শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

অভিজিত রায় মারা গেলেন কেন?

বাক স্বাধীনতা হরণ করাটা ধর্মের ধ্বজাধারীদের যুগযুগান্তরের নেশা বলতে পারেন। যদি আপনার মনে বিশ্বাস থেকেই থাকে তবে অন্যকে আঘাত করার কি কোন প্রয়োজন পড়ে? মনে তো হয় না। আসলে এ সমস্যাটা রয়েছে অন্য জায়গায়। বস্তুত, এই ধর্মীয় উগ্রবাদীরা (তা যে ধর্মেরই হোক না কেন) নিজেদের প্রভু হিসেবে দেখাতে চায়। তারা এটা প্রমাণ করতে চায় এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু সম্ভব তার কোন কিছুই তাদের অজ্ঞাত নয়। কিন্তু বাস্তব তো আর তা নয়। তারা তো অনেক কিছুই ভুলভাল বকে। আর সেটাই তো স্বাভাবিক, কারণ তারাও যে মানুষ। কিন্তু তারা যে মানুষ, তারা নিজেরাই সে কথা মানে না, আর ভাবে তারাই বুঝি গড, ভগবান, আল্লার দূত বা প্রেরিত ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সমস্যা হয় যখন বিজ্ঞান এসে সত্যটাকে দেখিয়ে দেয়। তারা যখন বলতে শুরু করে সূর্য আসলে ঘুরছে না, সে স্থির, বরং পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে তখনই ধর্মবাদীদের যায় মাথা খারাপ হয়ে। তাদের যে এতদিনকার অচলায়তন খুলে গেছে সেটা তারা কি করে মানবে? প্রভুর কথাই যদি আজ মিথ্যে হয়ে যায়, তবে লোকে যে ছি ছি করবে। তখন তাদের ভগবান হওয়াই বা হবে কি করে, আর এতদিনকার বলতে থাকা চলতে থাকা ব্যবস্থাই বা টিকবে কি করে? প্রভুত্ব যে তবে যায় যায়। তা কি আর মেনে নেয় এরা?
না নেয় না। আর সেই কারণেই এই হত্যালীলার দরকার হয়ে পড়ে। খুন কর, গলা কেটে ফেল, ভেঙে ফেল, বন্ধ করে দাও সমস্ত বিরোধী আওয়াজ। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলেছিলেন, 'দ্বার বন্ধ করে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?' আর এ তো সত্যকে সরাসরি আটকানোরই অভিপ্রায়। কিন্তু এতে তো মানুষ খেপে যাবে। তারা যে বলবে যাদের এতদিন প্রভু বলে জেনেছিলাম, মহান বলে যাদের কথা মেনে চলতাম তারা কি করে অস্ত্র শস্ত্র বের করছে? তাহলে তারা কি ভণ্ড? তখন ধর্মের গোঁড়ামি কি করে রক্ষা হবে? একটা উপায় আছে। প্রচার কর এই বলে, তুমি ইসলাম, তাই তুমি মহান/ তুমি হিন্দু তাই তুমি মহান/ তুমি খ্রীষ্টান, তাই তুমি মহান। আর এই মহান ধর্মকে আজ আঘাত করা হচ্ছে। কে করছে, কিছু বিজ্ঞানবাদী, মিথ্যেবাদীর দল। তাই তোমার ধর্মকে রক্ষা করার জন্যই ওকে মারা হল। কত বড় মহান কাজ করা হল বল তো? এই না হলে ধর্মীয় উগ্রতা! আমিও তো আমার ধর্মকে ভালবাসি, কিন্তু কোন বিরোধীস্বরকে বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন তো হয়নি আমার। কারুর মতানৈক্য হলে তর্ক করুন। কিন্তু আবার দেখুন যেন তার সাথে বন্ধুত্বও থাকে অটুট। কিন্তু এমনটা ভাবলে তো এত কাণ্ড হতই না। উগ্র ধর্মীয় ধ্বজাধারীদের মূল উদ্দেশ্য যত না ধর্মকে রক্ষা করা তার চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ মানুষের আবেগ কেড়ে তাদের ওপর প্রভুত্ব ফলিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির করা। আর এই থেকেই তো যত বাবা-মোল্লার উৎপত্তি। প্রকৃতপক্ষে ধর্মটা ব্যক্তিগত ব্যাপার, বিশ্বাসের ব্যাপার। তার প্রতি আস্থা রেখেও বিজ্ঞানচর্চা করা যায়। কিন্তু এই খুন যারা করে, তারা অন্য কাউকেই মানতে চায় না। কারণ তাদের অস্তিত্বরক্ষার তাগিদটা রয়েছে যে সেখানে। এদের রূপ যুগযুগান্তর ধরে একই। অপরদিকে, সত্যকে যারা প্রকাশ করতে চায়, তারা কিন্তু নিজেদের বদলে ফেলে। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে তারা এগিয়ে চলে, মানিয়ে নেয় পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে। জিত কিন্তু হয় তাদেরই। দেখুন, অতীতে ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল বাইবেলের অভ্রান্ততাকে অস্বীকার করার জন্য। আজ মানুষ জানে, বাইবেল অভ্রান্ত নয়। ব্রুনোকে মারা গেছিলেন, কিন্তু সত্য মারা যায় নি। সেখান থেকে হাল আমলে নরেন্দ্র দাভালকারকেও মারা হল। কেন? না তিনি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে আইনও আনবার চেষ্টা তিনি করেছিলেন। তাই তাঁকে মারা হয়েছে। কিন্তু তাঁর আদর্শের কি মৃত্যু ঘটেছে? মুক্তমনা চেতনাকে জাগ্রত করুন। ভেবে দেখুন, কি মানব? কেন মানব? প্রশ্ন করতে শিখুন, তারপর উত্তর খুঁজুন। ধর্ম জানুন, অধর্মও জানুন। কোরান পড়ুন, রামায়ণ-- মহাভারত-গীতা পড়ুন, পড়ুন বাইবেলও। আবার জানুন দ্বান্দ্বিক যুক্তিবাদ। তারপর নিজেই বিচার করতে পারবেন কোনটা ঠিক আর কোনটা নয়। লেখা আর বাড়িয়ে ভারাক্রান্ত করব না (ইতিমধ্যেই যদি না তা করে থাকি)। অভিজিত রায়ের ঘটনা নতুন কিছু নয়। সব ধর্মেই অভিজিত রায়েরা তৈরী হয়। তাদের হত্যা করা হয়, আবার জন্মও নেয় তারা। ধর্মের নামে অধর্ম যারা করে তারাই শেষমেষ পরাস্ত হয়। আজ দিকে দিকে যুদ্ধের দামামা বেজেছে। যারা অভিজিত রায়কে হত্যা করল তাদেরই বড়সড় রূপ আইএস, আলকায়দা, তালিবান, লস্কর - ই -তৈবা। বলা বাহুল্য, এরাও টিকবে না বেশিদিন। নতুন যুগ আসছে, নতুন চেতনা তৈরি হচ্ছে যেখানে হত্যা নয়, ধ্বংস নয়, বৈচিত্র্যের মাঝে মিলনই হবে সম্ভব।

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

মাতৃভাষার আন্দোলন - আমার চোখে

আজ একুশে। অমর একুশে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ব্যাপারটা হাস্যকর কিংবা উৎকেন্দ্রিক মনে হতে পারে, কিন্তু তবুও বলব আমার কাছে এই দিনটার গুরুত্ব অন্যরকম। কতকটা ব্যঙ্গাত্মক। আবার অনেকখানিই ট্র্যাজিকও বটে। কিছু মানুষের প্রাণ গেছে এই আন্দোলনে, বাংলাভাষা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে তাতে। কিন্তু বাঙালী? তাদের অবস্থা তো কিছু বদলায় নি। সত্যি, বাঙালী এক দূর্ভাগ্য পীড়িত জাতি - এ কথা বলতে আজ আমার এতটুকু বাধে না। কি ভৌগোলিক ক্ষেত্রে, কি সংস্কৃতিগত চেতনায়, কি মূল্যবোধের নিরীখে, কি ঐতিহাসিক নিরীখে - সর্বক্ষেত্রেই এই জাতির মধ্যে এক ঐকান্তিক মিল লক্ষ্যণীয়। তবুও, ভাগ্যের কি অমোঘ পরিণাম, আজ আমরা এক নই, দ্বিধাবিভক্ত। হিংসা-হানাহানি-মারামারিতে বাংলা 'মা' আজ দ্বিখণ্ডিত। চিরশত্রু ইংরেজ যখন আমাদের মধ্যে এ দ্বৈততার বীজ বপন করেছিল তখন বিংশ শতকের প্রথম দশক। মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার (১৯০৬) মধ্যে দিয়ে এই দ্বিজাতিতত্ত্বের বীজ আরো সুপুষ্ট হতে পেরেছিল। যদিও বাংলার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বুঝেছিলেন, ইংরেজের শাসনকার্য চালানোর এ আরেক চাল। কিন্তু তা আর মানুষ বুঝল কই? তারা তো গা ভাসাল মনকাড়া সস্তার কথায়। ধর্মীয় কথায় উত্তেজিত হয়ে বাংলাভাগ হল বটে। কিন্তু তাতে কি কিছু সুরাহা হল? মনে তো হয় না।
      আজ ফিরে যাব স্বাধীনতার কিছুটা আগে। কি জানেন, বঙ্গভঙ্গ কিন্তু আদপেই হত না যদি না মুসলমানপন্থী মুসলিম লীগ আর হিন্দুপন্থী হিন্দু মহাসভা এ ব্যাপারে নাক না গলাতো। আসলে তখন যা পরিস্থিতি তাতে কি অর্থনৈতিক, কি রাজনৈতিক, কি সাংস্কৃতিক - সব দিক থেকেই তো পশ্চিমবঙ্গ পুর্ববঙ্গের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে। ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতের সবথেকে বড় শহরও এই কলকাতাই। কি পাটকল, কি কয়লাখনি, অন্যান্য কলকারখানা - সবই যে ভারত ভূখণ্ডে পড়ে রয়েছে। তাই বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গের বাঙালীর এগোনো তো দূরের কথা, আরো বেশি পিছিয়ে পড়বে। তাই না? মুসলিম লীগ গঠনই বলো, কি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি - সবকিছুর মূলেই কিন্তু ছিল একটাই কথা - মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে, তাই তাদের সুবিধার্থে আলাদা রাষ্ট্রের দরকার। তাই এই বিভাগে কি কোন লাভ হবে? এই ব্যাপারটা খুব ভাল করে বুঝতে পেরেছিলেন - মুসলিম লীগেরই আরেক নেতা - হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়াদী। তিনি উপরিউক্ত যুক্তি দেখিয়ে বললেন - বাংলা ভাগ করার দরকার নেই। বরং সমগ্র বাংলাকে নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা রাষ্ট্র হোক। বর্ধমানের নেতা আব্দুল হাসিম একে সমর্থন করলেন। সমর্থন করলেন কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বোসও। কিন্তু ধর্মের ধ্বজাধারীরা কি আর এদের সহজে ছাড়ে। বিরোধীতায় সোচ্চার হয়ে উঠল নুরুল আলিম, মহম্মদ আক্রাম খান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। কিন্তু এই পরিকল্পনার পেছনে প্রকৃত যুক্তি খুঁজে পেলেন যিনি তাঁর নাম - মহম্মদ আলি জিন্না। তিনি বাংলারসমন্বিতকরণের পক্ষে মত দিলেন। সোহ্‌ওয়াদী শুরু করলেন তাঁর পরিকল্পনামাফিক কাজ। 


    আবার এল বাধা। এবার বাধা দিল, জওহরলাল-প্যাটেলের মত কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতারা। তাদের বক্তব্য ছিল, বাংলাকে ভাগ না করার 'চক্রান্ত' করছে নাকি মুসলিম লীগ। কারণ বাংলাভাগ না হলে মুসলিমরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর হিন্দুরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হয়ে তাদের অধীনস্থ হয়ে যাবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা চূড়ান্ত বিরোধীতার ঝড় তুলল। এরপর সোহ্‌ওয়াদীর মন্ত্রণালয়ে হিন্দুদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসা আর ১৯৪৬ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা - এই দুটি ঘটনাতে মুসলিম লীগের ওপর থেকে বাংলার হিন্দুদের বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে অবলুপ্ত হল। সোহ্‌ওয়াদী বললেন, অবিভক্ত বাংলায় মুসলমান ও অমুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা নির্বাচনমণ্ডল তৈরী করা হবে। কিন্তু এই মত মানতে রাজী হলেন না শরৎচন্দ্র বোস। তাঁর মত, বাংলা যদি অবিভক্তই থাকে তবে নির্বাচন আলাদা হবে কেন? দুজনের মধ্যে বিতর্ক তুমুলে উঠল। বাংলা অবিভক্ত হওয়ার স্বপ্ন বিলীন হল এখানেই। 


    সেই দিনগুলো পেরিয়ে এসেছি নয় নয় করে তাও ৬৮ বছর হয়ে গেল। তবু প্রশ্ন কিছু থেকেই যায়। সত্যি কি লাভ হল বাঙালীর? আদৌ কি কিছু লাভ হল এ জাতির। যারা ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের পৃথক করে নিল তাদের তো আবারও ছেড়ে আসতে হল একদা বন্ধুদেশ পাকিস্তানের সঙ্গ। শুধু ভাষার জন্য। যে ভাষায় ওদের আর পশ্চিমবঙ্গের পার্থক্য নেই কিছু। বাংলাদেশ এটা প্রমাণ করল - একটা জাতির প্রধান পরিচয় তার ধর্মে নয়। বরং অনেক বেশি তার ভাষায়। আর এখানেই ধর্মের কৃত্রিম চেহারাটা নগ্ন হয়ে এল।  ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের যুক্তিকে খণ্ডন করে দিল ইতিহাস নিজেই। ধর্মীয় বিভেদের উস্কানিদাতারা (সে ইংরেজ থেকে আধুনিক শাসক পর্যন্ত) শেষমেশ পরাজিত হলই। সময়ই বলে দিল, ধর্ম নয়, আসল বিজিত কিন্তু আমাদের সংস্কৃতির মূলস্রোত। যা আজও বহমান, বাঙালীর অন্তরে অন্তরে। আর আমাদের দূর্ভাগ্য এখানেই, সবকিছু বুঝে শুনেও কিছু স্বার্থকামী মানুষের লোভের ফল আজও আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে দ্বিখণ্ডিত হয়ে। দ্বিখণ্ডনের এই ক্ষোভ আরো গা-চাড়া দিয়ে ওঠে যখন দেখি আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা দিচ্ছেন হিন্দিতে, সরকারী চাকরির পরীক্ষা হচ্ছে হিন্দিতে আর আমরা পড়ছি পিছিয়ে, আমাদের যাবতীয় সব সরকারি কাজকর্ম চলছে হিন্দিতে, কলকাতায় তো বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। সরকারি চাকরি করতে গেলে হিন্দি শেখা হচ্ছে বাধ্যতামূলক। বুঝতে পারছি, হিন্দি বলয় এখানে ক্রমশ ঘিরে ফেলছে বাংলাকে। বাংলায় কাজ করলে তার কোন স্বীকৃতি মেলে না। এই যখন ভারতের অবস্থা, তখন দেখছি বাংলাদেশের সরকারী ওয়েবসাইট বাংলায় লেখা, সেদেশের মন্ত্রীরাও কথা বলছেন বাংলায়, আইন-আদালতেও কাজ চলছে বাংলাতে। নিজের মাতৃভাষায় কাজ করবার অধিকারই আমরা খোয়াতে বসেছি। অথচ দেশটা যদি বাংলার হত - তবে তো সবটাই পারতাম। 


    আবার যখন দেখি বাংলাদেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশ, ধর্মের উস্কানি, ভারতবিরোধী মনোভাব - তখন মনে হয় এরা কারা? চিনতে পারি না এদের সহজে। মনে হয় না এরাই অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সাথে থাকতে পারবে। ঘৃণা এবং তার চেয়েও বেশি হিন্দুবিদ্বেষ (অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানবিদ্বেষও) আমাদের আলাদা করে রাখছে এখনও। তবু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ আছে। বিশ্বাস রাখি তাদের ওপরে। বাংলাদেশে (ও সাথে পশ্চিমবঙ্গেও) আজ উদার শিক্ষা প্রসারের দরকার। যে শিক্ষা তাদের বুঝিয়ে দেবে কে আপন আর কে পর। আশা রাখি এমন এক দিনের যেদিন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি বুঝতে পারবে বাংলা ভাষার স্বরূপ, চিনতে পারবে নিজেকে। সেইদিনই সম্পূর্ণরূপে সফল হবে বাংলার মুক্তিযুদ্ধ।
   

শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

ভেবে দেখো তো


হাম তেরে বিনসুরে মোবাইলটা চমকাচ্ছে। ঘুমটা ভাঙব ভাঙব করছিল। একটু জলদিই ভেঙে গেল। চোখ মেলতে ইচ্ছে করছে না। কাত হয়ে শুয়ে রিসিভ করলাম কে ফোনটা করেছে তা না জেনেই।
হ্যালো...হ্যাঁ, কি ব্যাপার?......হুঁ...অ্যাঁ?...সে কি? কিভাবে?...কোথায় বললেন? ....এই সেরেছে রে....হ্যাঁ, ঠিক আছে ঠিক আছে।

কুঁ কুঁ করে তিনবার আওয়াজ করে ফোনটা কেটে গেল। রেশটা কাটল না। থম মেরে গেলাম আমি। মাথায় কিছুই ঢুকছে না। খালি বোঁ বোঁ করছে। কেবল কয়েকটা শব্দ সামনে চলাফেরা করছেঅনঘ, খুন, মারপিটমাথায় হাত দিয়ে বসে রইলাম বেশ খানিকক্ষণ
চোখ মেলে তাকাতে দেখি জানালা দিয়ে এসে পড়ছে সকালের মিঠে রোদ। আমায় ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির আজ শেষ দিন বসন্তকালের একটা মৃদু গন্ধ থাকে। হাল্কা হাওয়ায় সেই গন্ধটাই ভেসে আসছে এখন। দোয়েল না কোয়েল কার শিস! ধ্যাৎ!!! একদম ভাল লাগছে না। সকালটা এক্কেবারে কেঁচে গেল।
 
গা ঝাড়া দিয়ে বিছানাটা ছেড়ে উঠলাম। চশমা চোখে গলিয়ে মশারিটা খুলতে খুলতে একটাই কথা খালি মাথায় ঘুরছিলঅনঘ খুন করার চেষ্টা করেছে। কথাটা অবিশ্যি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতই বটে। বরং এর থেকে যদি কেউ আমায় বলত ঘোড়ায় চারটে ডিম পেড়েছে তাহলেও নয় বোঝা যেত। কিন্তু অনঘ যে এমন কোন কাজ করতে পারে যা গর্হিতএমনটা মেনে নেওয়া শুধু কষ্টকরই নয়, এর জন্য অনেকখানি উর্বর মস্তিষ্কের প্রয়োজন। তবু ফেলাও যাচ্ছে না পুরোপুরি। কারণ ব্যাপারটা আমায় জানিয়েছে সাধনবাবুযিনি শুধু আমার পরিচিত তাই নয়, আমার পরম শ্রদ্ধেয় মানুষ উনি। আমার বাবার বন্ধুদের অন্যতম তিনি, আর আমার অঙ্কের স্যারও বটে।
 
প্রজীতও আমার ছাত্র। সেও খারাপ নয়, তবে বেশ চঞ্চল এই যা। সে এখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে! হায় রে! কি দিনকাল পড়ল। আমাকে এখনই বেরোতে হবে হাসপাতালে। বিদিশাকে সব ডিটেলস বললাম। তখন ছেলের স্কুলের টিফিন বানাচ্ছে। সব শুনে ওর তো মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। যাই হোক ওকে টেনশন করতে বারণ করে আমি রেডি হতে বাথরুমে ঢুকলাম।
 
বিদিশা বারংবার বলা সত্ত্বেও মুখে কিছু দিলাম না, বা বলা ভাল পরিস্থিতি দেখেশুনে পেটে কিছু দেওয়ার আর সাধ হল না। নিজের ভেতরে তখন যে কি চলছে তা তো আর বলে বোঝানো যাবে না। 
 
(২)

ট্রেনে বসে জানালার ধারেই সিট পেয়ে গেলাম। এই লাইনে বড় একটা লোক চলাচল হয় না, তার ওপর আজ আবার ছুটির দিন। ইলেকট্রিক তারের ওপর বসে কি একটা নাম না জানা পাখি। নীল ওর গায়ের রঙ। পেটের কাছটা হলুদ। কি মিষ্টি দেখতে! তবু মনটাকে শান্ত করতে পারছি না কিছুতেই সামনের লোকটার হাতে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যাগ। তার মানে ডাক্তার, নার্সিংহোম, চিকিৎসা। আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। গিয়ে কি দেখব কে জানে? যদিও প্রজীতের বাবার সাথে এর মধ্যে দুবার মোবাইলে কথা হয়ে গেছে। সে বলেছে তার ছেলের অবস্থা এখন কিছুটা হলেও সুস্থ। তবু বলা যায় না, মাথার চোট তো...

মনটা পিছিয়ে গেল দুটো বছর। তখন ওরা সবাই সবে মাধ্যমিক দিয়েছে। নতুন ইলেভেনের ব্যাচ কবে বসবে সেই ডেট ঠিক করতে আমি ওদের একদিন ডেকেছিলাম। ঘটনাটা ঘটেছিল ঠিক তার আগের দিন। ভুলব না সেই সন্ধ্যের কথা। কালবৈশাখীর প্রচণ্ড ঝড় আর তার সাথে বৃষ্টি। দমকা হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছে জানালা-দরজা। আর তার সাথে মাঝেমাঝেই বাজের হুঙ্কার। ঠিক এই সময়ই দরজায় ঠকঠক করে জোরে শব্দ। প্রথমে তো আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম। এত ঝড়জলের মধ্যে কেই বা আসতে পারে? দ্বিতীয়বার আরো জোরে ধাক্কা। আমিও ততোধিক জোরে আওয়াজ দিলাম কে? বিদিশা আমায় উঠতে বারণ করল।তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? দরজা খুলছ যে? চোরচোট্টা কে তার নেই ঠিক আমি কি করব কি করব ভাবছি এমন সময় কারেন্টটাও গেল চলে। অদ্ভুত ব্যাপার! প্রাকৃতিক দূর্যোগ যতই থাকুক, আমাদের এখানে সাধারণত তো কারেন্ট যায় না। এক যদি না বড়সড়ো কোন ফল্ট হয়ে থাকে। প্রয়োজন না থাকায় বাড়িতে ইমার্জেন্সী পারপাসে একটা ছোট ল্যাম্প ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ওর আলোতে সারা ঘরটা কোনরকমে ঠাহর হয়। বাইরে শুনলাম পরিচিত একটা গলা শান্তনু আছিস?’ সাধনবাবু। এই অবেলায়? ল্যাম্পটা নিয়ে এগিয়ে গেলাম দরজা খুলে দিতে।
দরজা খুলতে সাধনবাবুকে দেখি একেবারে কাকস্নান করে গেছে।কি ব্যাপার? আপনি হঠাৎ এত বৃষ্টির মধ্যে?আমার মুখ থেকে কথা সরছিল না। বাহুল্য ছাতাটাকে দুবার ঝেড়ে উনি বারান্দায় উঠে এলেন।আর বলিস না। এখানে একটা বাড়িতে এসেছিলাম একটা কাজে। ফেরার পথে যত দুজ্ঞতি। তাই ভাবলাম তোর বাড়ি হয়েই যাই। কিছুটা আশ্রয় নিতেও, আর একটা কাজও আছে...’ আমি ওনার কথা শেষ করার আগেই ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললাম, ‘আরে আরে হবে সেসব। আপনি আগে ঘরে তো চলুন এই বলে ওনাকে ঘরে ঢোকাতে যাচ্ছি, চোখটা আটকে গেল পিছনে টা কে? মিশমিশে কালো গায়ের রঙ, মাথার সামনের দিকটা অস্বাভাবিক রকমের উঁচু আর চওড়া আর তার পরে মাথায় চুলও সামান্য। বিদ্যুতের চমকে কি ভয়াবহ লাগছে!
ওঃ হো। তোকে বলাই হয়নি। ওর জন্যেই আমার মূলতঃ আসা। আমাদের পাড়াতেই থাকে। ইলেভেনে উঠবে এবার। অঙ্কের টিচার খুঁজছিল বুঝলি। তো আমি তোর কথাই বললাম ওকে। খুব ভাল ছেলে। এই অণু পেছনে দাঁড়িয়ে কেন রে? এদিকে আয়’ এই বলে হেসে সাধনবাবু ছেলেটাকে আমার সামনে এনে দাঁড় করালেন। আমি কিছুক্ষণের চমকে-ওঠা জড়তাটা যত দ্রুতসম্ভব কাটিয়ে জিগ্যেস করলাম, ‘তোমার নাম কি?’
ঢিপ করে আমায় একটা প্রণাম করল, ‘অনঘ গোলদার আমি ওর মাথায় হাত ঠেকিয়ে বললাম, ‘এসো, তোমরা ঘরে এসো আগে

প্রথম স্টেশনটা পেরিয়ে এলাম। মিঠে রোদ্দুরটা গায়ে লাগলে কোথায় আরাম লাগবে, তা নয়, এখন গরম করছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ। আমার এক ছাত্র করেছে।
-হ্যাঁ বল তমোঘ্ন। ওপার থেকে গলা ভেসে এল, ‘স্যার, বলছি প্রজীতর তো এখনও জ্ঞান ফেরেনি। আর এদিকে অনঘর ঠাকুমা এসেছে এই মাত্র
- তুই তার মানে ওখানে আছিস?
- হ্যাঁ, আজ স্যার সারাদিনটাই এখানে থাকব। আর আপনি আসছেন তো।
- হ্যাঁ রে। আমি তো এই ট্রেনে আছি।
- আচ্ছা ঠিক আছে। তারপর একটু থেমে আবার বলে, ‘স্যার, বলছি কি, অনঘর ঠাকুমা আপনার সাথে কথা বলতে চাইছিল।
- আমার সাথে? আমার সাথে আবার কি কথা বলবে? বিরক্তির সুরে বললাম আমি। মনে মনে বিরক্ত হলেও ওকে বললাম, ‘ঠিক আছে। দে ফোনটা
ঠিক এইসময়ই ফোনটা কেটে গেল। 
()
আসলে কি জানিস শান্তু, ছেলেটার আপন বলতে তো তেমন কেউই নেই। এক ঠাকুমাই সম্বল। তাই ঠাকুমা ওকে একেবারে বুকের ধনের মত আগলে রেখেছে। জন্মানোর কয়েকদিনের মধ্যেই মা মারা যায়। আর বাবাও তার কয়েকবছর বাদেই, একটা ট্রাক অ্যাক্সিডেন্টে...’ বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল সাধনবাবু। অনঘ পাশের চেয়ারে বসে মাথা গুঁজে শুনছিল সব। আগেই বলেছি, সেদিন আমার ওকে দেখেই ভারী অদ্ভুত লেগেছিল। যদিও সেইদিনই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করাটাকে যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করিনি। পরে একদিন সাধনবাবুই আমায় কথা কথায় বলছিল, ‘ওর মধ্যে একটা সহনশক্তি আছে বুঝলি শান্তু। জানি না সেটা কেমনভাবে কাজে লাগাবে?
সেদিন বুঝতে পারিনি ওনার ওয়ার্নিং। তাই ছেলেটার দিকেও আর তেমন স্পেশাল কোন নজর দিইনি। ভেবেছিলাম আর পাঁচটা ছেলের মধ্যেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু সে ভুল যে কতখানি মারাত্মক সেকথা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আর তখনও আমার কানে যে কিছুই আসত না তাও নয়। এই যেমন, ইলেভেনের ব্যাচ শুরু হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই ঘটল একটা ক্যাচাল। পাশের ঘরে বসে পরীক্ষার খাতা মেলাচ্ছি। ওঘরে ইলেভেনের ছেলেমেয়েরা একে একে আসতে শুরু করেছে। এমন সময় একটা হৈ-হট্টগোল কানে গেল। স্পষ্ট শুনতে পেলাম একটা ছেলে অনঘকে বলছে, ‘আরে তুই আবার কথা বলিস কি? দেখতে তো একটা শিম্পাঞ্জী। আমাদের সাথে তর্ক না করে এক কাজ কর। মাথা যে কটা চুল আছে সেগুলোও কেটে ফেলে চিড়িয়াখানার খাঁচায় ঢুকে পড়। অনেক লোক পাবি এই বলে ওরা সব হো হো করে হাসতে শুরু করল সেদিন আমি বাধ্য হয়েছিলাম ধমক দিয়ে ওদের থামাতে।
এরপরে একদিন অনঘ আমায় বলেছিল। কিংবা বলা ভাল, আমার কাছে অভিযোগ করেছিল। পড়ার শেষে সবাই চলে গেলে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, ‘স্যার আমায় অন্য কোন ব্যাচে নিয়ে যাবেন?’ আমি একটা খাতা চেক করছিলাম। অবস্থাতেই বললাম, ‘কেন? তোকে এরা খুব জ্বালাচ্ছে তাই?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর জবাব দিল, ‘হুঁ
আমি বললাম, ‘কিন্তু তা বললে হবে কি করে? দেখ, আমি অন্য ব্যাচে তোকে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু সেখানেও তো তোকে একই সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তখন কি করবি? তার চেয়ে এখানেই থাক। ওরা কিছু বললে ওদের কথার প্রতিবাদ কর। চুপ করে থাকলে ওরা তো পেয়ে বসবেই সেদিন আরো অনেকক্ষণ জ্ঞান দিয়েছিলাম। আমার কথাগুলোও মন দিয়েই হজম করেছিল। কিন্তু স্বভাব যার যেরকম। জোর গলায় বলাটা আসলে ওর ধাতেই নেই। কথা বললেও জোরে বলতে পারে না। ফলে অবস্থাটা যেমনটি ছিল তেমনটিই রয়ে গেল।
পরের স্টেশনটা চলে এল ইতিমধ্যে। আর একটা স্টেশন, আর তারপরই... ওঃ, ভাবলেও বেশ ভয় ভয় লাগছে। ইতিমধ্যে দেখি আবার ফোন। এবার সাধনবাবুর। গলাটা দুবার কেশে পরিষ্কার করেনিলাম। ওপার থেকে গম্ভীর গলার আওয়াজ, ‘শান্তু। শুনছি অনঘ নাকি তোর সাথে দেখা করতে চায়
-      কেন? তার আবার কি হল? সে তো দিব্যি আছে। বলুন আমার এখন সময় নেই।
-      না রে। ব্যাপারটা তা নয়। শোন, তুই প্রজীতকে এখানে জাস্ট দেখেই অনঘর কাছে চলে যাস। ওখানে বেশ কিছু সমস্যা হয়েছে।
-      ওফ আর পারছি না, পারছি না। প্লিজ এবার রক্ষে কর
-      ঠিক আছে ঠিক আছে তুই অত চাপ নিস না। দেখ সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই আগে এখানে নার্সিংহোমে আয়। তারপরে আমিই সব তোকে বলছি কি করতে হবে না হবে সাধনবাবুর গলায় আশ্বাস পেয়েও আমার মন মানল না।
শেষদিনের ঘটনাটাই সব গুবলেট করে দিল। ওদের বন্ধুদের মুখেই শুনেছিলাম আসল কাহিনী। সেটাকে গল্প করেই লিখি। আসলে হয়েছে কি, সেদিন আমার কি একটা কারণে তাড়া থাকায় অন্যদিনের তুলনায় একটু আগেই ওদের ছুটি দিয়ে দিয়েছিলাম। তাই পড়া শেষ হলেও রাত বেশি হয়নি সেদিন। আর ওদের বাড়ি যাওয়ার তাড়াও বিশেষ একটা ছিল না।
শুরু হল বিলা মারা। আর ওদের বিলা মারা মানেই তো চাটা আর সেখানে টার্গেট একজনই অনঘ। আর এদিকে অনঘর সেদিন শরীরটাও ভাল ছিল না। প্রথম থেকেই তাই সাবমিশন মোডে। কিন্তু তাতে কার যায় আসে? একদিক থেকে প্রজীত বলছে, ‘শালা, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে করবিটা কি? পানু দেখবি নাকি?’ অনঘ কিছু বলে ওঠবার আগেই ওদিক থেকে শুরু করল বিতান, ‘আরে পানু তো দেখা এখন সোজা। দেখ দেখ ওর ব্যাগে সিডি ফিডিও হয়ত পেয়ে যাবি এই বলে ওরা সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ব্যাগের ওপর। টেনে হিঁচড়ে ওর ব্যাগটা নিয়ে কাড়াকাড়ি চলতে থাকে। আর শরীর খারাপ থাকলে মানুষের মেজাজটাও খাপ্পা থাকে। আর এর মধ্যেই একটা মস্ত বড় অন্যায় করে বসল প্রজীত। ঝোঁকের মাথায় বলে বসল, ‘বাবা-মাকে খাওয়ায় মালটার সুবিধেই হয়েছে। দিনরাত এইসব ভিডিও দেখে ব্যস, এই কথাটাই অনঘ আর সহ্য করতে পারল না। সে চীৎকার করে বলল, ‘কি বললি? কি বললি তুই? শালা তোর এত সাহস? মা বাবা তুলে কথা বলিস?’ বলতে বলতে সে রাগের বশে গায়ের সবশক্তি দিয়ে এক ধাক্কা মারল প্রজীতকে। টাল সামলাতে না পেরে পা হড়কে পড়ে গেল প্রজীত। মাথাটা ঠুকে গেল পাশের বাড়ির দেওয়ালে। তারপর থেকে আর ওর জ্ঞান ফেরেনি।
ট্রেন থামল। আমায় নেমে যেতে হবে। বুকের মধ্যে একটা ঢিপঢিপানি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। এতক্ষণ পর্যন্তও খেয়াল করিনি। ডাক্তার বাহাত্তর ঘন্টা সময় দিয়েছে। এর মধ্যে প্রজীতর জ্ঞান ফিরলে ভাল আর তা না হলে ... কি যে হবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আর বাহাত্তর ঘন্টা হতেও তো আর মাত্র ঘন্টা তিনেক বাকি আছে।
()
নার্সিংহোমে পৌছে প্রজীতর বাবার সাথে কিছুক্ষণ কথা হল। কথা শুনে যা বুঝলাম ডাক্তাররা মোটেই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। তবে একটা ব্যাপার আমার আমার খুব অদ্ভুত লাগল পরিস্থিতি যা তাতে ওর বাবার উদ্বেগ কিন্তু যথেষ্ট নয়। ওর কথাবার্তার মধ্যে একটা গাম্ভীর্য আছে, সেটা হয়ত তার চাপা কষ্টটাকেই বোঝাচ্ছে। কিন্তু তবুও নিজের ছেলের এহেন অবস্থায় শুরু এটুকুই যেন যথেষ্ট নয় বলেই আমার মনে হল।
এরপরেই আমার চোখ গেল ওর মায়ের দিকে। কাঠের একটা সরু বেঞ্চে কপালে হাত ঠেকিয়ে বসে আছে। সারাদিন নাকি একটাও কথা বলেনি, কিচ্ছু খায়নি। কোন কথা জিগ্যেস করলে কোন উত্তরও দেয়নি। শুধু একভাবে বসে থেকেছে। একবারই নাকি শুধু বলেছিল, ‘ছেলে আমাকে না ডাকলে আমি এখান ছেড়ে যাব না। আমার সোনাটা কিচ্ছু খাচ্ছে না, কোন কথা বলছে না, আমি কি করে ভাল থাকব?’
বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কাটল। প্রজীতর বাবা-মা ছাড়া এখন আর কেউ নেই। তমোঘ্ন গেছে একটা দরকারে। আর সাধনবাবু বাড়িতে টিফিন করতে গেল এইমাত্র। কিন্তু আমার যে এদিকে দম আটকে আসছে। নিজের ভেতরকার টেনশনটা টের পাচ্ছি। চারিদিকের পরিস্থিতিটাও ততোধিক গুমোট। দু-একটা নার্সের টুকরোটাকরা কথা, আর চলাফেরা আমি যে বেঁচে আছি এর প্রমাণ।
আপনিই কি অনঘর মাস্টারমশাই?’ প্রশ্নটা শুনে চমকে উঠলাম। পেছনে ঘুরে দেখি ষাটোর্দ্ধ এক ভদ্রমহিলা। মাথায় চুল সব সাদা, মুখের বলিরেখা স্পষ্ট হওয়ার পথে। অনেকক্ষণ ধরেই ওনাকে দেখেছিলাম। দরজার ধারে একটা কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। এবারে আন্দাজ করেই বললাম, ‘হ্যাঁ। আর আপনি কি অনঘর ঠাকুমা?’ আমার প্রশ্নে ভদ্রমহিলা ইতিবাচক ভঙ্গীতে মাথা নাড়ালেন। তারপর আমি ওঁকে ইশারায় বসতে বলে শুরু করলাম, ‘বলুন, শুনছিলাম অনঘ নাকি আমার সাথে দেখা করতে চায়? তা কি ব্যাপার?’
ঠাকুম চিন্তাক্লিষ্ট গলায় বললেন, ‘আর বলবেন না। সারাটা দিন ছেলেটা পাগলের মত করছে। সারারাত ঘুমোয়নি। কেবল ছটফট করে গেছে। আর আবোল-তাবোল সব বকছে লক্ষ্য করলাম কথা বলতে বলতে ওনার গলাটা কেমন কান্নাভেজা হয়ে আসছে। আমি পরিস্থিতিটা সামাল দিতে তড়িঘড়ি বলে উঠলাম, ‘ঠিক আছে। ঠিক আছে। আপনি অত চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আসলে একটা শক পেয়েছে তো
ঠাকুম তবু নাছোড়বান্দা, ‘না বাবা না। আমি তোমায় বলছি , তুমি না গেলে কিছুতেই শান্ত হবে না। তোমাকে দেখতে চাইছে খুব। তুমি একবারটি অন্তত...’ আমি দেখলাম যা পরিস্থিতি তাতে না যাওয়াটাও সমীচিন হবে না। আমার মায়ের বয়সী এক মহিলা এমনভাবে অনুনয় করছে। আর কথা বলতে বলতে ওনার আপনিথেকেতুমিতে নেমে আসাটাও আমার নজর এড়াল না। যাই ঘুরে আসি। আমার বাড়ি থেকে এমন কিছু বিশেষ দূরও তো নয় ওদের বাড়ি।
এমন সময় কে যেন বলে উঠল, ‘এই তো এসে গেছিস দেখছি। তাহলে? কথা হয়েছে?’ মুখ তুলে দেখি সাধনবাবু। আমি কিছু বলবার আগেই উনিই আবার বললেন, ‘কি কাণ্ড বল দিকি? অ্যাঁ? এখানে চলছে এক সমস্যা তো ওখানে আর এক ওনার কথা শুনতে শুনতে আমার হঠাৎ খেয়াল হল, আরে? এমনটাও তো হতে পারে যে অনঘ এগুলো মিথ্যে ভড়কি দিচ্ছে। বিপদে পড়েছে বলে আত্মসমর্পণের পথ আগে থেকেই খোলা রাখছে। যাতে প্রজীতর পাশাপাশি ওকে নিয়েও আমাদের একটা সহানুভূতি তৈরি হয়?
কি ভাবছিস অত?’ সাধনবাবুর প্রশ্ন। আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। কিছুটা চমকে বললাম, ‘না। কিছু না। আমাকে এখনই বেরোতে হবে
()
বেরিয়ে তো এলাম। কিন্তু এদিকে যে ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে পেটে। এবার যে একটু পেটপুজো না করলেই নয়। অথচ রাস্তার খাবার আমার পেটে সইবে না। পেটরোগা কিনা। অগত্যা ভরপেট খেতে হলে বাড়ি যাওয়াই শ্রেয়। তবে তাই হোক, পরে অনঘর সাথে কথা বলা যাবে। এখন আগে তো বাড়ি যাই। রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে এইসব ভাবছি। ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ। পকেট থেকে বের দেখি কলিং বিদিশা। রিসিভ করতেই
তুমি কোথায় আছো?
এই তো এখনই ট্রেনে উঠব। বাড়ি যাচ্ছি। ভালই হয়েছে ফোন করলে - আমার জন্যে কিছু খাবার বানিয়ে রেখো তো। খুব খিদে পাচ্ছে।
সে না হয় রাখব। কিন্তু এদিকে তো আরেক কাণ্ড হয়েছে। অনঘ এসেছে যে। বলছে তোমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি যত বলছি, বাড়ি নেই, পরে এসো। ততই বলে, এখানেই অপেক্ষা করব। ঢ্যাঁটার মত এখানেই বসে আছে।
আমি মুখ থেকে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে বললাম, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি ওকে বাইরের ঘরে বসতে বল। আমি গিয়ে না হয় কথা বলব
ইতিমধ্যে ট্রেন ঢুকে গেছে। ফলে লাইনটা কাটতেই হল।
বাড়িতে যখন পৌছলাম ঘড়ি জবাব দিচ্ছে বারোটা। ঘরেতে ঢুকেই প্রথমেই চোখে পড়ল হাতলভাঙা চেয়ারটাতে মাথা নীচু করে বসে। অনঘ। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। চোখমুখ দেখে স্পষ্ট সারারাত ঘুম হয়নি। মনে হয় না পেটেও কিছু দানাপানি পড়েছে। শুধু এই একটা দিনের চিন্তাই ওর মধ্যে কত গভীর দাগ ফেলে গেছে। কালো ছাপ পড়ে গেছে চোখের তলায়। সারাটা মুখে লেগে আছে একটা রক্তিম আভা।
প্রজীত কেমন আছে স্যার?’ উদ্বেগে টানটান প্রশ্ন।
আমি বললাম, ‘জ্ঞান এখনও ফেরেনি। আর ফিরলে ঠিকই জেনে যাব। দেখাই যাক কি হয়, ভবিষ্যত তো আর কারুর হাতে নেই
একটু ভেবে নেয়। তারপর আবার। একটু ধীরে, কেটে কেটে উচ্চারণ করে, ‘স্যার প্রজীতর যদি কিছু হয়ে যায়। আমি কি?...’ বাকি কথাগুলো মুখে আনার সাহসটুকুও বোধহয় পেল না ও
-      তা আমি এখনই কি করে বলি? তবে এটুকু বলতে পারি। তবে কাজটা কিন্তু তুই মোটেই ভাল করিস নি। ওর কিছু হলে...’ একটা ফোন। আটকে গেল আমার কথা। কারণ ফোনটা সাধনবাবুর। জানি না, কি বলবেন তিনি?
মিনিট দুয়েক বাদে মোবাইলটা পকেটে রাখতে রাখতে কিছু বলতে যাব। তড়াক করে লাফিয়ে উঠল অনঘ। আমার কাঁধ দুটো ধরে ঝাঁকাতে থাকে, ‘স্যার কার ফোন?  স্যার কার ফোন?’
ওর এই হঠাৎ পাগলের মত আচরণে আমি মোটেই বিচলিত না হয়ে জবাব দিলাম, ‘সাধনবাবুর আমাকে ছেড়ে দিল। একটু সন্দেহের ভঙ্গীতে বলল, ‘কি বলল স্যার?’
-      ‘তুই যা শুনতে চাইছিস’ এবার হেঁয়ালি না করে খোলাখুলি বলি? ‘প্রজীতর জ্ঞান ফিরে এসেছে রে। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। ডাক্তারেরা আশ্বাস দিয়েছে আর ভয় নেই’
অনঘ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘ওঃ। বাঁচালেন স্যার, বাঁচালেন
আমি মৃদু হেসে বললাম, ‘আমি বাঁচানোর কে? ছেলেটা যে সুস্থ হচ্ছে এর থেকে ভাল খবর আর কিছু হতে পারে না। সত্যি খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল রে। যাই হোক, সুস্থ হলে প্রজীতকে তুই একবার দেখে আসিস। আর ক্ষমা চেয়েও আসিস কিন্তু
হঠাৎ বজ্রনির্ঘোষ হল যেন, ‘না। কক্ষণো না দেখি অনঘ রাগে একেবারে কাঁপছে। আমি তো একেবারে থ। কি হল ছেলের। আবার প্রশ্ন করলাম, ‘তার মানে? তুই যাবি না?’
ঠিক আগের গলাতেই বলতে লাগল, ‘বললাম তো, না। যা হয়েছে তার জন্য আমি দায়ী নাকি যে আমাকে ক্ষমা চাইতে হবে? বরং ওর জন্য আমি পুলিশে যেতে পারতাম। আমার সারাটা জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারত। কেবল ওর জন্য। আর ওর কাছে আমি ক্ষমা চাইব? ছিঃ! তার চেয়ে বরং ওর গায়ে থুতু ছিটিয়ে আসব
আমিও ধমকে প্রত্যুত্তর দিলাম, ‘কিসব যা তা বলছিস তুই?’
-      ঠিকই বলছি স্যার। ওর জন্য আমার এতটুকু ভাবনা নেই। আমি এখন নিশ্চিন্ত। চলি। এই বলে হনহন করে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।
আমি কিছুক্ষণ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। একটাই প্রশ্ন মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল, এরকম করল কেন?