শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৫

একটি সাম্প্রতিক ইস্যু



ভারতীয় সাহিত্যিকদের পুরস্কার ত্যাগের একটা রেওয়াজ দেখা যাচ্ছে। এটা হয়ত ভাল একটা দিক। কারণ আজ ভারতের পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগজনক বলে মনে হচ্ছে। সারাটা দেশ জুড়ে শাসকদল যেরকম ন্যক্কারজনকভাবে ধর্মীয় উন্মাদনা সঞ্চারে পরোক্ষে সাহায্য করে যাচ্ছে তাতে দেশে একটা বড়সড় বিস্ফোরণ না হলে বোধহয় তারা থামবে না। ভাবা যায়! ভারতের মত দেশের একটা জাতীয় রাজনৈতিক দল, যারা কিনা শাসনক্ষমতার শীর্ষে, তারা একটা নির্দিষ্ট ধর্মের ধ্বজাধারীদেরই তোল্লা দিয়ে যাচ্ছে। আর হবে নাই বা কেন? ভোট যে বড় বালাই। দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। তাই হিন্দুতোষণের পালে আরো বেশি করে হাওয়া লাগানো চাই। তাতে হয়ত ভোট বাড়বে শাসকের। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িকতার বীজ যে আগামীদিনে আমাদের মত সাধারণ শাসিতদের অক্ষত রাখতে পারবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? দেশে আগুন জ্বলে উঠলে, মারা যে পড়ব আমরাই।
অন্যদিকে, এই ‘হিন্দু জাগরণ’এর দিনে বলির পাঁঠা হচ্ছেন, যাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন, সর্বপ্রথম তাঁরাই। সে তার নাম কালবার্গই হোক, কি গোবিন্দ পানসারে। প্রথম ঘা’টাই পড়ল এমন এক জায়গায় যেটা মানুষের স্বাধীনতার একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ – মতপ্রকাশে স্বাধীনতা। যদি শাসকদলই একটা নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের বশবর্তী হয়, তাহলে কি করে এ দেশে চিন্তার স্বাধীনতা থাকতে পারে? আর যদি তা নাই থাকে, তবে ভারতকে আর আমরা গণতন্ত্রই বা বলি কি করে? এ যে সংবিধান বিরোধী কাজ। শাসকদল তো ভারতেরই সরকারকে গঠন করেছে। সরকার গঠন করার আগে তো তারা ঘটা করে শপথও পাঠ করেছে। কিন্তু তারপরও তারা কি করে দায়িত্বজ্ঞানহীনের মত বন্দুকের গুলিতে স্বাধীনমত প্রকাশের মুখে কুলুপ এঁটে দিতে পারে? জানি না বাবা, এ কি ধরনের দ্বিচারিতা!
 দুঃখের হলেও একথা সর্বজনস্বীকৃত যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কিংবা শিবসেনারা শাসকদলের মদতপুষ্ট এবং তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাথী। কিন্তু এইসব সাথীদের অত্যাচারে এদেশে এখন তো সুস্থভাবে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। এমনই ভয়ঙ্কর এবং বিপজ্জনক এই দল যে তারা তাদের সংগঠনের বন্ধু শাসকদলকেও কোন তোয়াক্কা করে না! তাদের কথা না শোনার ফল কুলকার্নিকে ভুগতে হয়েছে। ভারতের মুখে কালির ছিটে পড়েছে তাতে। পরিস্থিতি যখন এতটাই ভয়ঙ্কর, তখন আমাদের মত সাধারণ মানুষ যে এদের কাছে কতটা অসহায় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সাধারণ মানুষের কাছে আর যাই থাক না থাক, ভোটটা আছে – এটাই বাঁচোয়া। কিন্তু যে শিবসেনা তাদের ভাবগত বন্ধু শাসককেও পাত্তা দেয় না, (কুলকার্নিকাণ্ডে যা প্রমাণিত) তাদের নিয়ন্ত্রণে আনাটাই বোধহয় শাসকদলের উচিত কাজ হবে। নইলে এ যে একটা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম দিতে চলেছে। এটা ভাববার বিষয় বৈ কি! এটা প্রতিবাদ করবার বিষয় বৈ কি! আর তাই তো ঠিক সময়ে সাবধান বাণী শোনাচ্ছেন, সাহিত্যিকরা, কেবলমাত্র এঁদের কাছ থেকেই এই ব্যবহার আশা করা যায়। কারণ আমরা চিন্তা করতে পারি কালকের কথা, কিন্তু এঁরা যে পারেন আগামী বছরের কথা। তাই দেশের এই দুর্দিনে এই লেখক/সাহিত্যিকরাই যদি না এগিয়ে আসেন, আমাদের কালো ভবিষ্যতকে চোখে আঙুল দিয়ে না দেখিয়ে দেন, তাহলে আসবে কারা? এই দৃষ্টিকোণ থেকে এঁদের ব্যবহার কাঙ্খিত। অতএব এঁদের এই কারণে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট না করাই ভাল। আবার, এই পুরস্কার ত্যাগের মধ্য দিয়ে এঁরা শুধু এঁদের প্রতিবাদটুকুই করছেন না, বরং দেশের ভবিষ্যত সম্পর্কে প্রশ্ন করবার একটা অবকাশ এঁরা সাধারণ মানুষের মনে তৈরি করে দিচ্ছেন। এটাই তো জনগণের প্রকৃত সেবা। লেখককুল আমাদের দৃষ্টি খুলে দিয়েছেন। তাঁরা পথ দেখাচ্ছেন আমাদের – কোন পথে আমরা চলতে পারি। কিভাবে আমরা শাসকদলের হিন্দু তোষণ আর ভেদবুদ্ধিতে প্ররোচনার বিরুদ্ধে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারি। কিভাবে আমরা সমস্ত রকম অপপ্রচার বুজরুকির মুখোশ খুলে দিতে পারি।
সেই পথ হল একটাই – সম্মিলিত প্রতিবাদ।
তবু লেখকদের যেন আরো একটা দায় থেকে যায়। আসলে তাঁরা তো লেখক, সাহিত্যিক – তাই তাঁদের কাছ থেকে আমাদের চাওয়াটাও আরো বেশি। একথা মানি যে, প্রতিবাদ করবার জন্য পুরস্কার ত্যাগ ছাড়া দ্বিতীয় কোন রাস্তাই তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সামনে ছিল নাকিন্তু পরবর্তীদিনে তাঁরা যেন এই ইস্যুটাকে কেন্দ্র করে কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেন। যা ভবিষ্যতে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রাক্কালেই আমাদের সতর্ক করে দিতে পারে। মনে রাখতে সাহায্য করে, আজকের দিনগুলির এই বিষময় জ্বালাকে। তবেই প্রতিবাদ সার্থক হবে। আর আমার মনে হয়, প্রতিবাদের এর চেয়ে শক্তিশালী উপায়, আর এর থেকে কার্যকরী পন্থাও লেখকদের কাছে আর দ্বিতীয়টি নেই। 

প্রশ্নটা সেই থেকেই গেল



ট্রেনে যেতে যেতে শুনছিলাম, পকেটমারের কাহিনী। এক পকেটমার কিভাবে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে আর তারপর তার ভাগ্যে কি পরিমাণ গণধোলাই পড়ে – তারই ইতিহাস। ওরা বলছিল, যেভাবে ট্রেনের লোকগুলো চোরটাকে মেরেছে তাতে আমরাও নাকি মরে যেতাম। মাটিতে ফেলে ওকে প্রায় আধঘণ্টা পিটিয়েছে। শুনছিলাম আর মনে মনে কেবল ভাবছিলাম একটাই কথা, এই পকেটমার, যে হয়ত নিজের একদিনের গরিবি ঘোচাতে দশ বিশ টাকা চুরি করেছিল, তাকে একলা পেয়ে যত সব বীরপুঙ্গবরা কতই না সাহসিকতার পরিচয় দেখাচ্ছে। আর যখন দেশের বড় বড় রাষ্ট্রনায়করা নিজের দেশটাকেই কর্পোরেটের হাতে বিক্রি করে দেয় তখন কোথায় থাকে এদের বীরত্ব? বরং তারা তো আবার সেই নেতাগুলোকেই ভোট দেয়, যারা দেশের সবথেকে বড় সর্বনাশ করে চলেছে। পাড়ায় ছিঁচকে চোর যখন চুরি করে তখন তাদের গায়ে হাত তুলতে তথাকথিত ভদ্দরনোকেদের এতটুকু বাধে না, অথচ মোদি যখন বিহারে ভাষণ দিতে দিতে উদার হস্তে কোটি কোটি টাকা বিলি করবার (যেন ওর বাপের টাকা!) তথাকথিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায়, তখন সেই সাধু লোকগুলোই কিন্তু তাকে ভোট দিয়ে জেতায়। প্রচারের ফলে নেতামন্ত্রীরা আজ গদিতে, আর চোর বেচারি শুধু ‘চোর’ হওয়ার কারণে, আমাদের ভদ্রজনোচিত ধারণার আয়ত্তের বাইরে যাওয়ার কারণে, দরিদ্র আর তার ফলে অসহায় হওয়ার কারণে মাটিতে পড়ে মার খায়। পরে জেনেছিলাম, ঐ চোরটার কাছে কিন্তু কোন চৌর্য দ্রব্যই পাওয়া যায়নি। এটাই হল আমাদের সভ্যতার মজা!
শুনছি, টিটাগড়ের লোকগুলোই নাকি এইসব অপরাধ প্রবৃত্তির সাথে যুক্ত, আর তাই এই অঞ্চলটাই চোরের জন্ম দেয়। আর দেখুন কি আশ্চর্য, সেই টিটাগড়ে যখন একের পর এক মিল বন্ধ হতে থাকে, তখন কিন্তু কেউ ফিরেও দেখে না। শোরগোল ফেরা তো দূরস্থ। এমনকী খবরের কাগজে এ নিয়ে দু-একটা ছোটখাট প্রতিবেদন বেরোনোর সম্ভাবনাও খুব কম। আবার, মিল বন্ধের জেরে তারা বনধ করলে ভদ্রলোকেদের অসুবিধা হয় – তাই পুলিশ তাদের প্রতিবাদের এই ন্যুনতম পথটুকুও বন্ধ করে দেয়। আরো অবাক হয়ে ভাবি, এইসব ছিঁচকে চোরের গল্প, পকেটমারের গল্প আমি ট্রেনেবাসে অনেক শুনেছি। কিন্তু কোথাও শুনিনি এদের তৈরি হওয়ার গল্প। কোন এক রূপকথায় পড়েছিলাম, এদের নাকি কোন স্কুলে পড়ানো হয়, সেখান থেকেই এরা চুরিবিদ্যা শেখে। হাঃ হাঃ। সে কথা রূপকথার বইতেই বন্দী থাক। কোথায় কোন বিহারে বাস্তবেও বোধহয় পাওয়া গেছিল এমনিই একটা স্কুল।
সংখ্যাগরিষ্ঠ চোরদের তৈরি হওয়ার কথা তা সত্ত্বেও কিন্তু আমাদের অনজরেই থেকে যায়। হয়ত আমরা তা ভেবেও দেখি না। এই তো গতকাল শুনছিলাম নৈহাটির হুকুমচাঁদ জুটমিল বন্ধ হয়ে গেল। দুহাজার কর্মী এতে বেকার হয়ে পড়ল। আপনারা সে খবর পাননি হয়ত। পাওয়ার কথাও নয়। দু-একটা খবরের কাগজে এ খবরটা ঠাঁই পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাও কোণেখাঁজে কোথায় যে লুকিয়ে আছে, তা খুঁজে পাওয়াও অনেক কষ্টের কথা। মাত্র দুহাজার সাধারণ মানুষের জীবন তোতা নিয়ে আর কে ভাবে? দেশে একশো কুড়ি কোটি লোক। তাই ওদের কথা আমাদের মনে না করলেও চলবে। ফ্লিপকার্ট পুজোয় কোটি টাকা লাভ করবে, সে খবর আপনারা নিশ্চয়ই পড়েছেন। পড়ারই কথা, ফ্লিপকার্টে, অ্যামাজনে কেনাকাটিও শুরু করে দিয়েছেন নিশ্চয়ই। পুজোতে ছেলেমেয়েকে, আত্মীয়স্বজনকে গিফট দিতে হবে যে!
দুঃখ তো তাদের, পুজোর ঠিক আগে যাদের কপালে এই মারণকোপ জুটল। অনিশ্চয়তা তাদের এখন নিত্যসঙ্গী। আমি ভাবি, তাদেরও তো পরিবার আছে, আত্মীয়স্বজন আছে। তাদের ওরা কি উপহার দেবে? আমি জানি আপনারা আমার কথা শুনে হাসছেন। ভাবছেন, আমি পাগলের মত এইসব কথা লিখছি কেন? কি আসে যায় আমার ওদের নিয়ে? এই এখন এই পুজোর মরসুমে এইসব বাজে না ভেবে পুজোর আনন্দটাকে নিয়েই বাঁচা ভাল নয় কি? ঠিকই বলেছেন, আর সত্যি কথা বলতে কি এইসব নিয়ে ভাবতাম না আমিও এতদিনকিন্তু কি জানেন তো, গতকাল কাগজে খবরটা পড়েই আমি কিরকম চমকে উঠেছিলাম। আসলে আমার একটা বন্ধু ওখানে কাজ করত তোতাই হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল ওর কথা। ও বেচারি ওখানে ঠিকে শ্রমিকের কাজ পেয়েছিল ওর সাথে ক্লাস ইলেভেনে, ট্যুয়েলভে অনেকদিন পড়েছি। তারপর কি করে একদিন যোগাযোগটা হারিয়ে গেছে। অনেক দিন দেখা হয় না ওর সাথে। কথাও হয় না আর। তাই জানি না এখন ও কেমন আছে? কেমন আছে ওর বৌ আর ছেলে? ওরা কি করবে? জুটমিল বন্ধ হয়ে গেল বলে আন্দোলন করবে? নাঃ, তাহলেই তো রাস্তায় জ্যাম হবে, আমাদের যেতে অসুবিধা হবে। তাহলে বনধ? নাঃ, বনধ কালচারও উঠে গেছে। আমাদের এখানে এখন কর্মসংস্কৃতি উন্নত হচ্ছে যেতাহলে আর কি উপায় আছে? এক অভাবে সংসার চালানো ছাড়া? আর এই অভাবের তাড়নায় ও-ও যদি একদিন এই চুরির রাস্তা বেছে নেয়? ধরা যাক, নিতান্তই দায়ে পড়েই নিল? আর সে যদি আমার বাড়িতেই একদিন আসে চুরি করতে? তখন আমি কি করব? কোন পক্ষে যাব? বন্ধু বলে বিলিয়ে দেব আমার সম্পত্তি? নাকি, ভদ্রলোকের মত রাস্তায় বের করে ওকে মাটিতে ফেলে পেটাব? ঠিক বুঝতে পারছি না। একটা সমাধান চাই।