পৃষ্ঠাসমূহ

শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৩

তফাৎ

বর্ধমান লোকাল থেকে লাফ দিয়ে নেমে পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে দৌড়তেই অমিয় দেখে ট্রেনের শেষটুকু প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে 'ধুস শালা' - বলে একটা শ্বাস ছাড়ে অমিয় ছেলের জ্বর হয়েছে বলে অফিস থেকে একটু আগে বেরিয়েছিল আজ কিন্তু এই বর্ধমান লোকালটা এমন লেট করে ব্যাণ্ডেলে ঢোকে যে নৈহাটি যাওয়ার ট্রেনটা প্রতিদিন বেরিয়ে যায় এরপরের ট্রেনের জন্য আবার চল্লিশ মিনিট বসে থাকো মনে মনে বিরক্ত হয়ে ওঠে অমিয় ছেলেটা কেমন আছে জানতে বাড়িতে ফোন করে সে চারিদিকে হকারের চেঁচামেচি, অন্যসব ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট, প্যাসেঞ্জারের হৈ-হট্টগোলে চারিদিক মাতোয়ারা। অমিয়র মতো এই লাইনের ডেলি প্যাসেঞ্জারেরা মনে করে রেলের এসব ঠিক করা থাকে। একটা ট্রেন এরকম লেট করে ঢুকলে প্যাসেঞ্জারগুলো বেশ কিছুক্ষণ স্টেশনে বসে থাকবে। হকারদের থেকে কিছু কিনে খাবে সে চা-ই হোক কিংবা ফলপাকড়। তাতে হকারদের লাভ বাড়বে। তাই তারা ইচ্ছা করে লেটে ট্রেন ঢোকায়। আর এ নিয়ে হকারদের সাথে রেলের লোকেদের দীর্ঘদিনের গাঁটছড়া বাঁধা আছে। অন্তত অমিয় তাই মনে করে। সত্যি কি বিজনেস। বাড়ি থেকে খবর আসে তার ছেলে পিন্টুর সকাল থেকে একবারই জ্বর এসেছে। এখন সে ঘুমোচ্ছে। একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অমিয়। যাক জ্বরটা তাও বাড়েনি। তিনদিন ধরে জ্বরে ভুগছে ছেলেটা। বাড়িতে গিয়েই ওকে ডাক্তার দেখাতে হবে। আজ ডাক্তার না পাওয়া গেলে কাল দরকার হলে অফিসে ছুটি নিতে হবে। কথাগুলো মনে মনে বলতে বলতে অমিয় সামনের বেঞ্চিটাতে বসে। ব্যাগ থেকে আনন্দবাজার বের করে হেডলাইনসগুলোর ওপর দিয়ে চোখ বোলাতে থাকে। কাগজে বেশ মগ্ন হয়ে গেছিল সে। জয় কালিয়ার বিখ্যাত মাছরাঙা এয়ারলাইনস ঋণের দায়ে বন্ধ হয়ে গেছে, নরোত্তমকে ২০১৪র ভোটে প্রধানমন্ত্রী করা হবে কি না সে নিয়ে জলঘোলা চলছে, শচীন্দ্রনাথ টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেবেন কি না কেউ বুঝতে পারছে না ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎই কাগজে একটা টোকা। ওপর থেকে পাখিতে ইয়ে করল কিনা দেখতে গিয়ে মুখ তোলে অমিয়। তাকাতেই দেখে তার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ক্লাস টেনে ফেলে আসা ক্লাসমেট রাজেশ। বয়স একই হলেও চল্লিশের গোড়ায় অমিয়র মতো রাজেশের মাথা জোড়া টাক নেই। আছে যেটা, ঘন কাঁচাপাকা চুল। ক্লিন শেভ করা চকচকে গোলগাল মুখ। কানে হেডফোন, হাতে মোবাইল। কি খবর? প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর বাদে দেখা, চিনতে পারিস? একই স্কুলে পড়লেও রাজেশের পূর্বসূরিরা সব বিহারের বাসিন্দা। তবে ওর জন্ম এখানেই। কিন্তু এখন আর এখানে থাকে না। উচ্চমাধ্যমিকের পরই বিজনেস করতে বন্ধুরা মিলে গুজরাটে পাড়ি দেয়। তারপর অনেকদিন রাজেশের সাথে অমিয়র যোগাযোগও ছিল। কিন্তু আজ রাজেশকে এভাবে এখানে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় সে। একগাল হেসে উল্লসিত হয়ে বলে, আরে রাজা যে! হঠাৎ এখানে? কি ব্যাপার? অমিয়কে শেষ করতে না দিয়েই রাজেশ ওকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি শুরু করে। রাজেশ বলে, এই তো। বাড়িয়ে এসেছিলাম। মা-বাবা রয়েছে তো এখানেই। ভাইয়েরা সব আছে। তোর খবর কি? অমিয় বলে, আমি তো এখন ইউকো ব্যাঙ্কে আছি। দেবীপুর ব্রাঞ্চে। তুই তো শুনলাম গুজরাটে গিয়েছিলি। বিজনেস কেমন চলছে? রাজেশ জানায়, চলছে সব ঠিকঠাক। ওখানেই তো আছি এখন। তারপর হিন্দুস্থান লিভারের একটা নতুন ডিলারশিপ নিয়েছি ওখানে। অমিয় মুচকি হেসে বলে, তোর বাংলা শুনলে মনে হবে না যে তুই বাঙালী নস। এতদিন পর এসেও সাচ্চা বাঙালীর মত কথা বলিস। রাজেশ মৃদু হেসে ছোট্ট করে বলে, ওটা এসে যায়। অমিয় জিজ্ঞেস করে, তারপর, তোর পারফিউমের বিজনেস কেমন চলছে? ওটার জন্যেই তো গুজরাটে গেছিলি। রাজেশ ক্যাজুয়ালি হেসে বলে, ওটা তো আছেই। তারপর কত কিছু হল। সাবানের বিজনেস খুললাম, সামনে একটা রঙয়ের বিজনেস খোলার ইচ্ছে আছে। তারপর স্টেশনটার দিকে একটু উঁকি মেরে বলে, চ, ট্রেন আসছে। অমিয় দেখে ট্রেনের আলো। স্টেশনের সামনেটায় লাইন দিয়ে লোকের ভিড়। বেশীরভাগই অফিসফেরৎ যাত্রী। ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে ঢুকতে একবার জোর গলায় ‘পঁ’ করে চীৎকার করে ওঠে।
ট্রেনে উঠে আরামসে বসারও সিট পেয়ে গেল ওরা। অমিয় বলে, তোর বাড়ির খবর কি? রাজেশ বলে, চলছে সব ঠিকঠাক। রাজেশও ওর বাড়ির খবর নেয়। তারপর কথায় কথায় অমিয় বলে, জানিস তো, তোকে দেখলেই আমার বিজনেস করার ইচ্ছাটা আবার জেগে ওঠে। ছোটবেলায় বড়ো সাধ ছিল, বুঝলি, একটা বিজনেস খুলব। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠোঁটটাকে উল্টে সে বলে, সে আর হল না। রাজেশ ফিক করে হেসে বলে, এখনও তো খুলতে পারিস। এর কি কোন বয়স আছে? অমিয় কথাটাকে ঝেড়ে ফেলে বলে, আরে ধুর! এখন এই সংসার আর চাকরির মধ্যে কি আর সেসব হয়? কিছুক্ষণ ওরা চুপচাপ। ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে করছে। চারিদিকের ক্যাঁচরম্যাচর আওয়াজ, আর তখন থেকে কার মোবাইলে যেন হয়ে চলেছে, হাম তেরে বিন। গার্ডের হর্ন দেওয়ার আওয়াজ আসে। অমিয় বলে, তবে, তোর সাথে আরো ক’টা দিন কাটালে আমিও হয়তো তোর মতোই ব্যবসা-ট্যাবসা শুরু করে দিতাম। চাকরিতে হাজার হোক একটা একঘেয়েমি আছে। রাজেশ একটু বিজ্ঞের মত করে বলে, ব্যবসার আসল কথাটা কি জানিস? অমিয় নিরুত্তর। রাজেশ বলে, প্রফিট। আর প্রফিট বাড়াতে তোর মেন যে জিনিস দরকার তা হল অ্যাডভারটাইসমেন্ট আর ইনোভেশন। অমিয় বলে, আর কোয়ালিটি? রাজেশ চটজলদি বলে ওঠে, আরে রাখ তোর কোয়ালিটি। ওসব পরের কথা। আগে অ্যাড না দিলে লোকে তোর প্রোডাক্ট কিনবে কেন? অ্যাডটাই তোর প্রোডাক্ট আইডেন্টিটি। বুঝলি? অমিয় ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবে। পাশ দিয়ে একটা লজেন্সওয়ালা কড়কড়ে গলায় চেঁচাতে থাকে, ভাল লজেন্স আছে নিয়ে যান। বলতে বলতে সে অমিয়র সামনে লাল আর সবুজ রঙয়ের তিন-চারটে লজেন্স বাড়িয়ে ধরে। অমিয় মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই হকারটাকে দেখলেই অমিয়র বিরক্তি লাগে। ক’দিন আগেই এই লোকটা বলছিল ওর ছেলের নাকি খুব অসুখ। কিছু সাহায্য চাই। আর আজ দেখো। দেখে মনেই হচ্ছে না ওর মনে কোন দুশ্চিন্তা আছে। শালারা সব মিথ্যুক। অমিয় ভাবে, ঠিকই করেছিল সে ওকে সেদিন সাহায্য না করে। সে চলে যেতেই রাজেশ তার আগের কথার খেই ধরে বলে, তবে একটা ব্যাপার ঠিক। এক-একজনের অ্যাডভারটাইসমেন্ট করার স্টাইল এক এক রকমের। কেউ অ্যাড দেয় টিভিতে, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায়, কেউ বা এই হকারের মত গলার ভয়েসে। কিন্তু সবারই একটাই কথা, প্রফিট। প্রফিট কমলেই তাই আমাদের মাথায় হাত। অমিয় বলে, হ্যাঁ, এই তো আজকের কাগজেই পড়লাম, জয় কালিয়ার এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেছে। রাজেশ বলে, তাহলেই বোঝ। লোকটার মাথায় এখন কত চাপ। অমিয় বলে, এই মন্দাতেই তো কত কোম্পানি উঠে যাচ্ছে। রাজেশ বলে, সে তো হচ্ছেই। একটা কোম্পানি চালানো যেমন বিরাট ব্যাপার, তেমনি মার্কেটে লস খেলে মালিক একেবারে শেষ। তুই কি ভাবিস, এই অনিল-মুকেশ আম্বানিদেরও কি কম চাপ নাকি? একবার কোম্পানি পিছোতে শুরু করলেই হয়েছে। অমিয় বলে, হ্যাঁ, তখন সব দায় গিয়ে মালিকের ওপরেই পড়বে।
হঠাৎই হইহই চীৎকার। চেন টানলো যেন কেউ। অমিয় গল্পে মজে এতক্ষণ খেয়ালই করেনি কখন ব্যাণ্ডেল থেকে ট্রেন ছেড়ে দুটো স্টেশন পেরিয়ে এবার নৈহাটি ঢুকছে। কিন্তু এত হৈ-চৈ কিসের? নৈহাটি ঢুকতে তো অনেকটা বাকি। ট্রেনটা যেখানে দাঁড়িয়েছে তার দুদিকে বড় বড় দুটো বিল। অমিয় দেখে ট্রেন থেকে কেউ কেউ লাফ মেরে নেমে পড়ছে। কেউ দরজা দিয়ে, কেউ বা জানলা দিয়ে সামনের কামরার দিকে তাকাচ্ছে। কেউ বা আবার অমিয়র মতোই হতভম্ব। অমিয় উঠে দেখতে যায় কি হল। একজন জানায়, সামনের কামরা থেকে একজন হকার গাড়ি থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। অমিয় আশ্চর্য হয়ে বলে, কেন? লোকটা বলে, মনে হয় সুইসাইড করতে গেছিল। অমিয় পরে তার সহযাত্রীদের কাছ থেকে জানতে পারল, যে লজেন্সওয়ালা কিছুক্ষণ আগে তাদের সামনে বিক্রি করছিল, ঝাঁপটা সেই দিয়েছে। আসলে সেদিন ওর একটাও লজেন্স বিক্রি হয়নি। আগের দিনেও না। বাড়িতে তার ছেলের অসুখ। সংসার চালাবার সামর্থ্যও হয়তো তার আর নেই। অমিয়র মনে পড়ল, লোকটা তার কাছ থেকে সেদিন সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু মিথ্যে কথা ভেবে তার কথায় সেদিন কেউই তাকে পাত্তা দেয়নি। অমিয় ভাবে, তার নিজের ছেলেরও তো অসুখ। কেউ কেউ বলতে লাগল, আর ভেবে কি হবে বলুন? যা যুগ পড়েছে। সবাই হয়তো ভাবল, সত্যিই তো আর ভেবে কি হবে। তার থেকে নিজের কাজে মন দেওয়াই ভাল। কিন্তু আজ অমিয়র সেসব মনে হল না। বরং তার একটা আক্ষেপ হতে লাগল। মন বারবার বলতে লাগল, একবার দেখে আসে লোকটাকে। সে দৌড়ে যায় ট্রেনের দরজার কাছে। সামনের কামরার কাছে বেশ কিছু লোকের জটলা। জানা গেল, লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে অমিয়র আর দেখা হল না। সে ভাবতে লাগল লোকটার কথা। চোখটা সরু হয়ে গেল তার। কোন এক অজানিত জীবনের হতভাগ্য ছবি সে দেখবার চেষ্টা করলো। কিন্তু সবটাই তার কাছে খুব অস্পষ্ট। রাজেশের গলার স্বরে তার সম্বিৎ ফেরে। রাজেশ ক্যাজুয়ালি একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কি রে! কি ভাবছিস? আরে ও আদমি তো পাগল হ্যায়। ইতনা কিঁউ সোঁচতে হো? রাজেশের কথায় অবাক হয়ে যায় অমিয়। ভাষাটার মত রাজেশও যেন অমিয়র থেকে আলাদা হয়ে যায় মুহুর্তে।

পরের দিনের খবরের কাগজের পাতা ওল্টাতেই বেশ চমকপ্রদ একটা খবরে অমিয়র চোখ আটকে যায়। সামনের পাতায় বড় বড় হেডিংয়ে লেখা, জয় কালিয়া তিরুপতি মন্দিরে পাঁচ কেজি সোনা দান করেছে। পাশে জয় কালিয়ার হাসিমুখের ছবিও ছিল।   

কোন মন্তব্য নেই: