রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৩

অভিনব শাস্তি (সত্য ঘটনা)

ঠিক মনে নেই, কবে এই ভয়াবহ পরীক্ষাটি হয়েছিল আর কোথায়ই বা হয়েছিল। তবে সেটা যেখানেই হোক না কেন সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে তা অত্যন্ত এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে আসে। মানবমনের সাথে তার শরীরের সম্পর্ক যে কতখানি গভীর তা বুঝতে সাহায্য করে। প্রথম শোনার পর যদিও আমার এটা অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়েছিল। তবুও আমার তখন ক্লাস সেভেন। তাই ইস্কুলে সুদর্শন স্যর যখন গল্পটা বললেন তখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে মেনে নিয়েছিলাম পুরো ঘটনাটাই। আর কিভাবেই বা অবিশ্বাস করব? সুদর্শন স্যার পি.এইচ.ডি গোল্ড মেডেলিস্ট। আর তাছাড়া স্যর আমাদের অমনভাবে মিথ্যে গল্প বানিয়ে বলবেনই বা কেন? না মিথ্যে তিনি বানান নি। সে কথা আজ বুঝি মনস্তত্ত্ববিদদের সাথে কথা বলে। যাই হোক, এবার আপনাদের নিশ্চয়ই শুনতে ইচ্ছে করছে যে পরীক্ষাটা আসলে কি ছিল তাই তো? আসুন -

কোন এক আদালতে এক ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তার শাস্তি হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে একদল পরীক্ষক এলেন তাঁদের আর্জি নিয়ে। তাঁরা বিচারপতির সাথে নিভৃতে কিছু কথা বলতে চাইলেন। কিন্তু তাঁদের এই আর্জিটা যে কি ছিল সেটা তখনও কেউ জানত না। সাজা দেওয়ার দিন অপরাধীকে বলা হল, তোমার শাস্তি কোন সাধারণ উপায়ে হবে না। তোমার চোখ বেঁধে যেখানে নিয়ে যাব তুমি সেখানেই যাবে আর যা যা বলব তাই করবে। এই বলে অপরাধীর চোখ একটা কালো কাপড়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হল। এরপর তাকে একটি বিশেষ ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। ঘরে ঢোকানোর আগে তাকে এটা বলা হল যে এটা কিছু ভয়ানক বিষাক্ত সাপেদের আস্তানা আর এই সাপের কামড়েই তার মৃত্যু হবে। এটাই তার সাজা। এখানে উল্লেখ্য যে অপরাধী কিন্তু পরীক্ষার ব্যাপারে একচুলও অবহিত ছিল না। যেহেতু তার চোখ বাঁধা সেহেতু সে ঘরের সম্বন্ধে কোন ধারণাও করতে পারছিল না। কিন্তু সে সব কিছু শুনতে পাচ্ছিল। ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল সশব্দে। হঠাৎ সে শুনতে পেল সাপের হিসহিস শব্দ। সে বুঝতে পারল সাপগুলো তার কাছেই আছে। আর সেখানে একটা নয় প্রচুর সাপ। সে এবার ভয়ে চীৎকার করে উঠল। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না তার ডাকে। সে স্পষ্ট বুঝল তার পায়ের পাতার ওপর দিয়ে একটা সাপ চলে গেল। আরেকটা সাপ তার গায়ের ওপর দিয়ে উঠতে লাগল। সে ওটাকে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে সরাতে যাবে, কিন্তু তার আগেই সেটা তার হাতে মারল এক ছোবল। পিন ফোটার মত ব্যথা হল তার হাতে। সে বুঝতে পারল, হাত থেকে রক্ত তার পায়ের পাতায় পড়ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অপরাধী মারা যায়। আর এটাই ছিল পরীক্ষাটা।
এবার নিশ্চয়ই আপনারা আমায় বলবেন, এ আবার কি হল? সাপের কামড়ে অপরাধীর মৃত্যু হল এতে আর আশ্চর্য্য কি? কি যে সব ছাইপাঁশ লেখেন কোন মানে নেই। তাহলে আমি বলব সবুরে মেওয়া ফলে। হ্যাঁ, আসলে এটাই পরীক্ষা। ওটা কোন সাপের ঘর ছিল না, বরং ছিল একটা পরীক্ষাঘর। আর সেই ঘরে অনেকগুলো কেন একটাও সাপ ছিল না। যেগুলো ছিল সেগুলো হচ্ছে, একটা রেকর্ড প্লেয়ার যেটা থেকে ঐ হিসহিস শব্দ বেরোচ্ছিল। আর সেটা এত উন্নত মানের প্লেয়ার যে সেই শব্দকে যে কারুর সত্যি বলে ভ্রম হবে। আর অপরাধীর গায়ের ওপর দিয়ে বিশেষভাবে তৈরী দুটো দড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যেগুলোকে সে সাপ বলে মনে করেছিল। আর যখনই সে হাত দিয়ে দড়িটাকে সরাতে যায় তখনই তার হাতে দুটো পিন ফোটানো হয়। আর তার সাথে সাথে তার পায়ের ওপর জলের ফোঁটা ফেলা হতে থাকে। শুধু নিজের বিশ্বাসে সে নিজেই নিজেকে এইভাবে হত্যা করে। বলুন তো, ঘটনাটা সত্যিই ভয়াবহ কিনা? 

শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৩

আত্মসমর্পণ

সকাল ন’টার জানান দিয়ে ঘড়িতে ঘণ্টা পড়ে ঢং ঢং ঢং। বিছানায় বসে খবরের কাগজের পাতা ওলটাচ্ছিল প্রিয়তোষ। অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞাসা করে, ছেলে জামাকাপড় পড়ছে? পাশে বিরাট বড় একটা আয়নার সামনে ড্রেসিং টেবিল সাজাতে সাজাতে প্রিয়তোষের স্ত্রী ইন্দ্রাণী মাথা নাড়ায়, না:, ও বোধহয় এখনও বই নিয়েই ব্যস্ত। সামনেই ছেলেটার পরীক্ষা। মূহুর্তে মুখের ভাব পাল্টে যায় প্রিয়তোষের, সে কি? রাগে চীৎকার করে ওঠে প্রিয়তোষ। হাতের কাগজখানা ছুঁড়ে ফেলে বিছানার এক কোণায়। তারপর চশমাটা বিছানায় নামিয়ে রেখেই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে। তার এই উত্তেজনায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে ইন্দ্রাণী। তুমি ওকে কিছু বোলো না। ও যা করতে চায় করুক। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া স্বামীর দিকে কথাগুলো ব্যর্থভাবে ছুঁড়ে দেয় স্ত্রী।
পাশের ঘরে একটা সরু তক্তার ওপর বসেছিল হিতেন, গভীর মনোযোগ নিয়ে বইয়ের দিকে তাকিয়ে। দরজার উল্টোদিকে মুখ করে বসেছিল সে। বাবার ঘরে ঢোকা তাই জানতে পারেনি। তবে অচেনা এক অনুভূতি দিয়ে সে আন্দাজ করেছিল। বাবা ঘরে ঢুকেই ফেটে পড়ে, এখনো রেডি হস নি কেন? কি ভেবেছিস কি তুই? বইয়ে মুখ গুঁজে হিতেন জবাব দেয়, সামনের মাসেই টেস্ট পরীক্ষা। পড়তে হবে অনেক। বাবা সেসবের তোয়াক্কা করে না। কেটে কেটে উচ্চারণ করে, তুই যাবি, কি যাবি না? ধৈর্য্যের একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে বাবা। সেটা বেশ টের পায় হিতেন। তার মনে পড়ে, প্রায় দশ বছর আগে এমনই এক দিনে সে একবার বাবার কথার অবাধ্য হয়েছিল। ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙতেই বাবা তার গালে সপাটে মারল এক চড়। কিন্তু আঘাতটা বেকায়দায় লেগেছিল তার কানে। অসুস্থ বোধ করেছিল সে সেদিন। কান থেকে রক্ত পড়ছিল টপটপ। তারপর ডাক্তারবাড়ি, নার্সিংহোম ছোটাছুটি করে আজ এই দশ বছর বাদেও যন্ত্রণাটা তার কাটেনি। মাঝেমাঝেই কানের ভেতরটায় এখনও কটকটিয়ে ওঠে। সেই থেকেই বাবার অস্বাভাবিক রাগের ওপর দারুণ ভয় ছেলের। তাই এ দিন আর দেরী না করে দ্রুত সে সম্মতি জানায়। মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, বেরোচ্ছি। স্কুল ড্রেস হাতে নিয়ে বাধ্য ছেলের মত সে চেঞ্জ করতে যায়।
হিতেন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। সামনের মাসেই ওর টেস্ট পরীক্ষা। তাই পড়াশুনোর চাপ যে তার এখন তুঙ্গে, সেকথা অস্বীকার করা যায় না। তবু তাকে এখনই বেরোতে হবে। নইলে বাবা শুনবে না। তবে বাবার এই আচরণের পেছনে কারণ আছে, যদিও হিতেন তা মানে না। হিতেনের মনে কেন জানি না ভেসে আসে ক্লাস এইটের দিনগুলো। হিতেন চট্টোপাধ্যায় – এই নামটা ক্লাসে বেশ জনপ্রিয় ছিল। আর হবে নাই বা কেন? ফাইভ থেকে সেভেন অব্দি সে যে কোনদিনও থার্ড পজিশনের নিচে নামেনি। ওপরেও ওঠেনি যদিও কোনদিন। তিন বছর ধরেই সে থার্ড হয়ে এসেছিল। সবাই এতে বেশ আশ্চর্য্য হয়েছিল। কিন্তু সবাইকে আরো আশ্চর্য্য করে এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় সে সর্বপ্রথম ক্লাসের মধ্যে সর্বসেরা হল। রেজাল্ট বেরোনোর দিনটায় আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল সে। মনে পড়ে তার, সেদিন মা-বাবা-আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধব সবাই তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। কত জনে কত উৎসাহ দিয়েছিল। কত কেউ বলেছিল, আরো এগিয়ে চল, কেউ বা, বাঃ, এই তো চাই। কেউ আবার, তুমি আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে – এই বলে শুভেচ্ছা জানিয়েছিল। তাদের অনেকেই যদিও আড়ালে অন্যরকম বলেছিল। হিতেন স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল, গার্জিয়ানদের মিটিং এ একজন বলছে, সুযোগ পেলে আমার ছেলেও ফার্স্ট হত। মাস্টারদের হাত করতে পারলে কি না হয়।
স্কুল ড্রেসে বাথরুম থেকে বেরিয়ে হিতেনের চোখে পড়ে খাওয়ার টেবিল। খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। মনটা বিষিয়ে ওঠে হঠাৎ। একদম খেতে ইচ্ছে করছে না। খাবার টেবিলের দিকে এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। বাবা পাশের ঘর থেকে চেঁচায়, তাড়াতাড়ি খেতে বস। আর আধঘণ্টার মধ্যে স্কুলে পৌছতে হবে।
ক্লাস নাইনের অ্যানুয়াল পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে তার সামনে বসেছিল অনিরুদ্ধ। হিতেনের আগে ক্লাস সেভেন পর্য্যন্ত সেই ফার্স্ট হয়ে আসত। ‘এই অনি, দুইয়ের উত্তরটা চার হবে তো?’ – হিতেনের তর্জনীর খোঁচা খেতেই অনিরুদ্ধ ‘উফ’ করে শব্দ করে। ব্যাপারটা ইনভিজিলেটরের নজর এড়ায় না। ‘অ্যাই আস্তে। কি হচ্ছে কি? – বিরক্তির সুরে ধমকে ওঠে ইনভিজিলেটর পার্থ স্যার।  হিতেন জানতো অনিরুদ্ধ ঐ দুইয়ের অঙ্কটা পেরেছে। তার সংশয় ছিল। সে তারপর আর কিছু বলেনি। কারুর কাছ থেকে আর সাহায্যও চায়নি। একটা ব্যাপার তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। ক্লাসের কেউ কেউ তাকে হিংসা করছে। প্রথম প্রথম খারাপ লাগত তার। তারপর যখন নাইনের রেজাল্ট বেরোল ফার্স্ট বয়ের নাম আবার হল – হিতেন চট্টোপাধ্যায়।
অহঙ্কারসূচক একটা হাসি হেসে ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে থাকে সে। এগিয়ে চলে সময়। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে নয় ছুঁতেই বাবা বেরিয়ে আসে পাশের ঘর থেকে। ‘আমিও যাব তোর সাথে’ – বলে চেঞ্জ করতে বাবা বাথরুমে ঢোকে। ভাতের গ্রাস তুলতে গিয়ে থমকে যায় হিতেন। বাবা কি তাকে সন্দেহ করছে? সে স্কুলে ঠিকমত যাবে কিনা সে নিয়ে বাবার সংশয় কি এখনো কাটেনি? কে জানে। কাটতে নাও পারে। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।
মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগে সে একটু চিন্তিত ছিল। বন্ধুবান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন – সবাই তারই দিকে মুখিয়ে। ফার্স্ট বয় হিতেন এবার কেমন রেজাল্ট করবে? চেনা-পরিচিতের মধ্যে এটাই ছিল সবথেকে হট টপিক। তবে হিতেনের উদ্বেগের আরো কারণ ছিল। সে মাধ্যমিকের টেস্টে সেকেন্ড হয়েছে। চার নম্বরের জন্য ফার্স্ট পজিশনটা তার ফসকে গেছে। অনিরুদ্ধ পেয়েছে সেই পজিশন। কিন্তু এই পরীক্ষাতেও কি সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে? চিন্তাটা হিতেনকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোনোর দিন। স্কুলে যাওয়ার আগে সামান্য দুমুঠো ভাত মুখে তুলেছিল সে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সবটা বমি হয়ে গেল। পেট তার খাবার চায় না, হয়ত সেও এখন শুধু রেজাল্টই চায়। স্কুলে পৌছতেই সে টের পেল, হাত-পা তার অবশ হয়ে আসছে। নোটিশ বোর্ডের পাশে নোংরা দেওয়ালটায় বিরাট গেজেট পেপার সাঁটা। রোল নম্বর আর তার পাশে প্রাপ্ত নম্বর। নম্বরগুলোর ওপর আঙুল বুলিয়ে নিজের রোল নম্বরটা দ্রুত খুঁজতে থাকে সে। পাশ থেকে অভিষেক এসে তার পিঠে একটা টোকা মারে, কি রে, কত পেলি? কিন্তু হিতেনের সেসবে কোন খেয়াল নেই। সে একমনে খুঁজে চলেছে তার নম্বর। খুঁজতে খুঁজতে এক জায়গায় থমকে যায় সে। ঘুরে দাঁড়িয়ে অভিষেককে বলে, স্কুলে হায়েস্ট কত রে? অভিষেক একটু চিন্তা করে জানায়, সাতশো চল্লিশ। হিতেন আবার নিজের রোল মেলায়। তার পাশে নম্বর দেখে, সাতশো চল্লিশ।
সাড়ে ন’টা বাজতেই সে রেডি। গোমড়ামুখে মা কে একবার ‘যাই’ বলে বেরোয় বাড়ি থেকে। মা বলে ওঠে, যাই বলতে নেই, বলো আসি। হিতেন তাই জানায় মৃদুস্বরে। মা বলে, অত মন খারাপ করার কিছু নেই। কিন্তু সে আর কোন উত্তর না দিয়েই বেরিয়ে আসে। পেছন পেছন আসে বাবা। সে জোরে হাঁটতে থাকে। পিছিয়ে পড়ে বাবা। মোড়ের মাথায় বাস। ফাঁকাই ছিল। জানালার ধারে সিট নিয়ে বসে হিতেন। মাথাটাকে নিস্পৃহভাবে এলিয়ে দেয়। মাধ্যমিকের পরে কি সুন্দর ছিল দিনগুলো। স্কুলে তার ফার্স্ট হওয়ার কথা মা পাড়ায় বলে বেড়াত, বাবা অফিসে। সবাই তখন দেখতে চায় হিতেনকে। মা ছেলেকে চুমু খেয়ে বলে, হিতু আমার। তুই আমার সোনার ছেলে। বাবা তার পিঠ চাপড়ে বলতো, আমাদের বংশে এরকম ছেলে এই প্রথম। সত্যি, ও আমাদের গর্ব। হিতেন জানত, তাদের বংশে কোন অনার্স গ্র্যাজুয়েটও নেই। ওর মা মাধ্যমিক আর বাবা উচ্চমাধ্যমিকটা পর্য্যন্ত গড়িয়েছে। আর যারা জ্যাঠা-কাকা-মামা-পিসি-মাসি তারাও তথৈবচ। কাজেই এ বংশে তার মত ছেলে যে একেবারেই অপ্রত্যাশিত তা তো বলাই বাহুল্য। তাই, আত্মীয়-স্বজন যারা কোনোদিন সম্পর্ক রাখতে চাইত না, তারাও যেচে যেচে তার সাথে কথা বলতে শুরু করল। প্রাইভেট স্যারেরা বলত, ওর মত ছেলে পেয়েছি আর চিন্তা কি? অন্যান্য ছেলেদের স্যারেরা  বলত, ওর মত ট্যালেন্টেড ছেলে খুবই দুর্লভ। স্বভাবতই, হিতেনের উৎসাহ এতে আরো বেড়ে যায়। তাকে আর পায় কে! সে শুধু একটাই কথা তখন ভাবত, এবার সে উচ্চমাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করবে। এই স্কুলে তাকে কেউ হারাতে পারবে না। সেই স্কুলের একমাত্র ফার্স্ট বয়। আর দুর্ভাগ্যের কথা, মনে মনে এই কথাটাকেই সে প্রশ্রয় দিয়ে চলত।
তবু সবকিছুই হয়ত ঠিকই চলত। কিন্তু মাঝখানে কোত্থেকে এসে জুটল এক অপরাজিত। ক্লাস ইলেভেনে এই স্কুলে নতুন ভর্তি হয়ে এল সে। যেমনি স্মার্ট, তেমনি ভাল পড়াশুনোতেও। একটু অদ্ভুত টাইপেরও এ ছেলে। আর পাঁচটা ছেলের চাইতে বেশ আলাদা। অন্যান্য ছেলেদের পড়া বোঝাতে স্যারেদের যতটা সময় লাগত, একে তার সিকিভাগেরও কম লাগে। ফিজিক্স কিংবা ম্যাথমেটিক্স, কেমিস্ট্রি কিংবা স্ট্যাটিসটিক্স – যেকোনো বিষয় কিভাবে যে এত তাড়াতাড়ি ও ধরতে পারে তা সাধারণ ছেলেরা তো দূরস্থ, স্যারেরাও বুঝতে পারে না। অনেকে বলতে থাকে, ওর ব্রেনের গঠনটাই বোধহয় আলাদা। তাই হয়তো ওর বুদ্ধি এত বেশী। অথচ আরো আশ্চর্য্যের ব্যাপার, পড়া নিয়ে এ ছেলে একেবারেই উদাসীন। বন্ধুরা কোনোদিনও ওকে ওর বাড়িতে খুঁজে পায়নি। হয় রামুদার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারছে, নয়তো কোন চুল্লু ঠেকে গেছে। আর তা না হলে মাঠে ব্যাডমিন্টন কিংবা ফুটবল খেলছে। ফার্স্ট বয় কি লাস্ট কারুর সাথে মিশতেই কোন দ্বিধা করে না সে। তাই এবার ধীরে ধীরে সকলেরই দৃষ্টি ঘুরতে থাকে এই অদ্ভুত টাইপের নতুন অতিথিটির দিকে। পড়াশুনোয় ফাঁকি মারছে দেখে অতীন স্যার একবার অপরাজিতকে বলেছিল, এত ফাঁকি মারিস কেন? ভাল করে পড়লে তুই যে কত বড় হতে পারিস তা আমাদের ধারণারও অতীত। অপরাজিত এর উত্তরে ক্যাজুয়ালি বলেছিল, আমার পড়াশুনো করতে ভাল লাগে না স্যার।
এ হেন ছেলে একদিকে যেমন সকলের নজর কাড়ল, তেমনি স্বাভাবিকভাবেই সে হিতেনের গলার কাঁটাও হয়ে উঠলো ধীরে ধীরে। হিতেন ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তবু তাকে বাদ দিয়ে অন্য ছেলেকে নিয়ে সবাই বাড়াবাড়ি করে কেন? অনুপম স্যারও সেদিন বলছিল, তোমাদের ফার্স্ট, সেকেন্ড আর থার্ড বয়ের পাশে আরো একজন প্রতিযোগী এসেছে। এই আমাদের অপরাজিত। ও কিন্তু এবারে স্ট্যান্ড করতেই পারে। সত্যি বলতে কি, এ সব কথা একেবারেই ভাল লাগত না হিতেনের। আরো অসহ্য লাগত যখন স্যারেরা বলতে লাগল, অপরাজিত কিন্তু একেবারেই এক্সট্রাঅর্ডিনারি। কিন্তু হিতেনও যে সবার থেকে আলাদা? সে কথা তো কেউ বলে না। সে তাই নিজেকে বাকীদের থেকে আলাদা করে রাখত। তার জন্য সেকেন্ড বেঞ্চির ধারের সিটটা ঠিক হয়েই ছিল। সেকেন্ড বা থার্ড বয় ছাড়া তার পাশে কেউই বসত না। বা বলা ভাল অন্য সাধারণ ছেলে তার পাশে বসুক এটা সে-ই চাইত না। অন্য ছেলেরা টিফিন টাইমে যখন হৈ-হুল্লোড় করত, হিতেন তখন ফাঁকা ক্লাসরুমে শেলীর কবিতা পড়ে চলত একমনে। তাই দেখে একদিন অপরাজিত ওকে বলেছিল, কি রে সবাই খেলছে, তুই খেলবি না? হিতেন মুখ তুলে ওকে একবার জরিপ করার ভঙ্গীতে দেখে নিল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, আমি বাজে কারণে সময় নষ্ট করি না। অপরাজিত এরপর আর কিছু বলেনি। একটু অবাক হয়েছিল। তারপর হয়ত মনে মনে বলেছিল, এই কারণেই তোকে কেউ ঘাঁটায় না। তুই সবার থেকেই আলাদা।
বাস চলছে বেশ জোর। হাওয়ায় হিতেনের চুলগুলো উড়ে ওলটপালট হয়ে যায়। সুন্দর করে আঁচড়ানো ঘন চুল কাকের বাসার মতো এলোমেলো লাগে। ইলেভেনের অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগে সে মনে মনে এ কথা বিশ্বাস করত যে ফার্স্ট সে ই হবে। এ বিশ্বাস তার আজকের নয়। অনেক দিন আগেকার। কবে থেকে যে সে এ ধারণাকে মনে ঠাঁই দিল আর কবেই যে তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করল, তা সে নিজেই ঠিকমত জানে না। কিন্তু এটা বেশ বোঝে যে এই স্কুলে ফার্স্ট একমাত্র সেই হতে পারে। আর কেউ তার ধারেকাছে আসার যোগ্য নয়। হ্যাঁ, এটাই সত্যি। এভাবে নিজের মনে অনেক জোর পায় হিতেন। তার এই বিশ্বাস তাকে স্কুল পর্য্যন্ত পৌঁছে দেয় নিরাপদে। কিন্তু স্কুলে গিয়েই সে খবর পেল তার ফার্স্ট হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তাকে টপকে অপরাজিত হয়েছে ফার্স্ট। এমনকি সেকেন্ড পজিশনটাও কেড়ে নিয়েছে অনিরুদ্ধ। আর হিতেন হয়েছে থার্ড। রাগে দুঃখে চোখ ফেটে জল আসতে থাকে হিতেনের। তার এতদিনের লালিত বিশ্বাস কি করে ভুল হতে পারে? তার স্বপ্ন, আশা যাকে সে এতদিন ধরে প্রশ্রয় দিয়েছে, তা কি করে এত সহজে মিথ্যা হতে পার? তার ফার্স্ট হওয়ার চিন্তাই তো তাকে অনুক্ষণ বাঁচিয়ে রেখেছিল। তার লেখাপড়া, তার সাধনা সমস্ত কিছুতেই তো তার একটাই চিন্তা ছিল যে সে স্কুলের ফার্স্ট বয়। কিন্তু তা তো এত সহজে মিথ্যা হবার নয়। এ নিশ্চয়ই স্যারেদের কাজ। হিতেনের মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তার মনের আজন্মলালিত বিশ্বাস নয়, বাস্তবেই কোথাও ভুল আছে। আর সেই ভুল স্যারেরাই করেছে। অপরাজিত আর অনিরুদ্ধ স্যারেদের হাত করেছে। তাই স্যারেরা ওদের অত প্রশংসা করে। নইলে হিতেন চট্টোপাধ্যায় কখনো থার্ড হতে পারে না। তার এই রাগে আরো ইন্ধন যোগ হয়, যখন সে শোনে পাশে তারই ক্লাসমেটেরা বলাবলি করছে, এবার হিতেন ফার্স্ট হতে পারল না। কি অবস্থা! সে স্পষ্ট বোঝে তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে সবাই একথা বলছে। তার ইচ্ছা হয় চেঁচিয়ে বলে, এসব কারচুপির ফল। অপরাজিত আর অনিরুদ্ধ দুজনেই স্যারেদের সাথে হাত মিলিয়েছে। তবে তারা তার আগে আসতে পেরেছে। হিতেন চট্টোপাধ্যায়কে হারানো অত সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু সে হয়ত ভুলে গেছিল, সে যখন ফার্স্ট হত, আশেপাশের লোকেরাও তার নামে এই একই অপবাদ রটাত।
বাস কন্ডাক্টর চেঁচাতে থাকে, লিচুবাগান, লিচুবাগান। বড় বিরক্তি লাগে হিতেনের। মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে তার। পাশে বাবা গম্ভীর মুখে বলে, চ, ওঠ। এরপরের স্টপেজেই তো নামতে হবে। এক পাও আর এগোতে ইচ্ছা করে না হিতেনের। মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষ যেন তার বিরোধিতা করে চলছে। এই সবকিছুর জন্য দায়ী তার বাবা, নিজের মনে গর্জে ওঠে সে। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতেই পরের স্টপেজ স্কুল। ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালা। আজ এখানে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। হিতেন আগে থেকে ঠিকই করে রেখেছিল যে সে এখানে আজ আসবে না। কারণ হিতেন চট্টোপাধ্যায় কখনো থার্ড প্রাইজ নিতে পারে না। স্যারেদের কারচুপিতে সে থার্ড হয়েছে, সেও মানা যায়। কিন্তু প্রাইজ নেওয়া? ছিঃ! নিজেকে ফার্স্ট ছাড়া অন্য কোন প্রাইজ নেওয়ার যোগ্য বলে সে মনে করেনি। এখনও করে না। মাকে সেকথা জানাতেই মা বলে, ঠিকই বলেছিস, স্যারেদেরই কাজ এসব। নয়তো তোর মত ছেলে কি করে থার্ড হয়? না না। তোকে আর প্রাইজ নিতে যেতে হবে না। মায়ের কথায় অনেকখানি নিশ্চিন্ত হয় হিতেন। আর বাবাকে এ সম্পর্কে কিছু জানাবে না বলেই ঠিক করেছিল সে। কারণ বাবাকে সোজা-সাপ্টা লোক বলে তার মনে হয় না। সবকিছু সে আগে খোলাখুলি জানবে, তারপর নিজের যা মনে হয় তাই বলবে। আর তাছাড়া বাবা তার স্কুল-পড়াশুনো সম্বন্ধে বিশেষ একটা খোঁজও রাখে না। তাই বাবার থেকে ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়া খুব একটা অসুবিধাজনক হবে না বলেই মনে হয়েছিল তার। কিন্তু যা ভাবা হয় তা হয় না। বাবা তার পড়াশুনোর খেয়াল ঠিকই যে রাখত, তার পরিচয় পেল সে সেদিন। বাবা ওর পড়ার ঘরে এসে কথাপ্রসঙ্গে জানতে চাইল, তোদের স্কুলে প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন কবে আছে? হিতেন প্রথমে ভেবেছিল সে বলে দেবে, আনি না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, নাঃ, বাবা ঠিকই জেনে যাবে। অগত্যা সে বলতে বাধ্য হল, সামনের শুক্রবার। কথাটা বলেই সে বইয়ের পাতায় মুখ গোঁজে। তারপর প্রকৃত কারণ এড়িয়ে গিয়ে আড়ষ্টভাবে বলে, এবার যাব না ঠিক করেছি। পড়াশুনোর চাপ অনেক। তাছাড়া সামনে টেস্ট। বাবা ঘরটায় চুপ করে পায়চারী করতে থাকে। হিতেন মাথা নিচু করে পড়ার ভান করে। মনে দোলাচল। খানিকক্ষণ বাদে বাবা গম্ভীরমুখে বলে, না। এতে এমন কিছু সময় নষ্ট হবে না। প্রাইজ আনতে কোন অসুবিধা নেই। হিতেন সরাসরি বাবার বিরুদ্ধে যেতে সাহস করে না। বাবা আবার অর্ডারি ভঙ্গীতে বলে, প্রাইজ আনতে যেতেই হবে, সে ফার্স্ট প্রাইজই হোক কি থার্ড প্রাইজ। বাবা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বাবার শেষ কথাটায় একটা ইঙ্গিত ছিল। সেটা হিতেনের কানে বাজে। এরপরে বাবাকে সে অনেক অনুরোধ করেছে, বাবার ওপর রাগ করেছে। এ নিয়ে অভিমানও করেছে সে অনেক। তবু তাতে কোন ফল হয়নি। কিন্তু হিতেন তাতেও দমেনি। সে পাড়ায় বলে বেরিয়েছে সে ফার্স্ট হয়েছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই জানে হিতেন অন্যবারের মত এবারেও ফার্স্ট হয়েছে। আর হিতেনের কাছেও সত্য এটাই। সে ফার্স্ট। এখানে কোন কম্প্রোমাইজ চলে না।
স্কুলের সামনে বেশ বড় একটা মাঠ। সেই মাঠেই স্টেজ তুলে অনুষ্ঠান চলছে। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা রাখছেন নন্দন স্যার। স্টেজের সামনে দুটো বিরাট বড় বক্স। বক্তৃতার পরেই শুরু হবে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। হিতেনের তখনও ইচ্ছা করে সে সেখান থেকে চলে যায়। পরক্ষণেই তার চোখে পড়ে বটগাছটার গোড়ায় স্বামী বিবেকানন্দের মত বুকের কাছে হাত গুটিয়ে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে। স্টেজের সামনে বিরাট অঞ্চল জুড়ে লাল রঙয়ের সারি সারি চেয়ার পাতা। ধারের দিকে একটা ফাঁকা জায়গা বেছে নিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে হিতেন।
পুরস্কার বিতরণ শুরু হয় খানিক বাদেই। হৈ-হট্টগোলে অ্যানাউন্সমেন্টের আওয়াজও চাপা পড়ে যায়। গার্জিয়ানরা কিছু পাশে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে আছে। ক্লাস ফাইভ, সিক্স, সেভেন ... এমনিভাবে এগোতে এগোতে ক্লাস ইলেভেনের পুরস্কার নেওয়ার পালা আসে একসময়। অপরাজিত, অনিরুদ্ধ আর হিতেনকে মঞ্চে উঠে আসতে বলা হয়। পা দুটো টেনে টেনে মঞ্চের দিকে এগোয় হিতেন। কিন্তু পরিস্থিতিটাকে সে এড়াবে কিভাবে? যে করে হোক তাকে এ পরিস্থিতি মেনে নিলে চলবে না, নিজের মনে কঠোর হয়ে ওঠে হিতেন। মঞ্চের ওপর উঠে তিনজন পাশাপাশি লাইন দিয়ে দাঁড়ায়। অপরাজিতকে প্রথমে ডাকা হল ফার্স্ট প্রাইজ নেওয়ার জন্য। অপরাজিত এগিয়ে যায়। হেডস্যার রত্নদীপ ব্যানার্জি পুরস্কার তুলে দিতে যায় তার হাতে। আর ঠিক এই সময়েই হিতেন মাথা নীচু করে। চোখদুটো বুজে ফেলে সে মূহুর্তে। দর্শকরা কেউ কি টের পেল? অবশ্য টের পেলেও কিছু আসে যায় না হিতেনের। এই পরিস্থিতিটাকে এড়ানোই তার এখন একমাত্র লক্ষ্য। পুরস্কার দেওয়া হলে মাথাটা আবার তুলে চোখ খোলে সে। ‘এরপর দ্বিতীয় স্থানাধিকারী ছাত্র অনিরুদ্ধ পাল’ ঘোষিত হয় বক্সে। অনিরুদ্ধর পুরস্কার নেওয়ার সময়েও ঠিক একইভাবে আবার নিজের চোখদুটো বন্ধ করে হিতেন। এবার তার পুরস্কার নেওয়ার পালা। ঘোষণা হবার পর হেডস্যারের হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে মাথাটাকে সামান্য নিচু করে মঞ্চ থেকে নেমে এল সে। এই প্রথম সে পুরস্কার নেওয়ার পর স্যারকে প্রণাম করল না। মঞ্চ থেকে নামতেই তার চোখে পড়ে সুবিনয় স্যার, স্কুলের অ্যাসিস্টেন্ট হেড। স্যার তাকে দেখে হাসলেন। বললেন, ভাল আছো হিতেন? ঈষৎ হেসে ছোট্ট করে জবাব আসে, হ্যাঁ। তারপরই স্যারের একটু কাছে এগিয়ে সে জিগ্যেস করে, আচ্ছা স্যার, ট্রান্সফার সার্টিফিকেটের জন্য কবে যোগাযোগ করব? স্যার তার এই কথাটায় একটু আশ্চর্য্য হলেন, খানিকটা অপ্রতিভও। তারপর বললেন, মঙ্গলবার দেখা করতে পারিস। মৃদু হেসে হিতেন মাথা নাড়ায়। তারপর পাশ ফিরতেই দেখে তার পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবা। চমকে ওঠে সে।
মঙ্গলবার সুবিনয় স্যার যদিও ভেবেছিলেন হিতেন ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিতে ঠিকই আসবে। কিন্তু সেদিন সে আসেনি। পরেও কোনদিন স্যারকে এ ব্যাপারে আর কোন প্রশ্ন করেনি সে। ট্যুয়েলভের বাকি দিনগুলো সে এই স্কুলেই কাটিয়েছিল।
প্রকাশিত - গল্পকবিতা ডট কম। 
                                                                                      লেখা – ঐশিকা বসু। 

শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৩

তফাৎ

বর্ধমান লোকাল থেকে লাফ দিয়ে নেমে পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে দৌড়তেই অমিয় দেখে ট্রেনের শেষটুকু প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে 'ধুস শালা' - বলে একটা শ্বাস ছাড়ে অমিয় ছেলের জ্বর হয়েছে বলে অফিস থেকে একটু আগে বেরিয়েছিল আজ কিন্তু এই বর্ধমান লোকালটা এমন লেট করে ব্যাণ্ডেলে ঢোকে যে নৈহাটি যাওয়ার ট্রেনটা প্রতিদিন বেরিয়ে যায় এরপরের ট্রেনের জন্য আবার চল্লিশ মিনিট বসে থাকো মনে মনে বিরক্ত হয়ে ওঠে অমিয় ছেলেটা কেমন আছে জানতে বাড়িতে ফোন করে সে চারিদিকে হকারের চেঁচামেচি, অন্যসব ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট, প্যাসেঞ্জারের হৈ-হট্টগোলে চারিদিক মাতোয়ারা। অমিয়র মতো এই লাইনের ডেলি প্যাসেঞ্জারেরা মনে করে রেলের এসব ঠিক করা থাকে। একটা ট্রেন এরকম লেট করে ঢুকলে প্যাসেঞ্জারগুলো বেশ কিছুক্ষণ স্টেশনে বসে থাকবে। হকারদের থেকে কিছু কিনে খাবে সে চা-ই হোক কিংবা ফলপাকড়। তাতে হকারদের লাভ বাড়বে। তাই তারা ইচ্ছা করে লেটে ট্রেন ঢোকায়। আর এ নিয়ে হকারদের সাথে রেলের লোকেদের দীর্ঘদিনের গাঁটছড়া বাঁধা আছে। অন্তত অমিয় তাই মনে করে। সত্যি কি বিজনেস। বাড়ি থেকে খবর আসে তার ছেলে পিন্টুর সকাল থেকে একবারই জ্বর এসেছে। এখন সে ঘুমোচ্ছে। একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অমিয়। যাক জ্বরটা তাও বাড়েনি। তিনদিন ধরে জ্বরে ভুগছে ছেলেটা। বাড়িতে গিয়েই ওকে ডাক্তার দেখাতে হবে। আজ ডাক্তার না পাওয়া গেলে কাল দরকার হলে অফিসে ছুটি নিতে হবে। কথাগুলো মনে মনে বলতে বলতে অমিয় সামনের বেঞ্চিটাতে বসে। ব্যাগ থেকে আনন্দবাজার বের করে হেডলাইনসগুলোর ওপর দিয়ে চোখ বোলাতে থাকে। কাগজে বেশ মগ্ন হয়ে গেছিল সে। জয় কালিয়ার বিখ্যাত মাছরাঙা এয়ারলাইনস ঋণের দায়ে বন্ধ হয়ে গেছে, নরোত্তমকে ২০১৪র ভোটে প্রধানমন্ত্রী করা হবে কি না সে নিয়ে জলঘোলা চলছে, শচীন্দ্রনাথ টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেবেন কি না কেউ বুঝতে পারছে না ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎই কাগজে একটা টোকা। ওপর থেকে পাখিতে ইয়ে করল কিনা দেখতে গিয়ে মুখ তোলে অমিয়। তাকাতেই দেখে তার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ক্লাস টেনে ফেলে আসা ক্লাসমেট রাজেশ। বয়স একই হলেও চল্লিশের গোড়ায় অমিয়র মতো রাজেশের মাথা জোড়া টাক নেই। আছে যেটা, ঘন কাঁচাপাকা চুল। ক্লিন শেভ করা চকচকে গোলগাল মুখ। কানে হেডফোন, হাতে মোবাইল। কি খবর? প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর বাদে দেখা, চিনতে পারিস? একই স্কুলে পড়লেও রাজেশের পূর্বসূরিরা সব বিহারের বাসিন্দা। তবে ওর জন্ম এখানেই। কিন্তু এখন আর এখানে থাকে না। উচ্চমাধ্যমিকের পরই বিজনেস করতে বন্ধুরা মিলে গুজরাটে পাড়ি দেয়। তারপর অনেকদিন রাজেশের সাথে অমিয়র যোগাযোগও ছিল। কিন্তু আজ রাজেশকে এভাবে এখানে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় সে। একগাল হেসে উল্লসিত হয়ে বলে, আরে রাজা যে! হঠাৎ এখানে? কি ব্যাপার? অমিয়কে শেষ করতে না দিয়েই রাজেশ ওকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি শুরু করে। রাজেশ বলে, এই তো। বাড়িয়ে এসেছিলাম। মা-বাবা রয়েছে তো এখানেই। ভাইয়েরা সব আছে। তোর খবর কি? অমিয় বলে, আমি তো এখন ইউকো ব্যাঙ্কে আছি। দেবীপুর ব্রাঞ্চে। তুই তো শুনলাম গুজরাটে গিয়েছিলি। বিজনেস কেমন চলছে? রাজেশ জানায়, চলছে সব ঠিকঠাক। ওখানেই তো আছি এখন। তারপর হিন্দুস্থান লিভারের একটা নতুন ডিলারশিপ নিয়েছি ওখানে। অমিয় মুচকি হেসে বলে, তোর বাংলা শুনলে মনে হবে না যে তুই বাঙালী নস। এতদিন পর এসেও সাচ্চা বাঙালীর মত কথা বলিস। রাজেশ মৃদু হেসে ছোট্ট করে বলে, ওটা এসে যায়। অমিয় জিজ্ঞেস করে, তারপর, তোর পারফিউমের বিজনেস কেমন চলছে? ওটার জন্যেই তো গুজরাটে গেছিলি। রাজেশ ক্যাজুয়ালি হেসে বলে, ওটা তো আছেই। তারপর কত কিছু হল। সাবানের বিজনেস খুললাম, সামনে একটা রঙয়ের বিজনেস খোলার ইচ্ছে আছে। তারপর স্টেশনটার দিকে একটু উঁকি মেরে বলে, চ, ট্রেন আসছে। অমিয় দেখে ট্রেনের আলো। স্টেশনের সামনেটায় লাইন দিয়ে লোকের ভিড়। বেশীরভাগই অফিসফেরৎ যাত্রী। ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে ঢুকতে একবার জোর গলায় ‘পঁ’ করে চীৎকার করে ওঠে।
ট্রেনে উঠে আরামসে বসারও সিট পেয়ে গেল ওরা। অমিয় বলে, তোর বাড়ির খবর কি? রাজেশ বলে, চলছে সব ঠিকঠাক। রাজেশও ওর বাড়ির খবর নেয়। তারপর কথায় কথায় অমিয় বলে, জানিস তো, তোকে দেখলেই আমার বিজনেস করার ইচ্ছাটা আবার জেগে ওঠে। ছোটবেলায় বড়ো সাধ ছিল, বুঝলি, একটা বিজনেস খুলব। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠোঁটটাকে উল্টে সে বলে, সে আর হল না। রাজেশ ফিক করে হেসে বলে, এখনও তো খুলতে পারিস। এর কি কোন বয়স আছে? অমিয় কথাটাকে ঝেড়ে ফেলে বলে, আরে ধুর! এখন এই সংসার আর চাকরির মধ্যে কি আর সেসব হয়? কিছুক্ষণ ওরা চুপচাপ। ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে করছে। চারিদিকের ক্যাঁচরম্যাচর আওয়াজ, আর তখন থেকে কার মোবাইলে যেন হয়ে চলেছে, হাম তেরে বিন। গার্ডের হর্ন দেওয়ার আওয়াজ আসে। অমিয় বলে, তবে, তোর সাথে আরো ক’টা দিন কাটালে আমিও হয়তো তোর মতোই ব্যবসা-ট্যাবসা শুরু করে দিতাম। চাকরিতে হাজার হোক একটা একঘেয়েমি আছে। রাজেশ একটু বিজ্ঞের মত করে বলে, ব্যবসার আসল কথাটা কি জানিস? অমিয় নিরুত্তর। রাজেশ বলে, প্রফিট। আর প্রফিট বাড়াতে তোর মেন যে জিনিস দরকার তা হল অ্যাডভারটাইসমেন্ট আর ইনোভেশন। অমিয় বলে, আর কোয়ালিটি? রাজেশ চটজলদি বলে ওঠে, আরে রাখ তোর কোয়ালিটি। ওসব পরের কথা। আগে অ্যাড না দিলে লোকে তোর প্রোডাক্ট কিনবে কেন? অ্যাডটাই তোর প্রোডাক্ট আইডেন্টিটি। বুঝলি? অমিয় ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবে। পাশ দিয়ে একটা লজেন্সওয়ালা কড়কড়ে গলায় চেঁচাতে থাকে, ভাল লজেন্স আছে নিয়ে যান। বলতে বলতে সে অমিয়র সামনে লাল আর সবুজ রঙয়ের তিন-চারটে লজেন্স বাড়িয়ে ধরে। অমিয় মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই হকারটাকে দেখলেই অমিয়র বিরক্তি লাগে। ক’দিন আগেই এই লোকটা বলছিল ওর ছেলের নাকি খুব অসুখ। কিছু সাহায্য চাই। আর আজ দেখো। দেখে মনেই হচ্ছে না ওর মনে কোন দুশ্চিন্তা আছে। শালারা সব মিথ্যুক। অমিয় ভাবে, ঠিকই করেছিল সে ওকে সেদিন সাহায্য না করে। সে চলে যেতেই রাজেশ তার আগের কথার খেই ধরে বলে, তবে একটা ব্যাপার ঠিক। এক-একজনের অ্যাডভারটাইসমেন্ট করার স্টাইল এক এক রকমের। কেউ অ্যাড দেয় টিভিতে, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায়, কেউ বা এই হকারের মত গলার ভয়েসে। কিন্তু সবারই একটাই কথা, প্রফিট। প্রফিট কমলেই তাই আমাদের মাথায় হাত। অমিয় বলে, হ্যাঁ, এই তো আজকের কাগজেই পড়লাম, জয় কালিয়ার এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেছে। রাজেশ বলে, তাহলেই বোঝ। লোকটার মাথায় এখন কত চাপ। অমিয় বলে, এই মন্দাতেই তো কত কোম্পানি উঠে যাচ্ছে। রাজেশ বলে, সে তো হচ্ছেই। একটা কোম্পানি চালানো যেমন বিরাট ব্যাপার, তেমনি মার্কেটে লস খেলে মালিক একেবারে শেষ। তুই কি ভাবিস, এই অনিল-মুকেশ আম্বানিদেরও কি কম চাপ নাকি? একবার কোম্পানি পিছোতে শুরু করলেই হয়েছে। অমিয় বলে, হ্যাঁ, তখন সব দায় গিয়ে মালিকের ওপরেই পড়বে।
হঠাৎই হইহই চীৎকার। চেন টানলো যেন কেউ। অমিয় গল্পে মজে এতক্ষণ খেয়ালই করেনি কখন ব্যাণ্ডেল থেকে ট্রেন ছেড়ে দুটো স্টেশন পেরিয়ে এবার নৈহাটি ঢুকছে। কিন্তু এত হৈ-চৈ কিসের? নৈহাটি ঢুকতে তো অনেকটা বাকি। ট্রেনটা যেখানে দাঁড়িয়েছে তার দুদিকে বড় বড় দুটো বিল। অমিয় দেখে ট্রেন থেকে কেউ কেউ লাফ মেরে নেমে পড়ছে। কেউ দরজা দিয়ে, কেউ বা জানলা দিয়ে সামনের কামরার দিকে তাকাচ্ছে। কেউ বা আবার অমিয়র মতোই হতভম্ব। অমিয় উঠে দেখতে যায় কি হল। একজন জানায়, সামনের কামরা থেকে একজন হকার গাড়ি থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। অমিয় আশ্চর্য হয়ে বলে, কেন? লোকটা বলে, মনে হয় সুইসাইড করতে গেছিল। অমিয় পরে তার সহযাত্রীদের কাছ থেকে জানতে পারল, যে লজেন্সওয়ালা কিছুক্ষণ আগে তাদের সামনে বিক্রি করছিল, ঝাঁপটা সেই দিয়েছে। আসলে সেদিন ওর একটাও লজেন্স বিক্রি হয়নি। আগের দিনেও না। বাড়িতে তার ছেলের অসুখ। সংসার চালাবার সামর্থ্যও হয়তো তার আর নেই। অমিয়র মনে পড়ল, লোকটা তার কাছ থেকে সেদিন সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু মিথ্যে কথা ভেবে তার কথায় সেদিন কেউই তাকে পাত্তা দেয়নি। অমিয় ভাবে, তার নিজের ছেলেরও তো অসুখ। কেউ কেউ বলতে লাগল, আর ভেবে কি হবে বলুন? যা যুগ পড়েছে। সবাই হয়তো ভাবল, সত্যিই তো আর ভেবে কি হবে। তার থেকে নিজের কাজে মন দেওয়াই ভাল। কিন্তু আজ অমিয়র সেসব মনে হল না। বরং তার একটা আক্ষেপ হতে লাগল। মন বারবার বলতে লাগল, একবার দেখে আসে লোকটাকে। সে দৌড়ে যায় ট্রেনের দরজার কাছে। সামনের কামরার কাছে বেশ কিছু লোকের জটলা। জানা গেল, লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে অমিয়র আর দেখা হল না। সে ভাবতে লাগল লোকটার কথা। চোখটা সরু হয়ে গেল তার। কোন এক অজানিত জীবনের হতভাগ্য ছবি সে দেখবার চেষ্টা করলো। কিন্তু সবটাই তার কাছে খুব অস্পষ্ট। রাজেশের গলার স্বরে তার সম্বিৎ ফেরে। রাজেশ ক্যাজুয়ালি একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কি রে! কি ভাবছিস? আরে ও আদমি তো পাগল হ্যায়। ইতনা কিঁউ সোঁচতে হো? রাজেশের কথায় অবাক হয়ে যায় অমিয়। ভাষাটার মত রাজেশও যেন অমিয়র থেকে আলাদা হয়ে যায় মুহুর্তে।

পরের দিনের খবরের কাগজের পাতা ওল্টাতেই বেশ চমকপ্রদ একটা খবরে অমিয়র চোখ আটকে যায়। সামনের পাতায় বড় বড় হেডিংয়ে লেখা, জয় কালিয়া তিরুপতি মন্দিরে পাঁচ কেজি সোনা দান করেছে। পাশে জয় কালিয়ার হাসিমুখের ছবিও ছিল।   

বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৩

অ্যাক্সিডেন্ট

বিকেল তখন বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে। মালঞ্চ নার্সিংহোমের ওটি ডিপার্টমেন্টে ডাঃ রায় গম্ভীরভাবে পেশেন্টের পালস পরীক্ষা করছেন। ফ্যাকাশে সাদা বেডে শুয়ে থাকা পেশেন্টের সারাটা মাথা জুড়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা। স্যালাইন চলছে। স্থির হয়ে আছে তার দেহটা। নার্স দুজন একদৃষ্টে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে। পালস দেখা শেষ হলে হাতটা আস্তে করে নামিয়ে রাখলেন ডক্টর। তারপর একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওটি থেকে বেরোতেই এক ভদ্রমহিলা উদগ্রীব হয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে এল। অবস্থা কেমন, ডাক্তারবাবু? প্রশ্নটা যেন ভদ্রমহিলার ভেতর থেকে আপনিই বেরিয়ে এল। ডাক্তার মাথাটাকে সামান্য নাড়িয়ে বললেন, তেমন পজিটিভ নয়। আর আধঘণ্টা ওয়েট করছি। আশা করি, তার মধ্যে সেন্স ফিরবে। লেটস সি, নাউ। চশমাটা বাঁ হাত দিয়ে ঠিক করে দ্রুত পায়ে ডাক্তারবাবু চলে গেলেন অন্যদিকে। পাশ থেকে এক ভদ্রলোক সেই ভদ্রমহিলার কাঁধে হাত রাখতেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিল স্বপ্ন। মাসির এই কান্না দেখে ওরও চোখ ফেটে জল আসতে লাগল। আর সবথেকে বেশি রাগ হতে লাগল তার নিজের ওপর। আসলে এই সবকিছুর মূলে যে সেই, একথা তো আর অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সেদিন ওর কি মনে হয়েছিল কে জানে? ঠিক করল, মাসতুতো বোন লিপিকে সে স্কুটি চালানো শেখাবে। খেয়ালটাও যে এমনিতে আসে নি। আসলে ওর বাবা সদ্য স্কুটি কিনেছে। নিজের কাজে অনেক সময় বাইরে-টাইরে যেতে হয়, এই ভেবেই কেনা। কিন্তু সেটা যে এভাবে স্বপ্ন দখল করে নেবে, তা কে বুঝেছে। দুদিন শুধু লেগেছে তার শিখতে। তারপর দোকানে যাওয়া, বন্ধুর বাড়ি যাওয়া, বন্ধুদের সাথে ফুর্তি করা, এমনকি কদিন আগে ওটা নিয়ে পড়তে যাবে বলেও ঠিক করেছিল। কিন্তু মায়েরপইপই করে মানাআর বাবার চোখ রাঙানিতে শেষমেশ তাকে ক্ষান্ত হতে হয়েছিল। কিন্তু তাতেও তার হল না। কাউকে না শেখালেই তার নয়। কাকে শেখান যায়, কাকে শেখান যায় ভাবছে। এমন সময় মওকা নিজেই এসে হাজির। কদিনের ছুটি নিয়ে দুদিন আগে মেসোরা এসেছিল। ব্যস! তাকে আর পায় কে? মাসতুতো বোন ছিল লিপি। ওকেই ধরল। বয়সের দিক থেকে ওরা প্রায় পিঠোপিঠি। মাত্র তিন বছরের ফারাক। তাই প্রথম ছাত্রী তার একরকম ঠিকই হয়ে গেল। কিন্তু লিপির বয়স যে পনের সে খেয়াল তার নেই। ওকে চুপি চুপি সেদিনই দুপুরে বলে, অ্যাই বুনু, স্কুটি চালাবি? আয় তোকে শিখিয়ে দিই। দুপুরের ঘুম সেরে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে লাফিয়ে ওঠে বুনু। এদিকে বুনু ভাল করে সাইকেলটাও চালাতে পারে না। ডেসপারেট মেয়ে! বিকেল হতে না হতেই বেরিয়ে পড়ল দুজনে। মা আর মাসি তখন দোতলায় ঠাট্টা-ইয়ার্কিতে ব্যস্ত। হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। আর এদিকে বাবা আর মেশো দুজনেই বেশ নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। যাক নির্বিঘ্নেই হবে শেখানোটা। স্বপ্নের মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। গাড়ি চালাতে শিখে যদি কাউকে নাই শেখান গেল, তাহলে কি আর কোন লাভ আছে? আর স্কুটি চালান একেবারেই সোজা। আলাদা করে স্টার্ট দেওয়ার কোন ঝামেলা নেই, গিয়ার-ফিয়ার চেঞ্জেরও কোন পাপ-বালাই নেই। সব দেখেশুনে বুনু বলে, বাঃ, তো খুব সোজা! কোন চিন্তাই নেই। যা হোক করে উঠে বসল বুনু। গাড়িতে স্টার্ট দিয়েই রেখেছিল স্বপ্ন। বলেছিল, পরের বার থেকে তুই- স্টার্ট দিয়ে চালাবি, বুঝলি? মাথা নেড়েই বুনু আক্সিলেটরে দিল জোর চাপ। আসলে জানতোও না চাপ দেওয়ার কায়দাটা। আর স্বপ্নও সেকথা ওকে বলতে ভুলে গেছে। ব্যস। গাড়ি গিয়ে ল্যাম্পপোস্টে মারল এক ধাক্কা। লিপি ছিটকে পড়ল রাস্তায়। মাথা ফেটে চৌচির। চারিদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত। মাথাটা ধরে রাস্তায় ছটফট করতে থাকে সে। পড়িমরি করে ছুটে এল স্বপ্ন। রাস্তার লোকজন সব ছুটে এসেছে। চীৎকার-চেঁচামেচিতে বাবা আর মেশোর ঘুম গেল ভেঙে। আর মা-মাসি দুজনেই তখন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে নিচে
ভাগ্যিস কাছেই মালঞ্চ নার্সিংহোমটা ছিল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখানে ভর্তি করান হল। কিন্তু ততক্ষণে ওর সেন্স হারিয়ে গেছে। ব্লিডিং হয়ে চলেছে ক্রমাগত। ডাক্তারের নির্দেশে ব্যান্ডেজ বেঁধে আগে ব্লিডিং বন্ধ করা হল। তারপর হল সিটি স্ক্যান। কিন্তু স্ক্যানের রিপোর্টে খারাপ কিছু মিলল না। কোন ইন্টারনাল হেমারেজ নেই। তবু মারাত্মক ব্লিডিং এর কারণে ক্ষতির একটা আশংকা ছিলই। বেশ কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেল। কিন্তু লিপির সেন্স ফিরল না। অপেক্ষা করা হল আরও বেশ কয়েক ঘণ্টা। তবুও কোন রেসপন্স নেই। অবশেষে ডাক্তার আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় দিলেন। যদি তার মধ্যেও সেন্স না ফেরে তাহলে পেশেন্ট কোমায় চলে যেতে পারে। নার্সকে বললেও ডাক্তারের এই কথাগুলো সেদিন মাসির কানে ঠিকই গিয়েছিল। সারাদিন ধরে তার খাওয়া নেই, ঘুম নেই, তবু ওরা সবাই ভেবেছিল দু-দিনের মধ্যে জ্ঞান ঠিকই ফিরবে। কিন্তু সেই আটচল্লিশ ঘণ্টা শেষ হতে এখন আর মাত্র আধঘণ্টা বাকী। এর মধ্যে দু-একবার হাল্কা রেসপন্স করলেও সেন্স কিন্তু তার ফেরেনি। বুনু জাগবে তো কিছুক্ষণের মধ্যেই? প্রশ্নটা স্বপ্নের ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগল। ভেতরটায় কষ্ট হতে লাগল তার। একটা অপরাধ বোধ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। এই দুদিন সে তো সর্বশক্তি দিয়ে সবাইকে সাহায্য করেছে। দরকার হলেই ওষুধ এনে দিয়েছে, ইঞ্জেকশন এনে দিয়েছে। যার যা প্রয়োজন সমস্ত কিছু সে মনপ্রাণ দিয়ে করেছে। শুধু এটুকুই তার প্রার্থনা ছিল, বুনুকে যেন সে আবার আগের মত ফিরে পায়। আবার যেন তারা আগের মতই খেলা করতে পারে, খুনসুটি করতে পারে। কিন্তু তার সেই প্রার্থনা সফল হল না কেন? সে তো কারুর কোন ক্ষতি চায় নি। ভাবনাগুলো তাকে যেন পুড়িয়ে দিয়ে যেতে লাগল। মা, বাবা, মাসি, মেসো – সবাই থাকতেও নিজেকে বড্ড একা মনে হতে লাগল তার। বারবার মনে হতে থাকে, কেন গাড়ি চালানো শেখাতে গেল সে? বুনুর এতবড় ক্ষতি সে কিভাবে করল? একটু যদি সে ভেবে দেখত, কিংবা যদি গাড়ি চালাবার কথাটা তার মাথায় না আসত, কিংবা যদি... এইভাবে কয়েক সহস্র সম্ভাবনার মিথ্যে কল্পনার ভিড়ে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগল সে। মাসি কিংবা মেসো – কারুর দিকেই এখন আর তাকানোরও সাহস নেই তার। তার শুধু মনে হতে থাকে, অপরাধ করেছে সে। সে পাপী। আর এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও সে এটাও খেয়াল করেছে যে মাসি আর মেসো দুজনেই তাকে এড়িয়ে চলছে এ ‘কদিন। বুকের মধ্যেটায় একটা কষ্ট জমে আসে তার। সে তো আর বুনুকে কম ভালবাসত না। তার মনের পরতে পরতে ভেসে ওঠে ছোটবেলার সেইসব দিনগুলো। যখন বুনুকে সে পড়াত। অনেক ছোট ওরা তখন। মাসিরা তখন এই নৈহাটিতেই থাকত। সে কিনা তিনবছরের বড় দাদা। তাই বুনুকে সে না তো কে পড়াবে? বুনুকে কড়া গলায় বলত, অনেক খেলা হয়েছে, এবার পড়তে বসবি চল। বেশীরভাগ দিনই বুনু সহজে পড়তে চাইত না। তখন ওর কানটা ধরে মুলে দিত দাদা। আর তাতেই ভ্যাঁ করে চীৎকার জুড়ত বুনু। আবার এমনও অনেক দিন যেত যেদিন দাদা অঙ্ক না পারার জন্য বাবার কাছে বকা খেত। তখন বুনু আড়ালে ফিক করে হেসে উঠত। এভাবেই কখন কেটে গেছিল তাদের ছেলেমানুষিতে ভরা শৈশব। তাদের ভালবাসা, আন্তরিকতা সমস্তটাই একটা নিবিড় বন্ধনে তাদের ঘিরে রেখেছিল। আর তাই হয়ত অনেক বড় হয়েও সেই দাদার কাছেই বুনু পড়তে চাইত। বলত, বড় হলেই বা। তোর কাছে না তো কার কাছে পড়ব? তারপর মাসিরা একদিন চলেও গেল নৈহাটি ছেড়ে। সেটল হল ওরা দূর্গানগরে। চলে যাওয়ার দিনটাতে, মনে আছে, কিছুতেই যেতে চায়নি বুনু। শেষে ও ঘুমিয়ে পড়লে গাড়ি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবু মাসিরা অন্যান্য আত্মীয়দের মত নয় যারা তাদের ভুলেই গেছে। মাসিরা প্রায়ই আসে ওদের বাড়ি। ওরাও যায়। তাই স্বপ্নের সেই দাদাগিরি, সেই শাসন আজও ঘোচেনি। সে তাই এখনও বুনুকে সব কিছু নিজের হাতে শেখাতে চায়। বুনুর সব কিছুর ওপরেই যেন তারই শুধু অধিকার। আর তাই ও স্কুটিটাও বুনুকে নিজের হাতে শেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজের পক্ষে আনা কোন যুক্তিই আজ সে নিজেই মেনে নিতে পারছে না। তার কেবলই মনে হতে থাকে, সে অপরাধ করেছে। একটা মস্ত বড় অপরাধ। এর কোন ক্ষমা নেই। নিজের মনেই কথাগুলো বলে ওঠে স্বপ্ন। কেউ তাকে লক্ষ্য করে না। মা বেঞ্চিতে মাথাটাকে হেলান দিয়ে বসে আর বাবা মাথা নিচু করে গালে হাত দিয়ে বসে বসে পা দুটো হাল্কা দোলাচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই জবাব পাওয়া যায় আটটার। বুনু কি আর সাড়া দেবে না? না না। সে কি করে হতে পারে? এই তো সেদিন সে কি সুন্দর তাকে বলেছিল, হ্যাঁ, আমায় গাড়ি চালানো তুই –ই শেখাবি, চল। কিন্তু সে কি করে এত নীরব হতে পারে? চোখ ফেটে জল আসতে থাকে স্বপ্নের। ডাঃ রায় সামনে দিয়ে ঢুকলেন ওটি তে। মাসি দুহাতে মুখ চাপা দিয়ে বসে আছে। মেসো মুখটাকে অন্যদিকে ফিরিয়ে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। হয়ত বা নিজের মেয়ের মুখটাকেই কল্পনা করছে। আর যাদের অনুশোচনা আর আক্ষেপ সবথেকে তীব্র। স্বপ্নের সেই মা-বাবার মুখগুলো একেবারে শুকিয়ে এসেছে। একদিকে রয়েছে তাদের নিজের ছেলে। অন্যদিকে তাদের বোনঝি। যে নিজের মেয়ের থেকে কোন অংশে কম নয়। যাকে তারা নিজের ছেলের সাথেই পড়তে দিয়েছে, খেলতে দিয়েছে, মানুষ হতে দিয়েছে। তবু মায়ের মনটা হু-হু করে ওঠে নিজের ছেলের মুখটার দিকে তাকিয়েও। কিছু না বললেও স্বপ্নের ভেতরের কষ্টটা মা ঠিক টের পেয়ে যায় কিভাবে। বেঞ্চিতে বসে মাথাটাকে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে আড়চোখে একবার স্বপ্নকে দেখে নেয় মা।
হঠাৎই চমক ভাঙে ডাঃ রায়কে ওটি থেকে বেরোতে দেখে। মাসি ভয়ার্ত চোখে তাকায় ডাক্তারের দিকে। কিছু জানতে চাওয়ারও সাহস হয় না তার। মেসোই ডাক্তারের দিকে এগিয়ে যায়। যা জানা গেল, অবস্থা বিশেষ কিছুই উন্নতি হয় নি। পেশেন্টকে মেডিকেল কলেজে রেফার করতে হবে। তারপর কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে আবার তিনি আরো কিছুক্ষণ ওয়েট করার কথা বললেন। তার কথাগুলো সবথেকে বেশী যার বুকে বাজল সে স্বপ্ন। তার ইচ্ছে এতটুকু মিটল না। তার বুনু কথা বলল না। এর থেকে আর বেশী কষ্টের কি হতে পারে? এবারে তার মধ্যে শুধু নিজেকে দায়ী করা নয়, একটা ভয়ও দানা বাঁধতে লাগল। বুনুর যদি কিছু হয়ে যায়? তখন তার নিজের অবস্থাটা কি হবে? এই ঘটনার কালো দাগটা কি সারাজীবনেও মোছা যাবে? মূহুর্তে সামনের অনিশ্চিত ভবিষ্যতটা তার কাছে যেমন অকল্পনীয় তেমনি ভয়াবহ হয়ে উঠল। নার্সিংহোমের পরিবেশটা তার বিশ্রী লাগতে থাকে। যে কোন ভাবে হোক, এই জায়গাটা তাকে ছেড়ে যেতেই হবে। অসহ্য লাগে তার চারিদিক। গা গুলিয়ে ওঠে তার বারবার। সে কোন কিছু আর না ভেবে ছুটে বেরিয়ে এল নার্সিংহোম ছেড়ে। যাওয়ার আগে একবার যেন অস্পষ্টভাবে শুনতে পায় মায়ের গলা, কি রে, কোথায় যাচ্ছিস? কিন্তু সেসবে তার তখন মন নেই। সে তখন শুধু ছুটে চলে যেতে চায়। দূরে, আরো দূরে, বহুদূরে। সারাটা পৃথিবী তার কাছে অসহ্য ঠেকে। এসবের মধ্যেও তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুনুর হাসিমাখা মুখটা। নিজেকে বড্ড ছোট বলে মনে হয় তার। সে তার এই নিষ্পাপ বোনটাকে কি করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল? পাপী, সে পাপী। তার ভাবনা ভুল হোক, ঠিক হোক – কিন্তু আজ তার সামনে কেউ নেই যে তার এই ভাবনা থেকে তাকে বের করে আনবে। সে তাই চলতে লাগল একাকী। যেদিকে তার পা দুটো তাকে টেনে নিয়ে যায়। নিজের চলার ইচ্ছা শক্তিটাও যে তার ফুরিয়ে গেছে। সোজা রাস্তা ধরে চলতে চলতে একসময় সে সামনে দেখতে পেল হাইওয়ে। গাড়িগুলো ছুটে চলেছে সোঁ সোঁ করে। তার সারাটা মন তখন ক্লান্ত, অবসন্ন। একবার মনে হল, এই গাড়িগুলোর চাকার তলায় সে নিজেকে শেষ করে দেয়। কিন্তু পরক্ষণেই মন তাকে একাজে বাধা দিল। কেন জানি হঠাৎ তার মনে হল, এখুনি ফিরে গেলেই সে বুনুকে সুস্থ দেখতে পাবে। সে তার দিকে তাকিয়ে হাসবে। বলবে, কি রে? ভেবেছিলি আমি আর উঠবো না? ধুর বোকা, তাই কি হয়? এই দেখ, আমি কি সুন্দর তোর সাথে কথা বলছি। ভাবনায় হঠাৎ ছেদ পড়ে স্বপ্নের, একটা অটোর ঘরঘর আওয়াজে। অটো থেকে এক অল্পবয়সী ভদ্রমহিলা তার মেয়েকে নিয়ে নামল। স্বপ্নের চোখ পড়ে ঐ বাচ্চা মেয়েটার দিকে। বছর পাঁচ কি ছয়ের ফুটফুটে মেয়ে। তার বুনুকেও এই বয়সে ঠিক এমনই দেখতে ছিল। তারও এমনই দুটো গভীর কালো চোখ, ফর্সা গাল...... হঠাৎ হাইরোডের ওপার থেকে কে একটা ডেকে উঠতেই বাচ্চাটা ‘মামা’ বলে চেঁচিয়ে একছুট দিল রাস্তার ওদিকে। ওর মা তখন অটোর ভাড়া দিতে ব্যস্ত। গাড়িগুলোকে কেয়ারই করল না বাচ্চাটা। আর ঠিক সেই সময়ই একটা টাটা সুমো বিপুল বেগে বাচ্চাটার একেবারে সামনে এসে পড়ল। ওর মা চীৎকার করে ওঠে আতঙ্কে। মূহুর্তে পুরো দৃশ্যটা ঘটে যায় স্বপ্নের সামনে। সে আর কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা দিয়ে বাচ্চাটাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় রাস্তার পাশের ঝোপে। তারপরে সে নিজেও উঠতে যায়। কিন্তু তার আর সময় নেই। গাড়ির এক ধাক্কায় অদূরে ছিটকে পড়ে স্বপ্নের দেহটা। একটা পাথরে ধাক্কা লেগে ওর মাথাটা টুকরো টুকরো হয়ে
যায় নিমেষে। 

ঠিক এই সময়েই মালঞ্চ নার্সিংহোমের নার্স হন্তদন্ত হয়ে ডাঃ রায়কে জানায়, ডক্টর, পেশেন্ট রেসপন্স করছে। চমকে ওঠেন ডাঃ রায়, বলছ কি? নার্স হেসে বলে, হ্যাঁ ডক্টর। ও মাকে দেখতে চাইছে। খবরটা পেয়ে ডাঃ রায়ের মন আনন্দে নেচে ওঠে। তখনই তিনি ছুটলেন পেশেন্টের রুমে। তারপর মাসি, মেশো, বাবা, মা সবাইকেই জানানো হয় খবরটা। সবাই নিশ্চিন্ত হয়, লিপি আবার ভাল হয়ে গেছে। আবার তাকে আগের মত সুস্থ দেখবে সবাই। মাসি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। হু-হু করে কেঁদে ওঠে। খুশীতে মেশো আর বাবার চোখেও জল এসে যায়। মাও খুব খুশি হয়। কিন্তু তারপরেই উদ্বিগ্ন স্বরে বলে, ছেলেটাকে খবরটা জানানো দরকার। ও কোথায় গেল?
প্রকাশিত - এপার বাংলা ওপার বাংলা (বই)