কোন পত্রিকায় লেখে। সেইমত গতবছর সে উৎসব পত্রিকায় তিনখানা লেখা পাঠিয়েছে। একটারও উত্তর আসেনি। আর আসবেই বা কেন? সে তো আর কোন কেউকেটা কেউ নয়। তাই উৎসবের মত বাংলার একটা প্রথম সারির পত্রিকায় তার স্থান কি করে হবে? এই কথাটাই বোঝানো যায় না দৃপ্তকে। সে ঠিক করে রেখেছে, তাকে বড় পত্রিকায় লিখতেই হবে। আর তাছাড়া উৎসবে যে মানের লেখা ছাপায়, তার লেখা সে তুলনায় কোন অংশে কম নয়বরং অনেক ফালতু লেখাও সে পেয়েছে উৎসবে। কিন্তু তার এইসব কথা কে শোনে?
শোনে শুধু একজন। সে প্রশান্ত। লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক কাম দৃপ্তর বন্ধু। শুধু বন্ধু বলে নয়, একজন সম্পাদক হিসেবেও তার দৃপ্তর লেখা ভাল লাগে। আর তার এটা মনেও হয়, দৃপ্তর লেখাগুলো লিটল ম্যাগাজিনের মত অস্থায়ী জায়গায় নয়, বরং কোন একটা বড় পত্রিকার ঘরে সংরক্ষিত থাকাই উচিতকিন্তু কে নেবে তার লেখা? এখানেও যে চলে কম্পিটিশন, আর তার চেয়েও বেশি লবিবাজি।
তবু বলব, সবটাই ঠিক চলছিল। লিখতে লিখতে একদিন হয়ত দৃপ্তর কাছে একটা বড় সুযোগ এসেও যেতে পারত। কিন্তু হঠাৎ দিক গেল ঘুরে। দৃপ্তকে মারণ রোগে ধরল। এই রোগের কোন চিকিৎসা নেই। এমনকি তার রোগটা যে কি তাও ঠিকমত বোঝা যাচ্ছে না। সেদিন অফিস থেকে ফিরে হঠাৎ বলল, ‘শরীরটা খুব দূর্বল লাগছে। খুব কষ্ট হচ্ছে’। এই ছিল শুরুটা।
সেদিনটা গেল। পরেরদিন অবস্থার আরও অবনতি হল। সক্কালবেলা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান হয়। ডাক্তারেরা ঠিকমত বুঝেই উঠতে পারল না, রোগটা কি? এদিকে দিনকে দিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। এখন তো সে উঠে ঠিকমত দাঁড়াতেও পারে না। বেডপ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবকিছুই শুয়ে। মাঝেই মাঝেই এখন স্যালাইন দিতে হচ্ছে। আর পালস রেট নামছে ধীরে ধীরে। কিন্তু ক্রমাগত সেটা নামছেই। কি হল দৃপ্তর? বয়সও যে তার খুব বেশি তাও নয়। গত অগাস্টে সে চল্লিশে পড়েছে।
এর মধ্যে সে লিখেছে বারোটা গল্প, আর কিছু কবিতা। সবকটারই স্থান হয়েছে লিটল ম্যাগে। বেশিরভাগই প্রশান্তর পত্রিকায়। কিন্তু শেষ তেরো নম্বর গল্পটা সে প্রশান্তকে দেয়নি। দিয়েছে উৎসব পত্রিকায়। যদিও সেটা নিয়ে যাওয়ার ভার পড়েছে প্রশান্তরই।
এদিকে প্রশান্ত তার বন্ধু। দৃপ্তর এই সময়ে তার পাশে কেউ নেই যে একটু হেল্প করবে। মৈত্রেয়ী একা হাতে আর কত সামলাবে? তাই হাসপাতালে বিভিন্ন কারণে ছোটাছুটিও করতে হচ্ছে প্রশান্তকে। একটা মানুষকে এই সময়ে সেবাশুশ্রূষা করাও কি কম খাটনি নাকি? তাই এখন উৎসবের অফিসে যাওয়া মানে সময় নষ্ট করারই নামান্তর। কিন্তু দৃপ্তকে সেসব বোঝাবে কে? সে গোঁ ধরেছে এখুনিই তাকে যেতে হবে। পাণ্ডুলিপিটা সম্পাদকের হাতে দিয়ে জেনে আসতে হবে এটা ছাপানো হবে কি হবে না?  অগত্যা বন্ধুর কথায় সে উৎসবের অফিসে যেতে বাধ্য হল। ঠিক করল, সেখানে গিয়ে সে সম্পাদককে রিকোয়েস্ট করবে। দেখাই যাক না কি হয়? দৃপ্তর জীবনের আর হয়ত কোনই আশা নেই। তার এই শেষ ইচ্ছাটুকুর কি একটুও মূল্য কেউ দেবে না?
অফিসটা বেশি বড় নয়। সামনেটায় একটা লন। সামনে একটা রিসেপশনের মত কাউন্টারও রয়েছে। আর তার পাশ দিয়ে গেলেই একটা কাঁচের ঘর, দরজার সামনে লেখা - ঠেলুন। ঠেলে ঢুকতেই কম্পিউটারের সামনে বসা ভুঁড়িওয়ালা লোকটা জিজ্ঞেস করে, ‘কি ব্যাপার?’ গলাটায় বেশ কর্কশভাব স্পষ্ট।
প্রশান্ত সম্পাদককে তার সমস্ত কথা বলেতারপর ব্যাগ থেকে পাণ্ডুলিপিটা বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। একটু অনিচ্ছা সত্ত্বেও লোকটা সেটা নেড়ে চেড়ে দেখে। তারপর দু-একটা পাতা উল্টেই একটা বেল টেপে।
বেলের আওয়াজ শুনে দরজা ঠেলে ঘরে আসে একটা অল্পবয়েসী ছেলে। তার দিকে লোকটা পাণ্ডুলিপিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘পড়ে দেখো তো। আমাদের পত্রিকায় দেওয়া যাবে কিনা?’
তারপর প্রশান্তর দিকে ফিরে বলে, ‘আপনি একটু ঘুরে আসুন। এখন ওর হাতে কাজ আছে। কাজ মিটিয়ে আপনার গল্পটা ও পড়ে দেখবে। এই ধরুন আধঘণ্টা’। একটু থেমেই সে আবার বলে, ‘ও-ই সব সিলেকশনের কাজগুলো করে’। প্রশান্ত নিজের পরিচয় দিয়ে আর বলেনি যে সেও একটা পত্রিকা চালায়, আর সেখানে লেখাগুলো সে নিজেই বাছাই করে। কি লাভ বলে? সে তো লিটল ম্যাগাজিনের বেশি আর কিছু চালায় না। কতই বা আর লেখা জমা পড়ে তাতে। বরং এসব বললে ফালতু একটা বিতর্ক বাধবে।
সে বেরিয়ে গেল অফিস থেকে। কিছু টুকটাক কেনাকাটি ছিল। বাড়ির জন্য এক কেজি চিনি নিয়ে যেতে হবে। আর তার সাথে মুসুর ডাল। এইসব করতে করতে আধঘণ্টা নয়, কেটে গেল একেবারে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। দ্রুত পা চালিয়ে সে ঢুকল আবার উৎসবের অফিসে।
অফিসে ঢুকে এবার আর সম্পাদকের সাথে দেখা হল না। সামনেই একটা বেঞ্চে বসে ছিল সেই ছেলেটা, গল্প সিলেকশনের দায়িত্ব যার হাতে। সে প্রশান্তকে ইশারায় ডাকে। তারপর বলে, ‘শুনুন, আপনিই একটু আগে গল্প দিয়ে গেছিলেন না?’ প্রশান্ত মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘হ্যাঁ। ওটা কি সিলেক্টেড হয়েছে?’

‘প্রশান্ত এখনো ফোন করল না?’ একটু কথা বলেই হাঁপিয়ে ওঠে দৃপ্ত। তার চোখদুটো একেবারে ঘোলাটে হয়ে আসছে। জিভ বেরিয়ে আসছে মাঝে মাঝেই। এটুকু একটা কথা বলেই সে হাঁপাতে থাকল। মৈত্রেয়ী বলে, ‘পৌঁছেছে তো অনেকক্ষণ। এখনই করবে হয়ত’। কথাটা শেষ না হতেই তার মোবাইলটা বেজে উঠল।
ফোনটা হাতে তুলে সে বলে, ‘হ্যাঁ প্রশান্ত বল কি খবর? ও আচ্ছা, আচ্ছা। ঠিক আছে। হ্যাঁ রাখ। আর তাড়াতাড়ি চলে এস। এখানে কাজ আছে’।
‘কি...কি বলল গো? প্রশান্ত কি বলে?’ দম নিতে নিতে কোনরকমে বলে ওঠে দৃপ্ত।
মৈত্রেয়ী মৃদু হেসে বলে, ‘তোমার লেখা সিলেক্টেড হয়েছে। ওদের খুব পছন্দ হয়েছে লেখাটা’।
‘আঃ, কি শান্তি!’ যেন বুক থেকে একটা পাথর নেমে গেল তার। এখন সে নিশ্চিন্ত। বুকে হাত বোলাতে বোলাতে সে মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগল। তারপর মৈত্রেয়ীর দিকে তাকিয়ে কিসব বলতে চেষ্টা করল। মৈত্রেয়ী বলে, ‘কি? কিছু বলবে?’
কানটা তার মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে কথা শুনতে হয়। সে বলছে, ‘জানলাটা খুলে দাও না। বড্ড ভাল লাগছে এখন। আঃ, কি শান্তি!’ মৈত্রেয়ী জানলাটা খুলে দিতেই একটুকরো রোদ এসে দৃপ্তর গায়ে লাগে। শীতের মৃদু রোদ। বড্ড ভাল লাগে তার। বিছানায় মড়ার মত শুয়ে আছে দৃপ্ত। কিন্তু তার চোখদুটো খুব উজ্জ্বল লাগছে এখন। এতক্ষণ তো এমনটা লাগছিল না।
         *                                          *                                  *
এর প্রায় মিনিট পঞ্চাশ বাদে হন্তদন্ত হয়ে যখন প্রশান্ত হাসপাতালের ঘরে ঢোকে, তখন মৈত্রেয়ী সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা ডেডবডির ওপরে মুখ ঢেকে কাঁদছে। দৃপ্ত মারা গেছে। কথাটা বারবার বাজতে লাগল প্রশান্তর। তারও দুচোখ ভ’রে জল আসতে লাগল।
ইতিমধ্যে ঘরে আরও অনেকে এসে গেছে। এরা বেশিরভাগই দৃপ্তদের আত্মীয়স্বজন। খানিকবাদে নিজেকে সংবরণ করে মৈত্রেয়ী প্রশান্তকে বলেছিল, ‘তোমার ফোনটা পেয়ে ও খুব খুশি হয়েছিল। ও বোধহয় ভাবতেও পারেনি ওর লেখা ওরা নেবে। কিন্তু জানো, ও খুব আশা করেছিল। যাক, মানুষটা অন্তত একটা শান্তি নিয়ে যেতে পারল’।

মৈত্রেয়ীর কথা শুনে প্রশান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর বলে, ‘ওর লেখা ওরা নেয়নি মৈত্রেয়ী। আমি ওটা বানিয়ে বলেছি’। একটু থেমে সে আবার বলে, ‘কি লাভ যাবার বেলায় একটা মানুষকে কষ্ট দিয়ে? তার চেয়ে একটা মিথ্যে নিয়ে মরাও অনেক ভাল। তাই না?’ 

রবিবার, ৩ আগস্ট, ২০১৪

একটা জৈবিক কারণ ও তার ফলাফল

১. কারণ -
কি ভাল লাগে তোমার?
ঐ যে, ঐ ওরকম একটা হীরের হার। হিঃ, হিঃ। ধুর, কি বলছি! এসব আমি কোনদিনই পাব না। কতই না দামী এসব!
তোর কথা শুনে সেদিনই ঠিক করেছিলাম, কিনে ফেলব ওটাতোর ফর্সা ঐ সরু গলাটায় বেশ মানাবেতুই জানতিস, পাঁচ হাজারী চাকরি আমার। মায়ের গেঁটে ব্যথায় চিকিৎসা চলছে।
তাই জ্বরের ঘোরে পড়ে থাকতাম বেবাক, ডাক্তার না ডেকেদু-একদিন না খাওয়া, একবেলা আধপেটা ইত্যাদিতে জমেছিল বেশ কিছু। তাতেই কিনলাম ঐ হারটা, মনে কি তেজ তখন! আরও অনেক আশা নিয়ে গেছিলাম তোর কাছে, হয়ে যাক একটা সারপ্রাইজ।
ভুল ভাঙল। সারপ্রাইজ পেলাম আমিই, যখন তোকে দেখলাম সিটি সেন্টারে ওর হাত ধরে। কি সুন্দর তোর ব্লু টপ আর ব্ল্যাক জিন্স...ওর পাশে তোকে বেশ খুশি খুশিই লাগছিল। স্বপ্নের ঘোর কাটল সেদিন। এ ভুল আমার আর হবে না রে। কিন্তু কি জানিস, নিজেকে বড্ড একা লাগছিল তখন, খুব একা। কেউ চায় না আমায়? কেউ না?

২. নিজের মাংস বেচার দিনে –
অমুকবালা বালিকা বিদ্যালয়। ক্লাস টেনের থার্ড পিরিয়ডটা আজকে অফ যাবে। মিস বেড়াতে গেছে।
অগত্যা শুরু হৈ-হট্টগোল। অন্যদিন হলে সারাটা পিরিয়ড চলত এভাবেই। কিন্তু আজ ব্যতিক্রম। সারাটা ক্লাস হঠাৎই চুপ মেরে গেল। কারণ? ক্লাসরুমে একটা লোক এসেছে।
লোক? এই স্কুলে একজন বুড়ো ক্লার্ক ছাড়া আর একটাও পুরুষ নেই। এমনকি দারোয়ানটাও এখানে – ‘পিসি’এখানে এভাবে একটা বাইরের লোক ঢুকে পড়ল কিভাবে? মেয়েরা কেউ কেউ বিস্মিত, কেউ বা ভীত। কি চায় এ? দাড়ি, গোঁফ কামানো, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। জিন্সের প্যান্ট আর লাল টি-শার্টে ওকে তেইশের ওপরে মনে হয় না। ঢুকেই দরজাটা ভেজিয়ে দেয় ছেলেটা।
‘তোমরা সকলে বড় হয়েছ তো? আই মিন অ্যাডাল্ট। মানে তোমাদের সকলেরই বয়স মোটামুটিভাবে ষোলরই আশেপাশে, তাই তো? বাইরের অনেক দেশে এটাই এজ অফ কনসেন্ট’।
লোকটার কথার মাথামুণ্ডু খুঁজে পায় না কেউ। থবির হয়ে বসে থাকে মেয়েগুলো। ওদেরই মধ্যে একজন ম্যাডামকে ডাকবে বলে উঠতে যায়। আর ঠিক তক্ষুনি তার পা দুটো যেন আটকে যায় আপনা থেকেই। ছেলেটা হঠাৎ ওর লাল টি-শার্টটা খুলে ফেলে টিচারের বেঞ্চটার ওপর রাখল। ‘ইমা...’ কেউ কেউ চাপা শব্দ করে। কেউ বা আড়ালে মুখ টিপে হাসে। বেশ পেশীবহুল শরীর ছেলেটার।
বেঞ্চের দুটো রোয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে এবার কোমরের বেল্টটা আলগা করে। মূহুর্তমাত্র কাউকে ভাবতে না দিয়ে জিন্সটার হুক, চেন খুলে ফেলে সে। প্যান্টটা নেমে আসে আপনা থেকেই। ‘ইসসস...’ শব্দটা ক্লাসরুমের দেওয়ালে দেওয়ালে ফেরে। দু-একজনের দাঁত বেরিয়ে পড়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও। তবু বেশিরভাগই আড়চোখে দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। অনেকে আবার ভয়ে কাঁপছে।
টিচারের টেবিলটা সামান্য উঁচু একটা কাঠের পাটাতনের ওপর। এবার তার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে সে জাঙিয়াটাও নামিয়ে দেয় দ্রুত। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ায় সে। চল্লিশটা মেয়ে তখন তার সামনে।
‘দেখো, দেখে নাও ভাল করে। আজই মনে হয় প্রথম এতগুলো মেয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে।‘ কথাগুলো যেন কাউকে নয়, নিজেই নিজেকে বলছে ছেলেটা।
মিনিট তিন-চার বাদে ছেলেটা নিজের পোশাক পড়ে নেয়। তারপর চটপট বেরিয়ে যায় ক্লাসরুম ছেড়ে।
খবর পেয়ে হেডমিস্ট্রেসের তো চক্ষু চড়কগাছ। ‘কি সাঙ্ঘাতিক কথা রে!!! এসব সত্যি?’ পরেরদিন অভিভাবকরা এসে অভিযোগ করে, ‘কি হচ্ছে কি এসব? উটকো পাগল ছাগল স্কুলের মধ্যে ঢুকে পড়ছে, আর স্কুলের কোন নজর নেই?’ এমনকি রিপোর্টাররাও চলে এল রসালো খবর নিতে।
পরের দিন কাগজে ফলাও করে ছাপানো হল ঘটনাটা। বলা হল, ‘এটা নিশ্চয়ই কোন পাগলের কাজ।‘

৩. আজ –

বাড়িতে আমি হাসছি শুধু। আমার কথা আজ খবরের কাগজে! হাঃ হাঃ হাঃ...কেউ ভাবতে পেরেছে? আমার নাকি কোন দাম নেই? আমায় কেউ চায় না? হাসতে থাকি আমি, নিজেকে ব্যঙ্গ করেই। তারপর গালে হাত দিলে টের পাই, চোখের জলে ভ’রে গেছে সারাটা মুখ। 

শনিবার, ২ আগস্ট, ২০১৪

উত্তরণ

বাইরে গেটের আওয়াজ আসতেই মামার ডাক। ছোটমামার এখন বাজার নিয়ে আসার সময়। জোর গলায় ডাকছে সে রিনির নাম ধরে। রিনি দোতলা থেকে নেমে দরজা খোলার আগে একবার কলিং এর ঘণ্টাও বেজে ওঠে।
-‘আঃ। যাচ্ছি বাবা, যাচ্ছি।‘ চাপা গলায় মুখ ঝামটা দেয় সে
দরজা খুলতেই ‘ওঃ হাত ব্যথা হয়ে গেল’ বলে মামা বাজারের দুটো ব্যাগ ঘরে এনে রাখে। ব্যাগ ভর্তি বাজার। একটাতে উঁকি মারছে লাল শাক আর ডাঁটাআর অন্যটায় আলু পেঁয়াজ। বছর চল্লিশের ধ্রুব দে, তার মাথাজোড়া টাক। মোটা শরীর, তাই গরম একটু বেশিই লাগে। টাকের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। মাথার ঘাম রুমালে মুছে নেয় একবার।
-আর কি কি লাগবে বল। ওষুধ-ফষুধ যা লাগবে লিখে দিসআঃ, আর পারিনা। বলতে বলতে সে ঘরের ছোট্ট খাটটার ওপর বসে। একেই ঘরটা ছোট তার ওপর টিভি, চেয়ার-টেবিল, কাপড়চোপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে একেবারে জবরজং হয়ে আছে। খাটের ছত্রিটাও রেহাই পায়নি – রিনির মায়ের শাড়ি, রিনির চুড়িদারে সেও মুখ লুকিয়েছে।
-লাগবে তো অনেককিছুই। দাঁড়াও ফর্দ করেছি। আনছি। বলতে বলতে রিনি টিভির নিচে শোকেসের ভেতরের কাগজপত্র ঘাঁটতে থাকে।
মামা জলের বোতলটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে বলে, দিদি কোথায়? দিদিকে দেখছি না।
মামার এমনিতেই জোরে বলা স্বভাব। আর সেটাই রিনির পছন্দ হয় না। সে তাকে ধমকে ওঠে, ‘আঃ আস্তে বল না।‘ তারপর ‘মা ওপরে ঘুমোচ্ছে’ বলে সে একটা কাগজ মামার দিকে বাড়িয়ে দেয়। ‘এ নাও। এর মধ্যেই লেখা আছে কি কি আনতে হবে। মুদির দোকানের জিনিসগুলো কিন্তু ঠিকমত আনবে। আর এ নাও প্রেসক্রিপশন। এর থেকে দুই আর তিনের ওষুধ দুটো বাদে বাকি সব আনবে। মনে থাকবে তো? যদি ভুলে যাও, তাহলে আমাকে ফোন কোরো। কিন্তু উল্টোপাল্টা ওষুধ এনো না যেন।
সব বুঝিয়ে দিতে মামা ঘাড় নাড়ে। তারপর ফের বলে, তোর মাকে একবার ডাক না। একটু কথা বলি।
রিনি উফফফফ করে শ্বাস ছেড়ে দুপদাপ আওয়াজে ওপরের ঘরে উঠে যায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁদিকে অন্ধকার ঘর। ঘরের সম্বন্ধে তাই কোন ধারণা হয় না। দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে রিনি বলে, মামা ডাকছে। নিচে যাবে? রিনি জানে মা ঘুমিয়ে নেই। চুপচাপ শুয়ে আছে।
কিছুক্ষণ কোন সাড়া আসে না। রিনি আবার ডাকে, চল। কথা বললে একটু ভাল লাগবে। এবার মা আস্তে করে বলে, ধ্রুব এখন এসেছে কেন?
রিনি বলে, বাজার দিতে।
মা চুপঅন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। শুধু গলা শোনা যায়, না, যাব না।  
রিনি আর অপেক্ষা করে না। সে নিচে চলে যায়। আর মামাকে বলে দেয়, মা গভীর ঘুমোচ্ছে। তাই বেশি ডাকলাম না। রিনির কথা শুনে ‘ও আচ্ছা’ বললেও ধ্রুব ঠিক জানে ওর মা ঘুমোচ্ছে না। এবাড়িতে যাতায়াত করে তার এটুকু জ্ঞান হয়েছে। সে রিনিকে মায়ের শরীরের দিকে নজর দিতে বলে আর অপেক্ষা করে না।
বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই রিনিদের দায়িত্ব প্রায় নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে তার ছোটমামা। আসলে রিনির দুই মামা। বড়মামা নিরুদ্দেশনিরুদ্দেশ হওয়ার কারণ অবশ্য সে নিজেই। চার বছর আগে কোন্নগরে সে বিজনেস করবে বলে ঠিক করেকিন্তু তার জন্য তো পুঁজি চাই। সুবুদ্ধি দেয় তার মা। সে বলে, ‘তোর এত ভাল জামাইবাবু থাকতে তুই টাকার চিন্তা করছিস? তাকে গিয়ে বলে দেখ সে ঠিকই দিয়ে দেবে।‘
কথামত সে টাকা জোগাড়ের জন্য হাত পাতল প্রিয় জিজুর কাছেইপ্রায় লাখদুয়েক টাকা সে ধার নেয় রিনির বাবার থেকে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সে টাকার পুরোটাই বেহাত হয়ে যায়। যাকে সে সবথেকে বেশি বিশ্বাস করেছিল সেই নাকি তাকে ঠকিয়ে সমস্ত আত্মসাৎ করেছে – এই বলে লোকসমক্ষ থেকে দূরে কোথায় যে সে পালিয়ে গেল তার খবর আর কেউই জানে না। বাড়িতে রইল বুড়ি মা আর এক বেকার ভাই। বাবা দুবছর আগে পাগল হয়ে মারা গেছিল। আর ছেলের এই ‘ছেলেমানুষি’র দুঃখে মাও এক অর্থে পাগলপ্রায় হয়ে গেল।
কিন্তু তাই বলে জামাইবাবু কি আর যেতে দেয়? দুলাখ বলে কথা। জামাইবাবু তো আর টাটা/বিড়লার মালিক নয় সে পকেট নাড়তেই লাখ-দুলাখ খসে পড়বে। সে-ই বা ছাড়ে কেন? এই নিয়ে তুমুল গণ্ডগোল দুই পরিবারে। শেষে ‘ভাল জামাইবাবু’ কোর্টে যাবে বলেও ঠিক করে। কিন্তু রিনির মায়ের পীড়াপীড়িতে শেষমেশ ব্যাপারটা অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত হয়। হাজার হোক তার তো নিজের ভাই। ভুল না হয় করেই ফেলেছে। ক্ষমার আদর্শই শ্রেষ্ঠ।
যাই হোক স্ত্রীর হস্তক্ষেপে জিজুর ক্রোধ অবশেষে সংবরণ হল বটে, কিন্তু দুই পরিবারের সম্পর্কটা হয়ে গেল আদায় কাঁচকলায়। আর সেই থেকে রিনির বাবার মারা যাওয়া অব্দি তাদের মধ্যে কথা চালাচালি খুব একটা হত নাযদিও উপায়ান্তর না থাকায় এখন রিনিরা এই পরিবারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য। কারণ মামা ছাড়া আর কাদের ওপরেই বা নির্ভর করবে সে আর তার মা?



                    *                              *                                  *
৮ই অগাস্ট, বুধবার
আজ অনেকদিন পরে ডায়রি নিয়ে বসেছি। কিছু সমস্যা আছে যেগুলো কাউকে বলা যায়না। আসলে মাকে নিয়ে খুব চিন্তা হয়। আমার বিয়ের পর মাকে তো একাই থাকতে হবেএই এত বড় একটা বাড়িতে পুরো একা!
মামাও ঠিক একই কথা বলছিল, বিয়ের পরে তোর মাকে নিয়ে সমস্যা হবে। সত্যিই তো মা একা কি করে থাকবে? ব্যাপারটা আমার যে মাথায় আসেনি তাও নয়। বিশেষতঃ এই জায়গাটা ভাল নয়। পাশের বাড়ির লোকগুলোও বড্ড অসামাজিকদুটো বড় ছেলে থাকে। সকালে কোথায় বেরিয়ে যায় কে জানে? ফেরে গভীর রাত্তিরে। কারুর সাথে কথা বলে না। লোকে তো বলে ওরা ক্রিমিনাল। অসম্ভব কিছুই নয়। এ অঞ্চলে খুন-খারাপি তো লেগেই আছে।
তাই চিন্তা, মাকে এবাড়িতে কি করে একা রাখব? 
কাকারা তেমন একটা আসে না, পিসিরাও তেমনি। কারুর সাথেই তাই এসব কথা শেয়ার করতে পারি না। ইদানিং মায়ের আবার নানা সমস্যা শুরু হয়েছে। মাকে নিয়ে আর পারছি না। কাকে বলব এসব?
লিখতে লিখতে রিনির হঠাৎ থেমে যায়নিচ থেকে মায়ের গলা আসছে। সে টেবিলে লিখছিল। পেনটা ডায়রির ওপর ফেলে জোরে চেঁচায়, ‘যাই, চিল্লাচ্ছো কেন?’
নিচে নেমে দেখে মা রান্নাঘরের মেঝেতে বসে আছে। কপালে হাত। রিনিকে দেখতেই মা অর্ডারি গলায় বলে, ‘ভাত বসা’। রিনি ছোট বাটি নেয়। তারপর ড্রাম থেকে চাল নেওয়ার আগে আন্দাজ করতে থাকে।
-‘ফোন করছিলি?’ গোমড়ামুখে মা প্রশ্ন করে।
রিনি পেছন ঘুরে একবার মায়ের দিকে তাকায়। তারপর নিজের কাজ করতে করতে বলে, না
মা ওর কথায় পাত্তা দেয় না। গজগজ করতেই থাকে, আমাকে লুকোস না কিন্তু। আমাকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। নিশ্চয়ই তুই ওকে ফোন করছিলি। বল। ধমকের সুরে বলে ওঠে মা।
-বলছি তো বাবা, করছিলাম না। আমি তোমাকে মিথ্যে কেন বলব? বেশ জোরের সাথেই কথাগুলো বলে রিনি।
- দুদিন বাদেই তো নিজের সংসার গুছোবি। তখন আমায় কে দেখবে?
রিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর কোমল গলায় বলে, ‘ সেই কারণেই তো বলছি। তুমিও চল না আমাদের ওখানে। সেখানে কোন বাড়িভাড়া ঠিকই পেয়ে যাবে। মাকে বোঝাতে চায় সে
- না। কখনোও না। গর্জে ওঠে মা। ‘ঐসব হাড়ে হাভাতেদের সাথে আমি থাকতে পারব না।‘
মা, তুমি থামবে?’ – চিৎকার করে ওঠে রিনি। ‘রোজ রোজ আমার এই জ্বালাতন আর ভাল লাগে না। বিরক্তি লাগে।‘ কাঁদো কাঁদো হয়ে আসে রিনির গলা। কাজ ফেলে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে যায়। চলে যায় দোতলায়, ওর নিজের ঘরে। অন্ধকার ঘর। সে আলো জ্বালায় না। বিছানার ওপর নিজের দেহটাকে এলিয়ে দেয়। তারপর বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে নীরবে
ভাত চড়ানো হল না। ওর মা ঠায় বসে থাকে রান্নাঘরে। স্থির দৃষ্টি তার। এভাবেই কেটে যায় ঘন্টা দুই-তিনএকসময় ওর মাও শুয়ে পড়ে। গা-টাকে ফেলে দেয় রান্নাঘরের ঠান্ডা মেঝের ওপরেই।



            *                              *                                 *
ঘটনাটা ঘটেছিল প্রায় মাস সাতেক আগে। পেটে ব্যথা নিয়ে রিনি গেছিল ডাক্তারখানায়সঙ্গে বাবা। ক্রমাগত ফাস্ট ফুড, ভাজাপোড়া খেলে যা হয়গ্যাস অম্বলের রুগীমাথা নেড়ে তাই ডাক্তার ওষুধ লিখে দিলেন বটে কিন্তু তার সাথে সবথেকে ‘কড়া দাওয়াই’টাও দিতে ভুললেন না – দুমাস বাইরের খাবার খাওয়া বন্ধ। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল রিনির। এত সুস্বাদু ভেলপুরী-ঝালমুড়ি-ফুচকা যদি খাবার তালিকা থেকে বাদ পড়ে তাহলে কার না রাগ ধরে!
মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ঢোকবার মুখে হঠাৎ তার খেয়াল পড়ল, ‘আরে! মোবাইলটা কোথায়? নির্ঘাত ডাক্তারের চেম্বারেই ফেলে এসেছি। টেবিলের ওপরে রেখেছিলাম মনে আছে’।  
-তোর কাজ! সত্যি!! এখন ওখান থেকে কেউ তুলে না নেয়। বিরক্তিতে বলে ওঠে বাবা।
-তা অত চেঁচানোর কি আছে? ফোন করে একবার দেখোই না ডাক্তারকে। নাম্বারটাও তো আছে। রিনির তেজও কিছু কম যায় না।
বাবা ফোন লাগায় ডাক্তারের কাছে। ‘হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু। আমি নির্মল।...হ্যাঁ, আমার মেয়ে...হ্যাঁ মেয়ে একটা মোবাইল ফেলে গেছে। বলছে আপনার টেবিলে...হ্যাঁ হ্যাঁ কালো রঙের। ওঃ যাক। আছে তাহলে। আচ্ছা আমি এক্ষুণি যাচ্ছি। নিয়ে আসছি। ..আচ্ছা রাখলাম ডাক্তারবাবু
ফোনটা কেটে বাবা বলে, ‘দাঁড়া আমি নিয়ে আসছিতুই ঘরে যা। দরজাটা খোলা রাখিস। এখুনিই আসছি। বাবা গেট থেকেই বেরিয়ে যায়। রিনি ঘরে ঢোকে।
মা আগেই দরজা খুলে দিয়েছিল। ‘কি রে? বাবা কোথায় গেল?’ মায়ের জিগ্যেস। উত্তর দিয়ে রিনি জানায় তার দুঃখের কথা। ডাক্তার কি বলেছে। কি কি খাওয়া বারণ হয়েছে।
মা বলে, এখন আর বলে কি হবে? যখন বারণ করতাম তখন কানে যেত? এখন ঠেলা সামলাও। আমার হয়েছে যত জ্বালা। সব সেদ্ধ রান্না করব দেখ।
রিনি চেঁচিয়ে ওঠে, না। আমি খাবই না তাহলে। ইস। ঐ সেদ্ধ তরকারি, শাক...ওয়াক।
মা বলে, তাহলে ভোগ। আর কি। আমাকে আর জ্বালাস না।
বাইরে গেটের আওয়াজ আসে। রিনি জানে বাবা এসেছে। ফোনটা ঠিকমত ফিরল কিনা দেখার জন্য বাইরে যাবে এমন সময় কয়েকটা ছেলের গলা পায় সে। সবক’টা স্বরই পরিচিত। পাড়ার ছেলে ওরা। তার নাম ধরে ডাকছে। রিনি দরজা খুলে বাইরে বেরোয়।
‘কি হল ভোম্বলদা?’
ভোম্বলদা উত্তেজিত স্বরে বলে, রিনি, তোর বাবার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। মোড়ের রাস্তায়। রাস্তা পেরোতে যাচ্ছিল, একটা ট্রাক এসে ধাক্কা দিয়েছে। নার্সিংহোমে নিয়ে যাচ্ছি।
‘কি? কি বলছ ভোম্বলদা? এসব সত্যি? ‘ চিৎকার করে ওঠে রিনি।
আর কথা বাড়ায় না সে। পড়ি কি মরি করে ছুটতে থাকে ভোম্বলদাদের পেছন পেছন।
আর সে খেয়ালও করে না পেছনে মা কখন অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়েছে মেঝেতে।
রিনি যখন রাস্তায় পৌছয় তখন সেখানে কিছুই ছিল না। বাবাকে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু চাপ চাপ রক্ত লেগেছিল ঝকঝকে পিচের ওপর।
নার্সিংহোমে যখন ওরা পৌছল তখন বাবার সেন্স হারিয়েছে। স্যালাইন চলছে। মুখে মাস্ক লাগানো। কে জানত বাবার সাথে তার শেষ দেখাও হবে না?
বাবা চলে গেল। সেই দিনই রাত্তিরে। রাত একটা নাগাদ।
ইতিমধ্যে কাকাদের খবর দেওয়া হয়েছে। কাকা চলে এসেছে পিসতুতো দাদারাও এসেছে। অবশ্য কাকিমা আর কাকার ছেলে কালকে আসবে। কাল পিসিরাও আসবে। রিনির সামনে তখন যেন সমস্ত পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিলমা একদিকে মাথা হেলিয়ে বেঞ্চে বসে আছে সেই থেকে। এতটুকু নড়াচড়াও করছে না। যেন সেও আর এ জগতে নেই
রিনি মায়ের কাছে গিয়ে বলে, মা। মামাকে খবর দেব? রিনি ভেবেছিল এমন সময় মামাকে খবর দেওয়াটা উচিৎ। বিশেষ করে সে যখন এত কাছে থাকে। এই বিপদের দিনে কি এত মান-অভিমান নিয়ে থাকলে চলে?
মা একবার মুখ ফিরিয়ে রিনিকে দেখে। তারপর মৃদু স্বরে বলে, না।



                          *                               *                            *
সকাল আটটা নাগাদ ধ্রুব হাজির। দোকানের আনতে দেওয়া জিনিসগুলো রেখে দেয় ওদের বাড়ি। রিনির মায়ের ওষুধগুলো ঠিকমত সব এনেছে কিনা সে নিয়ে তার নিজেরই যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কারণ এ যাবৎ এমন একটা দিনও হয়নি যে দিন ধ্রুব সবক’টা ওষুধ ঠিকঠাক এনেছে।
আর তার ভুল কাজ দেখলেই রিনির মাথার ঠিক থাকেনা। সে চিৎকার করে ওঠে, ‘আচ্ছা তুমি মানুষ? একটা ওষুধ ঠিকমত আনতে পারো না। নেহাৎ আমাকে ঘরের কাজ দেখতে হয়, নইলে তোমাকে কে আনতে বলত।
ধ্রুব অবশ্য রিনির এসব কথার কোন উত্তর করে না। যাক ও একধার দিয়ে বলে যাক। কি দরকার ওকে পাল্টা কথা শোনাবার? একমাত্র ভাগ্নি বলে কথা। সে তাই নিরীহ মানুষের মত রিনির কথাগুলো হজম করে।
আজ অবশ্য রিনি দরজা খুলল না। খুলল ওর মা। ‘কি রে, তোর শরীর কেমন?’ জিগ্যেস করতে করতে ধ্রুব ঢোকে। রিনির মা হাল্কা স্বরে জবাব দেয়, ‘ঐ আছি।‘
-      খাওয়াদাওয়া ঠিকমত করছিস তো?
-      হুম।
-      ওষুধগুলো এনেছিঠিকমত এনেছি কিনা দেখে নিস তো।
রিনির মা কোন জবাব দেয় না। চুপ করে বসে থাকে মেঝেতে। ধ্রুব টেবিল থেকে বোতল নিয়ে জল খায়। খানিকবাদে রিনির মা টেবিলের ড্রয়ার থেকে হাজারখানেক টাকা বের করে। তারপর গুনে-গেঁথে মামার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, ‘তোর অনেকদিনের টাকা তো বাকি পরে আছে। এনে এখন যা পারলাম দিলাম। পরে বাকিটা নিয়ে নিস
বাবা মারা যাওয়ার পরে দোকান-বাজারের বেশীরভাগটাই মামা সামলায়। আর খরচটাও যায় তার পকেট থেকেই। কোন হিসেবই থাকে না। সামনাসামনি কিছু বলতেও পারে না মামা। কাকেই বা বলবে? দিদির সাথেই তো দেখা হল এই প্রথম। আর এই প্রথম দিদি তাকে টাকা দিল।
মামা আর কোন কথা না বলে, টাকাগুলো না গুনেই পকেটস্থ করল।
‘তোর অফিস কখন?’
‘আজ একটু দেরীতে ঢুকব। সাড়ে দশটায় বেরোব। মায়ের শরীরটাও বেগোড়বাই করছে।‘ কিছু ভাবতে ভাবতে মামা উত্তর দেয়।
-কেন কি হয়েছে মায়ের?
-ঐ পেটের কাছটায় কেমন অস্বস্তি করছে। আর বাতের ব্যাথাটাও বেড়েছে।
রিনির মা কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলে, সকালে কিছু খেয়েছিস? দাঁড়িয়ে কেন, বোস।
খাটের ওপর বসতে বসতে ধ্রুব বলে, ঐ চা করে খেয়েছিলাম। মা তো কিছুই খেল না। দেখি এখন কি করছে আবার। আমার বেশি টাইম নেই রে। আবার বাজারও করতে হবে।
-মা কাজটাজ করতে পারছে ঠিকঠাক?
-কাজ বলতে?
-এই রান্নাবান্না, ঘরের কাজ
ধ্রুব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে রিনির মায়ের দিকে। তারপর অবাক হয়ে বলে, ‘তুই জানিস না? মা তো বেশ কয়েকমাস হল বিছানায় পড়ে আছে। যা করতে হয় তো আমাকেই’ তারপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থেকে বলে ওঠে, ‘না রে আজ উঠি’মামা উঠে দাঁড়ায়। রিনির মা কিছু বলে না। চুপচাপ ঘরের একটা অন্ধকার কোণের দিকে তাকিয়ে থাকে। দুই বাড়ির সম্পর্কটা খারাপ হওয়ার পর থেকে মায়ের সাথেও তার বিচ্ছেদ হয়েছে। মায়ের কথা কতদিন ভাবেনি রিনির মা। কতদিন আগে সে মা বলে ডেকেছে, সেটাও সে ভুলে গেছে।
ধ্রুব গেট থেকে বেরোনোর মূহুর্তে সে তাকে ডাকে। বলে, ফ্রিজে অনেক তরি-তরকারি আছে। কিছু নিয়ে যা না।
ধ্রুব একটা অবাকপারা দৃষ্টিতে রিনির মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন সে তার কাছ থেকে এই কথাটা একেবারেই আশা করেনি। কতদিন দিদি তাকে এভাবে বলেনি সে ঠিক মনে করতে পারল না। আর তা করারও চেষ্টা সে করল না। মৃদু হেসে দিদিকে শুধু বলল, নাঃ। তার দরকার নেই।



                       *                                                            *                                                        *
হ্যালো। হ্যাঁ, কোথায়?
-বাড়িতেই।
-বাব্বাঃ, আজ একবার ফোনও করতে পারলে না? সেই আমাকেই করতে হল?
-আজকে কাজের খুব চাপ ছিল গো। সাড়ে নটায় বাড়ি ঢুকলাম। এই সবে খেয়ে উঠেছি।
-আমার ভাল লাগছে না। মুখ গোমড়া করে রিনি সোফায় বসে পড়ে। তারপর গাটাকে এলিয়ে দিয়ে হেডফোনটাকে কানে একবার ঠিক করে গুঁজে নেয়‘আমাকে নিয়ে চল’
-কোথায়?
-জানিনা।
-কেন কি হয়েছে? বলো না।
-মাকে নিয়ে আর পারছি না।
-কেন?
রিনি একটু চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ও তুমি বুঝবে না। ছাড়ো।
-আহা। বলেই দেখো না।
-মা খুব সন্দেহ করছে।
-কাকে?
-আমায়।
-কেন?
-কি করে জানব? ঝাঁঝি মেরে ওঠে রিনি। মায়ের কিছু প্রবলেম হয়েছে। মনে হয়, ডাক্তার দেখাতে হবে।
-আমারও মনে সেটাই ভাল। কোন ভাল সাইক্রিয়াটিস্ট দেখিয়ে নাও।
-কে দেখাবে? আমি পারব না। তুমি করবে এসব
-হাঃ হাঃআমি? আচ্ছা তাই না হয় হবে জানু। আচ্ছা আর সব খবর ভাল তো?
-ঐ আছেতোমার পায়ের ব্যথাটা কেমন আছে? শেক করেছ আজকে? শোন অত রাত কোরো নাবসকে বলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।
-হ্যাঁ ওটাই বাকি আছে। চাকরিটা যাক আর কি। শেক করেছি আজযাই হোক, আজ খুব ঘুম পাচ্ছে। শুলুম। ভাল থেকো সোনাসুইট ড্রিমস।
-হুম। বাই। আমার সুইটু।
মিষ্টি হেসে ফোনটা কেটে দিয়ে রিনি সোফা থেকে ওঠে সে এবার শোবে। ঘরে টিউবলাইট জ্বলছে। আলোটা নেভানোর জন্য যেই উঠেছে হঠাৎ চোখে পড়ল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাধড়াস করে ওঠে বুকটা।
ভ্রুকুটি করে মা বলতে থাকে, এখনও শুসনি কেন? কাকে ফোন করছিলি?
রিনি মায়ের চোখের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে বলে, কাউকে নাতুমি শুয়ে পড়রিনির গলায় একটা দৃঢ়তা কাজ করে। মা তবু নাছোড়, বল কাকে ফোন করছিলি? মোবাইল দেখা। কথাগুলো বলতে বলতে মা ঘরে ঢুকতে যাবে এমন সময় রিনি তাকে জোরে এক ধাক্কা মারেমা ছিটকে পড়ে ঘরের বাইরে। ‘তুমি যাবে এখান থেকে?’ চিৎকার করে ওঠে রিনি। তারপর এক মূহুর্ত দেরী না করে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়।
এভাবেই কাটে সারারাত। মায়ের কি হল সে একবারও দেখতে যায় না।
১০ই অগাস্ট, শুক্রবার
ভাল লাগছে না আর কিচ্ছু। মায়ের পাগলামি দিন দিন বাড়ছে। রনিকে আর সহ্যই করতে পারছে না মাকেন কে জানে? সবই তো ঠিক ছিল। বাবা মারা যাওয়ার আগে তো রনির সাথেই আমার সম্বন্ধ ঠিক ছিল। আমাদের অ্যাফেয়ার বাবা-মা দুজনেই মেনে নিয়েছিল। এখন বাবা মারা যাওয়ায় ওরা অশৌচের জন্য বিয়েটা পিছিয়ে দিল। একটা বছর অপেক্ষা করতেই হবে। কিন্তু মাকে তো সামলানো যাচ্ছে না। বিয়ের দিন যত এগোচ্ছে মা ততই যেন ওকে সহ্য করতে পারছে না। তবে কি মা চায় না আমাদের বিয়েটা হোক? কিচ্ছু জানি না আমি।
শুধু ভেবে চলেছি কবে মুক্তি পাব। বাড়িটা একটা নির্বাসনের মত লাগছে। ভয় লাগে মায়ের সাথে কথা বলতে। মনে হচ্ছে ছুটে পালিয়ে যাই। রনিকে এসব বললেও ও বুঝবে না। ফালতু একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে যাবে। কি দরকার? ওর কাজের খুব চাপ। প্রাইভেট কোম্পানী তো। ওর বাবারও শরীর ভাল থাকে না সবসময় হার্টের রোগ আছে। তাই আর নিজের বোঝাটা ওকে চাপাতে চাইছি না।
কিন্তু আমিই বা কি করব? কিচ্ছু বুঝতে পারছি না



                   *                           *                               *
নার্সিংহোম থেকে বাবার বডি যখন বাড়িতে আনা হয়েছিল তখন ভোর প্রায় সাড়ে চারটে। রিনি, ওর মা হাসপাতাল থেকে চলে এসেছিল আগেই। সকাল সাতটা নাগাদ পিসি এল। কাকিমাও এল। ওরা রিনির মাকে স্বান্তনা দিচ্ছিল। রিনির বন্ধুরাও ছিল। রিনির কাকা দেবায়ন ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে। গালে হাত সে একসময় বলে উঠল, রিনিতোর মামাদের দেখছি নারিনি কিছু বলে নাসে মায়ের দিকে একবার তাকায়। মা তখন স্থির দৃষ্টিতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। খানিকবাদে মা ইশারা করে। রিনি মামাকে খবর দেওয়ার জন্য এক বন্ধুকে বলে।
ধ্রুব এল ঘন্টাখানেকের মধ্যে। কিন্তু কেউ জানে না এই বাড়িতে তার পা পড়ল প্রায় বছর তিনেক পরেঅথচ দুটো বাড়ির মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি হলেও দশমিনিটের সাইকেলপথ। রিনির বাবা মারা যাওয়ার ব্যাপারে সে কিছুই জানত নাআর এখানে এসেও সে এমনই নিরুত্তাপ নিরুদ্বিগ্ন ভাব দেখাল যে কারুর পক্ষেই বোঝা সম্ভব হল না – এই লোকটা এই ঘটনার ব্যাপারে কিছুই জানে না। সে একটা প্রশ্নও করেনি। শুধু সবার কথা মন দিয়ে শুনতে লাগল
নিজের ভাইয়ের কাজ কিংবা এতদিনের সম্পর্কের তিক্ততা বা দুটোই হয়ত মামার মধ্যে কাজ করছিল নিরন্তর। তাই সে কোন কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেনি সেদিন। কিই বা সম্পর্ক এই বাড়ির সাথে তার?
বডি নেওয়ার জন্য গাড়ি এসে গেছে। ‘ধ্রুব যাবে?’ মামার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে দেবায়ন কোমরে গামছা বাঁধা। ধ্রুব খানিক চিন্তা করেতারপর মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘যাব।‘



                                 *             *                *
রিনির বিয়ের দিন। বলা বাহুল্য বিয়েটা মোটেই তত বড় করে হয়নি। পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন বাদে অন্যান্যরা যেটুকু নইলে নয়, তার বেশি কাউকেই বলা হয়নি। কাকা আর মামা বিয়েতে খুব সাহায্য করেছিলসমস্তটা ভালভাবে মিটে গেলে রিনির বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পালা। সবাইকে অবাক করে দিল সে সেখানেইযাবার প্রথাটাকে সম্পূর্ণ ভেঙে সে মাকে একবার প্রণাম ঠুকেই বিদায় নিল। এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলল না, একবার মাকে জড়িয়েও ধরল না। আশেপাশে যারা ছিল তারা তাজ্জব বনে গেল, ‘এ আবার কি? মেয়েরা তো মাকে ছেড়ে যেতেই চায় না। আর এ তো দেখছি পুরো উলটো। নাঃ, রিনি এ কাজটা মোটেই ভাল করেনি। ওর মা কত দুঃখ পেল।
রিনির চলে যাওয়ার পরে প্রায় সবার মুখেই এক কথা – শ্বশুরবাড়ির লোকজন কি ভাল। সবাই তার নিজস্ব ঢংয়ে ওদের বাড়ির প্রশংসা করে যাচ্ছে। রিনির মা তবু একটাও কথা বলে না। রিনির পিসি মালবিকা বলে, সত্যি দাদাবাবুর (রিনির শ্বশুর) কি অমায়িক ব্যবহার! তাই না, বল দিদি?
-হুম। রিনির মায়ের গলা থেকে অস্পষ্টভাবে এই ধরনেরই একটা আওয়াজ বেরোয়।
-কি হল তুমি কথা বলছ না কেন?
কোন সাড়া আসে না
রিনির কাকিমা কাকলি বলে, আসলে ওর ভাল লাগছে না বোধহয়। থাক ও নিজের মত। শোবে দিদি?
দিদি মাথা নাড়িয়ে জানায় শোবে না। সে ঠায় বসে থাকে একই ভাবে।
এভাবেই কাটে দিনটাএটা বিয়েবাড়ি না শ্রাদ্ধবাড়ি বোঝা দায়। কেউ ঠিক খোলামেলা হতে পারছে না। সবাই বুঝছে রিনির মায়ের কিছু একটা হয়েছে। সেটা কিছুটা রিনির ব্যবহারেই তারা টের পেয়েছিলকিন্তু তারা বুঝতে পারে না ব্যাপারটা ঠিক কি? কেন তার মা এরকম করছে?
এমন করেই কখন দিন কেটে রাত চলে আসে। কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে এগারো ছুঁই ছুঁই। অন্য দিন হলে হয়ত এই সময় সবাই শুয়ে পড়ত। কিন্তু এটা অনুষ্ঠান বাড়ি। তাই ধ্রুব এখনও বাড়ি যায়নি। মালবিকা, কাকলি, রিনির দুঃসম্পর্কের এক মাসি – এদের কারুরই খাওয়া হয়নি। বাঙালি প্রথামাফিক বাড়ির ছেলেরা সবাই খেয়ে নিয়েছে। রিনির মাকে খাওয়ানো নিয়ে বেশ ঝামেলা বেধেছে। এটা অবশ্য তাদের কাছে কিছু নতুন নয়। কারণ রিনির বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সে খাওয়াদাওয়া একরকম বন্ধই করে দিয়েছে। কোন রকমে মাছের ঝোল দিয়ে সামান্য কিছু মুখে তুলেই – না না না। শরীরও তাই হাড় জিরজিরে, একেবারে হাড়েমাসে লাগানো।
অগত্যা বাড়ির সকলে হার মানল। কোনরকমে সামান্য কিছু খাইয়ে তাকে শোবার ঘরে পাঠিয়ে কাকলি মশারি টাঙিয়ে দেয়। শুয়ে পড়ে রিনির মা। নিচের ঘরে রান্নাঘরে সবাই এখন খেতে বসবে। জোগাড় যন্ত্র চলছেছোটরা সব শুয়ে পড়েছে। হঠাৎ কাকলির চিৎকার শোনা গেল দোতলার ঘর থেকে চমকে ওঠে সবাই, কি হল, কি হল – করতে করতে ছুটল ওপরের শোবার ঘরে
দেখা গেল রিনির মা ফোন করার চেষ্টা করছে। আর কাকলি তাকে বাধা দিচ্ছে প্রাণপণে। ‘কি ব্যাপার?’ চিৎকার করে দেবায়ন। কাকলি বলে, দেখো না। বলে কিনা রিনির শ্বশুরবাড়িতে ফোন করবে। ওদের বিয়ে নাকি ভেঙে দেবেমেয়েকে ফিরিয়ে আনবে। কি সব অলক্ষুণে কথাবার্তা!
রিনির মা চেঁচিয়ে চলে, আমাকে ছাড়, ছাড় তোমরা। ধ্রুব এগিয়ে আসে। সে বলে, কি হয়েছে কি? ধমকে ওঠে রিনির মাকে, কোত্থাও যাবি না। চুপ করে শো
-না, কিছুতেই না। ও শয়তান মেয়ে। ও আমার সংসার ভেঙে দিল। ওকে আমি কিছুতেই সুখী হতে দেব না। আমাকে ছাড়ো, ছাড়ো বলছি। সে টানাহ্যাঁচড়া করতে থাকে ক্রমাগত। মালবিকা, আরও দু-তিনজন মহিলা ছুটে আসে। বাড়ির একজন পার্মানেন্ট কাজের লোক ছিল। সেও বোঝাতে বোঝাতে ছুটে আসে। তারপর কোনরকমে তার সাথে জোরজবরদস্তি করে তাকে শোয়ানো গেল।
দেবায়ন ধ্রুবকে ডাকে। বাইরের ঘরে তাকে নিয়ে গিয়ে বলে, ওর কয়েকটা ঘুমের ওষুধ ছিল না? সেগুলো আছে?
ধ্রুব একটু চিন্তা করে। তারপর বলে, ‘হ্যাঁ, আছে মনে হয়। দাঁড়ান দেখছি’ বলে সে নিচের ঘরের শোকেসে ওষুধ খুঁজতে থাকে। আর অনবরত রুমালে ঘাম মুছে চলে গলার, ঘাড়ের, টাকের। কিছুক্ষণ খোঁজবার পরই ট্যাবলেট পাওয়া গেল।
এই ওষুধটা ঠিক ঘুমের নয়। সাইক্রিয়াটিস্ট রিনির মাকে দিয়েছিলকিছু প্রবলেম হয়ত তার বরাবরই ছিল। তাই ডাক্তারও দেখানো হত। কিন্তু এসব তেমন করে কাউকেই জানায়নি রিনিদের কেউ। মা সেই সুযোগে বরাবরই ওষুধ খায় নারিনির থাকাকালীনও খেত না ঠিকমত। মাঝে মাঝেই অনিয়ম করত। কিন্তু শেষের দিকে সেসবে আর পাত্তাও দিত না রিনি।
এখন তাকে ওষুধ খেতে বলা হল, সে সেটা হাতে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। মালবিকা সামনে ছিলসে কোমল গলায় বলল, ঠিক আছে। তোমায় ওষুধ খেতে হবে না। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়একটা বোতলে কিছুটা জল নিয়ে আসে।
দৃঢ় গলায় বলে, জল খাও।
তার গলার স্বরেই হোক কি যে কারণেই হোক রিনির মা বেশ বাধ্য হয়েই জলটুকু ঢকঢক করে খেয়ে নিল। বলা বাহুল্য, ঐ জলেই মালবিকা ওষুধটা গুলে দিয়েছিল। ছোট ওষুধ তাই বেশি জলে গুলে যাওয়ায় সে বুঝতেই পারে নি। অচিরেই ঘুম চলে এল।



                                                                       *                                *                            *
বিয়েবাড়ি।
টুনিলাইটের মালা পড়েছে বাড়িরাস্তার মোড়ে একটা ফ্ল্যাডলাইট। বাড়ির সামনে ডিজিটাল লেখা ফুটে উঠছে – ওয়েডিং অফ রনিত অ্যান্ড তিস্তা। বলা বাহুল্য, এরাই আমাদের রনি আর রিনি। এখনকার কোন বাড়িতেই আর সাধারণত বিয়ে হয় না। হয় ভাড়া বাড়িতে। কিন্তু এখানে তা নয়। আধুনিকতা না মেনে এখানে আজকের দিনেও সাবেকি নিয়মে নিজের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। বাড়িটা খুব একটা বড় নয়। একতলা। কিন্তু বাড়ির সামনে একটা বেশ বড় মাঠ আছে। সেই মাঠটাতেই আজ খাওয়াদাওয়া হবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি খিদে পেলে চলবে না। এখন যে সবে কলির সন্ধে। মাত্র সাড়ে ছটাসূয্যিমামা সবে পাটে গেছেন।
সানাই বাজছে আশাবরী রাগে। লোকে লোকারণ্য। ভিড়টা ক্রমশই যেন উপচে পড়ছে। অবশ্য এ বাড়ির আত্মীয়কুটুম প্রচুর। বনেদি বাড়ি হওয়ার ফল। আর তার ওপর আছে চেনা পরিচিতেরাসবে মিলে এখন সংখ্যাটা আরও বেড়েই চলেছেআজ বৌভাত। রিনিকে দেখবার আশ এখনও সকলের মেটেনিবারেবারে দেখছে ফরসা, ‘লাল টুকটুকে’ বৌকে। নাম কি, কোথায় থাকো, কি পড়েছ, কি কি রান্না জান, ইত্যাদি থেকে শুরু করে আমার মেয়েটাকেও এবার ..। একজন তো আবার জিগ্যেস করেই ফেলল – তোমাদের ওখানে যদি কোন পাত্রের খোঁজ পাওয়া যায় বোলো তো।
তবু রিনির মুখে তেমন হাসি নেই। সে যেন সবার সঙ্গেই আছে, অথচ কারুর সঙ্গেই নেই। অন্য কোন দুনিয়ায় সে আছে। কিছু ভাবছে। কিছু তো একটা ভাবছেই – সেটা অনেকেই টের পেল। কিন্তু সে ব্যাপারে তেমন একটা কেউ জিগ্যেস করল না। যদি বা করল, কোন সদুত্তর পেল না। ‘হবেই তো, প্রথম প্রথম মাকে ছেড়ে থাকা না। কিছুদিন থাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে। এবাড়ির লোকেরা ভীষণ ভাল। তোমার দাদাবাবু (শ্বশুরমশাই) তো খুবই ভালমানুষ।‘ এক প্রৌঢ়া মন্তব্য করে পান চিবোতে চিবোতে। রিনি তাকে চেনে না।
ইতিমধ্যে হৈ-হুল্লোড়ের ভিড় থেকে সমবয়সী একটা মেয়ে বেরিয়ে এসে রিনির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। তার যে এখনও সাজগোজ হয়নি। তাকে সুন্দর বেনারসি, কপালে চন্দনের ফোঁটা, চোখে কাজল...সাজাতে হবে না? রিনির কিন্তু বেশ দোস্তি হয়ে গেল মেয়েটার সাথে। চিনত তাকে আগেই। কারণ এবাড়িতে তার অল্পবিস্তর যাতায়াত ছিল।
আরও দুঘণ্টা পরে ভলভো বাসে চেপে এল কনেযাত্রীর দল। ততক্ষণে বাড়ির সবাইকার সাজুগুজু শেষ। মেয়েরা বেশিরভাগই ঝলমলে শাড়ি পরেছে। পুরুষেরা পাঞ্জাবি-পাজামায় সেজেছে। ব্যতিক্রম শুধু দুজন। বাড়ির কত্তা আর তার ছেলে – বর। কর্তা পরেছেন ধুতি পাঞ্জাবি। আর বর কোট প্যান্ট পরে এখন এই জুলাই মাসের গরমে পস্তাচ্ছে। দরদর ঘাম ঝরছে – হাতের রুমালটা ভিজতে ভিজতে ন্যাকড়ার মত নেতিয়ে পরেছে।
সবাই প্রস্তুত। কনেযাত্রীরা ঢুকতেই তাদের হাতে হাতে গোলাপ গুঁজে দেয় ছোট মেয়েগুলো। রিনির মা আসে প্রথমেহাতে তত্ত্ব সাজানো। পর পর ঢোকে কাকলি, মালবিকা, রিনির পিসেমশাই, দেবায়ন, ধ্রুব.... আরো দশ বারোজন
‘মোটে এই ক’জন। আর লোক কই?’ – রিনির শ্বশুর অভয় বলে ওঠে।
‘এই হয় না। জোরজার করে ধরে আনা দেবায়ন জবাব দেয়অবশ্য অভয়ের এমন কথা বলার কারণ আছে। রিনির বিয়েতে বরযাত্রীর লোক এসেছিল প্রায় জনা তিনশ। তাও প্রচুর লোক নাকি যেতে পারেনি। তাতে সবথেকে যেটা মুশকিল হয়েছিল সেটা হল খেতে দেওয়া। ভাড়াবাড়িটা ভরে গেছিল। কোথায় যে কে? খাবার পেল কি পেল না - সেটুকুও বোধহয় সবাইকে জিগ্যেস করা যায়নি।
এখানে সেই তুলনায় ব্যবস্থা অনেক ভাল। তার হয়ত একটা কারণ এদের আত্মীয় কুটুমের মধ্যে হৃদ্যতাটা অনেক বেশি। কনেযাত্রীর খাওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা। বুফে সিস্টেমও ছিল। সেখানেও লোকের কি ভিড়!
খাওয়াদাওয়া শেষ হতে বেজে গেল প্রায় সাড়ে ন’টা। রিনির মাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল না যে এই মহিলাই দুদিন আগে কি ভয়াবহ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। উন্মাদের মত নিজের মেয়ের বিরুদ্ধে এমন কথা বলেছিল যা কোন মা করতে পারে বলে ভাবা যায় নাসেখানে আজ তার কথাবার্তা, হাসিঠাট্টায় অংশ নেওয়া সবতাতেই একটা উচ্ছ্বলতা ছিল। যদিও তা খুব একটা প্রাণবন্ত নয়। তবে ততটা অসামাজিকও নয়। অবশ্য সেই কারণেই তাকে এখানে আনা হয়েছে। তাকে আনা নিয়ে খুব আপত্তি ছিল দেবায়নের। কিন্তু মা তার মেয়েকে দেখবে না? এটা ঠিক মন থেকে মঞ্জুর করতে পারেনি কাকলি কিংবা মালবিকার কেউইতাছাড়া রিনির মাকে অনেক সুস্থ দেখাচ্ছিল। তাই তাদেরই পীড়াপীড়িতে এখানে রিনির মাকে এখানে আনা হয়েছে
ওরা সবাই ভেতরের ঘরে গল্প করছিল। রিনি ছিল বাইরের ঘরে। রিনিকে দেখতে ওরা সবাই যখন গেছিল তখন ওর মা ভেতরে ঢোকেনি। বাইরে থেকেই ওর দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়েছিলরিনি তাকায়নি। হয়ত ইচ্ছে করেই।
এভাবে গল্পগুজবে প্রায় দশটা বাজল। তাও লোকজন খুব একটা যে কমেছে তা নয়। রিনির মা একটু ইতস্তত তাকিয়ে নিয়ে বলে, রিনিকে একটু ডাকত।
পাশে মালবিকা বসেছিল। সে কথাটা শুনতে পায় কাকলিকে জানায়। কাকলি জানায় দেবায়নকেসে কিছুটা ভেবে ধ্রুবর কানের কাছে মুখ এনে কিছু বলেতারপর একটা পরিচিত ছেলেকে ডেকে বলা হল, তিস্তাকে বল ওর মা ওকে ডাকছে।
রিনি এল মিনিট পাঁচেক পর। সঙ্গে একটা মেয়ে। রিনি তাকে চলে যেতে বলে সে ঘরে তখন কনেবাড়ির লোকজন ছাড়া আর কেউ ছিলও না। রিনির মুখে একটা ভয়ের ছাপ বোঝা যায়। একটা কথা নয়, এক মূহুর্ত কাউকে বোঝার সময় দিল না ওর মা। সোজা উঠে দাঁড়িয়ে রিনির গালে সপাটে একটা চড়। তারপর কিল, লাথি ঘুষি যেভাবে পারল তাকে মারল। কিছু লোকের চোখে পড়ে যেতেই তারা হতভম্বের মতন তাকিয়ে রইল এদিকে। সবাই তখন একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। রিনির মা তখনও ওকে মেরেই চলেছেবলে চলেছে, হারামজাদি রাক্ষসী, ভেবেছিস আমার সংসার ভেঙে নিজের সংসার গুছোবি। তোর সংসারও আমি ভাঙব। শয়তান। আমি তোকে সুখী হতে দেব না। কিছুতেই না।
ততক্ষণে মালবিকা, কাকলি আরও দু তিনজন মহিলা তাকে ধরে ফেলেছে। দেবায়ন বলল, ‘দরজাটা ভেজিয়ে দাও তো।‘ দরজা ভেজানো হল। রিনির মাকে কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। হাতটাকে পিছনে মুড়ে তাকে শোয়ানো হল খাটে। তখনও সে পা দাপিয়ে চলেছে। ধ্রুব তার পাটাকে শক্ত করে ধরল। আর কাকলি আর মালবিকা দুজনে মিলে তার হাতটাকে শক্ত করে ধরেছেতোমরা ছাড়ো। আমি ওকে শেষ করে ফেলব‘ সে তখনও হাল ছাড়ছে না। আর এদিকে রিনি তখন ঘরের এককোণে মাথা গুঁজে অঝোরে কেঁদে চলেছে।
এই সময় হঠাৎই দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে রিনির শ্বশুর আর শাশুড়ি। ‘কি হল? কি হল ওনার?’ রিনির মাকে দেখে দুজনের মুখেই একই কথা। হঠাৎই চুপ করে গেল রিনির মা। তার এতক্ষণের গজরানি মূহুর্তে উবে গেল।
আসলে অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে তো তাই শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। রিনির কাকার চটপট উত্তর।
ও আচ্ছা। একটু হতভম্ব হয়ে যায় তারা। ‘ কিন্তু এ কি তুমি এখানে বসে কেন? কি হল?’ রিনির দিকে তাকিয়ে অভয় জিগ্যেস করে।
রিনির মাথা নাড়ায়। ‘কিছু হয়নি’ – অস্পষ্ট স্বরে বলেরিনিকে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে যায় তার শাশুড়ি মৃণ্ময়ী।
বলাই বাহুল্য, ঘটনাটা কারুর কাছেই আর অজানা রইল না। হাওয়ায়, বাতাসে লোকমুখে ঠিকই সবাই জেনে গেল একসময়। মিনিট দশ কি পনের বাদে রিনির মা যখন একেবারে চুপ করে গেলতাকে পাঁজাকোলা করে তুলে রিনির এক বন্ধু বাসে তুলে দিল। শোয়ানো হল সিটে। সেদিন আর কোন অসুবিধা হয়নি তাকে নিয়ে।



                        *                          *                                     *
পরের দিন ভোর তখন পাঁচটা। ঘুম ভাঙেনি প্রায় কারুরই। মালবিকা চট করে উঠে পড়ল। রিনির পিসেমশায়কে ডেকে বলল, শুনছএই। শুনছ। স্বামীকে ক্রমাগত ধাক্কা দিতে থাকে সে। সে চমকে হঠাৎ উঠে পড়ে।
-কি হল? আবার কি হয়েছে?
-চল। বাড়ি যাব। এই পাগলের বাড়িতে আর নয়। তাও পাগল হলেও বোঝা যেত। এ তো সেয়ানে পাগল। এই সকাল সকাল না বেরোলে আর হবে না। পিসে চোখ রগরাতে রগরাতে ঘর থেকে বেরিয়েছে। সামনে দাঁড়িয়ে দেবায়ন আর কাকলি সঙ্গে তাদের ছেলে সৈকত। দুজনেই ভাল জামাকাপড় পড়ে নিয়েছে। কোথাও বেরোবে।
-বলছি। আমার অফিসের জরুরী কাজ আছে। তাই আজকেই চলে যেতে হবেআমতা আমতা করে বলে দেবআমতা আমতা করে বলার কারণ অবশ্য আছে। সামনেই অষ্টমঙ্গলাতাই এই সময় কারুর চলে যাওয়াটা ভাল দেখায় না।
-আর বলতে হবে না বাবা। আমরাও চলে যাচ্ছি। এ বাড়িতে আর এক মূহুর্তও নয়। - মালবিকা তাকে সায় দিয়ে পিসেমশায়ের হাতে জামাকাপড় তুলে দেয়।
বাড়ি ফাঁকা হতে হতে সাড়ে ন’টা নাগাদ দেখা গেল বাড়ির কাজের লোকটাই শুধু বাকি। পরে তাকেও নাকি মারধোর করে তাড়িয়ে দেয় রিনির মা। বেচারি এই ক’দিন এত কাজ করল অথচ পারিশ্রমিকটাই পেল না। পাওয়ার মধ্যে নিজেকে অক্ষত রেখে বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছেএটাই হয়ত অনেক।
ধ্রুব অবশ্য এসব ভাবেনিসে ভেবেছিল সবাই নিজের সুবিধা দেখতেই রিনির মাকে একা ফেলে পালিয়েছে। সে তাই দুপুরের দিকে এ বাড়িতে এসেছিল। দিদিকে দেখাটা তার কর্তব্যের মধ্যে পরে বইকি।
দূর্ভাগ্যের বিষয়, মিনিট পনেরোর মধ্যেই তাকেও পালাতে বাধ্য হতে হয়েছিল। চলে যাওয়ার সময় তার হাত থেকে রক্ত ঝরছেচুল এলোমেলো।



                *                                 *                                      *
এর দুদিন পরের ঘটনা।
সন্ধ্যেবেলায় দেবায়ন অফিস থেকে ফিরেছে। কাকলি তার সাথে বসে চা খাচ্ছে। দেবের মোবাইলটা বেজে ওঠে হাম তেরে বিন। এই সময় ফোন? মোবাইলে দেখে নামে ঝলকাচ্ছে – ধ্রুব। ভুরু কুঁচকে যায় তারকি ব্যাপার? কাকলি বলে, কার ফোন? রিনির কাকা জবাব দেয় না।
-হ্যাঁ, হ্যালো।
-দাদা আপনি কোথায় আছেন?
-বাড়িতেই কেন?
ধ্রুব কিছুক্ষণ চুপ। তারপর কেটে কেটে বলে, রনিতের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।
-কি বলছ ধ্রুব! বৌদি জানে?
-না এখনও কিছু জানাইনি। কিভাবে জানাব ভাবছি। দুদিন যে ধ্রুব ঐ বাড়িতে পা রাখেনি। সেখানে তার যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। একথাগুলো আর সে দেবকে জানাল না। হয়ত প্রয়োজন বোধ করল না।
-ওকে তো জানাতে হবে। আর কন্ডিশন কেমন? কোথায় লেগেছে রনির?
-শুনছি নাকি মাথায় চোট পেয়েছেআসলে রিনিই ফোন করেছিল। বাইক অ্যাক্সিডেন্ট। অফিস যাওয়ার সময় ট্রাকের সাথে ধাক্কা লাগে। উল্টে পড়ে। বেঁচে গেছে, কারণ পাশে ঘাসের জমি ছিল
-হেলমেট ছিল না?
-নাঃ। তাহলে তো আর এই দুজ্ঞতি হত না। রিনি ওর মাকে জানাতে চাইছে না। আমি বললাম, তোরই তো মা। মাকে জানা। ও কিছুতেই জানাল না।
-হুম বুঝলাম। এখন রনির অবস্থা কেমন?
-স্টেবল বলছে। আমি ঘন্টাখানেক আগে ফোন করেছিলাম। আপনিও একবার করবেন। আর দাদা বলছিলাম কি, রিনির মাকে আপনি খবরটা দিতে পারবেন?
-উঁ। দেখ ভাই, তুমি তো কাছে থাকো। আ...মানে....তুমিই দাও নাবাড়িতে গিয়ে বুঝিয়ে শুনিয়ে বল। ভাল ভাবে বোঝাওআমি এত দূরে থাকি। এখন এই বিপদের খবর দিলে যদি কিছু হয়ে যায় তো আমি আর সামলাতে পারব না। বুঝলে..আমার মনে হয় তোমার জানানোটাই যুক্তিযুক্ত।
-আচ্ছা।
-আর আমি রিনিদের বাড়িতে ফোন করছি
-হুম। রাখলাম।
-বেশ।



              *                                       *                                           *
নার্সিংহোমে রিনি বেঞ্চে বসে আছে। পাশে মৃণ্ময়ী। একজনও কথা বলছে না। রিনির ভেতরটায় একটা উথালি-পাথালি টের পাচ্ছে। সে এই বাড়িতে আসার পরেই এই দুর্ঘটনা! রিনি ভাগ্যে বিশ্বাস করে, জ্যোতিষে তার আস্থা আছেসে জানে সবকিছুতেই ভগবানের যেমন হাত আছে। তেমনি অপশক্তিও আছে। যে শুধু খারাপ কাজ করে। সে বারেবারে তাই পুজো দিচ্ছে ঠাকুরের কাছে। মানত করেছে কালীমন্দিরে গিয়ে। ঠাকুর কি শুনবেন না তার কথা?
নাকি সে-ই এসবের মূলে দায়ী? সে নিজের কানে শুনেছে তার মা তাকে বলেছে – ‘তুই সুখী হবি না’। তার সংসার ভেঙে যাক তার মাও চেয়েছিল। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হতে থাকে তার। মায়ের চাওয়াটা যেন না সত্যি হয় – সে প্রার্থনা করে বারেবারে মনেমনে।
আরেকটা ব্যাপার তাকে খুব লজ্জা দেয়মায়ের সেদিনকার ওই কথাগুলো রনির বাবা-মা দুজনেই কিন্তু শুনেছিল। যদিও তারা এব্যাপারে তাকে কিছু বলেনি। সেটা ভদ্রতায় বাধে বলেই হয়ত বলেনি। কিন্তু সেটা এখন এই নার্সিংহোমের ক্লান্তিকর পরিবেশে তাকে আরো খোঁচা মারে। তোর মায়ের জন্যই সব হল – কে যেন তাকে বলে চলেছে নিরন্তর। কে যেন তাকে ভাবায় – এই সবকিছুর জন্যে সেই দায়ী।
কি করে নিজেকে মুক্ত করবে সে? যে তার কথা বুঝতে পারত সে এখন জ্ঞান হারিয়েছে। যদিও ডাক্তার বলছে ভয়ের তেমন কিছু নেই। তবু মন মানছে নাকখন উঠবে রনিত? তার সাথে কথা বলবে আগের মত? তাকে ভালবাসবে আবার?
শুধু বসে থাকা আর অপেক্ষা এখন সঙ্গী। কাজ থাকলেও নিজেকে ভোলানো যেত। অসহ্য লাগছে অসহ্য। রিনি তার সাইডব্যাগটার চেন খোলে। মোবাইলটা বার করে।



                  *                                   *                                     *
রিনির মা তখন বিছানায় শুয়ে ছিলনিজের মনে এই দুদিন সে যে কি চিন্তা করেছে তার খোঁজ কেউ রাখেনি। হঠাৎ তার মোবাইলটা বেজে ওঠেফোনে নাম ঝলকাচ্ছে – রিনিএকটু চমকে ওঠে সে। কিছু ভাবতে চায়। মেয়ে তাকে ফোন করেছে? কেন?
-হ্যালো।
-তোমার জন্য একটা ভাল খবর আছে। - তার ব্যঙ্গের তীক্ষ্ণ ইঙ্গিতটা মাকেও ছুঁয়ে যায়।
-কি? কিছুটা আশঙ্কা নিয়ে বলে রিনির মা।
-রনিতের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে মা। তোমাকে মা বলতেও আমার লজ্জা করে। কেন আমাকে জন্ম দিয়েছিলে তুমি? কেন আমার সারাটা জীবন শেষ করে দিতে চাও? চিন্তা কোরো না, যেটা চাইছো সেটাই হবে এবারে। আনন্দ কর এবার মা। তোমার মেয়ে আর সুখী হবে না।
কিছুক্ষণ মায়ের গলা থেকে আর কোন আওয়াজ বেরোয় না। সে কিছুক্ষণ থেমে বলে, কিভাবে হল রে?
ফোনটা কেটে দেয় রিনি। কিন্তু সে সামনে থাকলে দেখতে পেত মায়ের চোখ দুটো তখন জলে ভরে গেছে। সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে হু হু করে কাঁদতে থাকে। ঠিক যেমনটা করেছিল সে রিনির বাবার মারা যাওয়ার সময়।
সন্ধ্যেরাতের দিকে ধ্রুব এল বাড়িতে। ঘরের দরজা ধাক্কানোর আগে সে দুবার ভেবে নেয়। আগের বারের মারের দাগ তার গা থেকে এখনও সব মোছেনি। দরজা খুলতেই তেড়েমেরে আসবে না তো? ভয়ে ভয়ে আলতো চাপ দেয় কলিংয়ে। কোকিলস্বরে প্রায় আধমিনিট ধরে বাজে কলিংবেল।
-কে? ওপরের ঘর থেকে রিনির মা চেঁচায়
-আমি। ধ্রুবর গলা শুনে রিনির মা নিচে নেমে দরজা খোলে
-আয়। কেমন আছিস? তার এহেন কথায় বেশ অবাক হয় ধ্রুবকথায় এত স্বচ্ছলতা! ব্যাপার কি?
-আছি। ছোট্ট করে দায় সাড়ে সে। ঘরময় ধুপের গন্ধ। পুজো করছিলি? ধ্রুব জানতে চায়।
-হুম
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। মামা বলে, খারাপ খবর আছে একটা।
রিনির মা বলে, জানি। রনির অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। এই তো?
-হ্যাঁ। এটাই জানাতে এসেছিলাম। চলিআমার কাজ আছে।
-একটু বস না, ভাই। ধ্রুব উঠেও পিছন ঘুরে তাকায়। রিনির মা বলে, রিনি ফোন করেছিল বিকেলে। ও আমায় সহ্য করতে পারছে না।
ধ্রুবর বলতে ইচ্ছে করল, দোষটা তো তোরইকিন্তু পিছিয়ে গেলআবার হয়ত কোন কেলেঙ্কারি কাণ্ড বাধবে তাহলে।
রিনির মা বলতে থাকে, ভুলটা আমারই জানি। কিন্তু আমিই বা এখন কি করব বল? ঠাকুরের কাছে তাই প্রার্থনা করছিলাম রনিকে ভাল করে দিও। রিনিকে সুখী করে দিও
ধ্রুব তাকায় তার দিদির দিকে। দেখে ওর চোখদুটো ভিজে গেছে। সে বলে চলে, আমি সত্যি বলছি রে। রনির কিছু হোক এটা আমি চাইনি। আমি কারুর ক্ষতি চাইনি। কিন্তু তখন যেন নিজের মধ্যে আমি ছিলামই না। নিজের সংসারটা ভেঙে গেল, আমি একা হয়ে যাব। তাই একটা ভয় কাজ করত সবসময়।’ তারপর সে আবার বলে, ‘কেবলি মনে হত, আমার যদি কিছু হয়ে যায়, কে দেখবে? আমার তো আর কেউই রইল না।
ধ্রুবও কিছুক্ষণ কোন কথা বলে না। খানিকক্ষণ বাদে সে বলে, ‘ওসব কথা থাক। আমি আছি, তোর কোন চিন্তা নেই। ওসব নিয়ে একদম ভাবিস না।’
রিনির মা মাথা নিচু করে বসে থাকেআস্তে আস্তে বলে, ‘কিন্তু এখন রিনিকে কি বলব? ওকে ফোন করার মত মুখ আমার নেই। মা হয়ে আমি মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইব? ও আমায় ক্ষমা করবে? বল না?’ ধ্রুবর দিকে তাকায় সে উত্তরের আশায়।
ধ্রুব কোন উত্তর দেয় না। কিছুক্ষণ পর রিনির মা আবার বলে, আমার একটা কাজ করতে পারবি?
-কি? ধ্রুব ভুরু কুঁচকে রিনির মায়ের দিকে তাকায়।
-আমাকে ওখানে নিয়ে যেতে পারবি?
-কোথায়?
-নার্সিংহোমে। খারাপ দেখাবে নাআমি কিচ্ছু বলব না। শুধু ছেলেটাকে দেখে আসব। ওকে অনেক অনেক আদর করে আসবআশীর্বাদ করে আসব। তোর দাদাও অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছিল। মেয়েটার এখন যে কি অবস্থা তা শুধু আমিই জানিতুই একটাবার আমায় নিয়ে চ না। লক্ষ্মীভাইটি আমার। আমি চাই না ওর কিছু ...গলা বুজে আসে তারাথা হেঁট করে হাত দিয়ে মুখ ঢাকে।
শুনতে পায় ধ্রুব বলছে, ‘কথা দিলাম, কালই তোকে নিয়ে যাব।’