বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২০

হঠাৎ একদিন

হাওড়া-মালদা টাউন এক্সপ্রেস। কোচ নং এস সিক্স। আগে থেকেই স্টেশনের চা-ওলাকে জিগ্যেস করে জেনে নিয়েছিলাম কোচটা কোথায় পড়ে, তাই ব্যাণ্ডেল থেকে উঠতে হলেও অসুবিধা হয়নি। আমার বার্থ নং ছিল ৩৩সেখানে যেতেই চমকে উঠলাম। আমার সিটের উল্টোদিকে বসে রয়েছে সবুজ সালোয়ার পরা এক মহিলা। কি বীভৎস তার মুখ! মুখের একপাশটা একেবারে পুড়ে গেছে। কপালের ডানপাশ, ডানচোখ আর ডানগালের কিছু অংশ থেকে চামড়া আলাদা হয়ে গেছে, যেন মুখের ঐ পাশটা দেহের কোন অংশই নয়। মহিলার শরীর সামান্য হলেও মোটার দিকে আর কিছুটা ভারীসারীও। তাই মুখটাও ভরাট আর গোলগালকিন্তু তার ওপর ওই কদর্য ছাপ তাঁকে একেবারে ঘৃণিতে পরিণত করেছে।

     আর আমার কপালটাও এমনি মন্দ যে এই বিচ্ছিরি একটা কদাকারের সামনের সিটটাই হল আমার। কিন্তু ওঁর সাথে তো কাউকে দেখছি না। পরক্ষণেই মনে হল, হয়ত আছে, ট্রেন ছাড়েনি, এই সময় স্টেশনে নেমেছে। এইসব মনে মনে ভাবছিলাম আর বার বার আমার চোখ চলে যাচ্ছিল ওই বিতৃষ্ণিত নৃশংস মুখটার দিকে। আর যত বার তা যাচ্ছিল, ঘেন্নায় আবার তা ফিরেও আসছিলখেয়াল করলাম, ভদ্রমহিলাও আমার দিকেই তাকাচ্ছেনঅসন্তুষ্ট হচ্ছে মনে করে আমি জোর করে ওনার দিক থেকে আমার অবাধ্য দুটো চোখকে সরিয়ে আনলাম।

     আমার ব্যাগটা একটু দেখবেন, আমি এক্ষুণি আসছিনারীকণ্ঠে চমক লাগল আমার। সামনের ঐ মহিলাই। উত্তরে আমার মুখ থেকে মৃদু একটা হাসি আর বোকাবোকা ঘাড় বেঁকানো সম্মতি জানানো বৈ তো কিছু বেরোল না। উনি তাতে কতদূর আস্বস্ত হলেন জানি না। ওনার সাথে থাকা ঢাউস ব্যাগটাকে সেখানেই রেখে কোথায় চলে গেলেনআর এই মূহুর্তেই আমি খেয়াল করলাম গাড়ি গড়াতে শুরু করেছে, মন্থর গতিতে। সহসা একটা ব্যাপার আমার মাথায় খেলল, ‘আচ্ছা, ব্যাগ যখন একটা, তখন তার মালিকও নিশ্চয়ই একটা। তার মানে, মালকিন কি একাই এসেছেন? নিজের মধ্যে অযথা একটা উদ্বেগ টের পেলাম। ট্রেনের এই দিকটায় কেউ নেই। এটা রাতের ট্রেন, এমনকিছু দূরপাল্লার গাড়িও নয়। আর এটা বেড়াতে যাওয়ার সময়ও না হওয়ায় গাড়ি প্রায় ফাঁকা। অবশ্য আমিও এসব জেনেশুনেই ট্রেনে বেছে টিকিট কেটেছিলাম। ভিড় এড়াতে চেয়েছিলাম তখন। কিন্তু এখন যা দেখছি তাতে তো মনে হচ্ছে কাজটা মোটেই বিবেচকের মত হয়নি। এ মহিলা যদি একা আসেন, আর যদি রাত্তিরে শোন সত্যি বলছি, বার্থ আলাদা হলেও অস্বস্তি আমার হবেই। আর ঐ বীভৎস রূপ। ওফ্‌, ওতে তো আরো ঘেন্না করবে। কেন যে এত ফাঁকা ট্রেন বেছেছিলাম, এখন আফশোস হয়।

খানিকক্ষণ পর মহিলা সিটে এলেনআর আমিও এখন থেকে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করতে শুরু করলাম। আসলে, যতই অশোভন হোক না কেন, কুতুহলী চোখ বারবার তাকাতে তাকাতে ওর মুখের প্রতি কিছুটা হলেও ধাতস্থ হতে শুরু করেছে। হোক না বীভৎস, পুড়েছে তো একটা পাশ। মুখের অন্য অংশ তো স্বাভাবিক। যদিও রঙ চাপা, তবুও ডানদিকটা ভাল হলে দেখতে একেবারে মন্দ হয়ত হত না। আমি বলে ফেললাম, ‘কতদূরে যাবেন আপনি?’

     উনি একবার আমার দিকে তাকালেন, তারপর অন্যপাশে ফিরে উত্তর করলেন, ‘মালদাখুব অস্পষ্ট উচ্চারণআমি বুঝলাম ওর কথা বলার মধ্যে একটা দায়সারা ভাব আছে। তবুও একসাথে যাচ্ছি, কেমন সঙ্গীর সাথে রাতটা কাটবে এই ভাবনার তাড়নাতেই নিজেকে থামাতে পারলাম না আমি। প্রশ্ন করলাম, আপনার সাথে বুঝি কেউ আসেননি?’ উনি এবার কিছুটা অসন্তুষ্ট, বলে উঠলেন, ‘কেন কেউ সঙ্গে না এলে কি একা বাইরে বেরোতে পারি না?’ আমি ওর এমন সটান জবাবে বেশ আশ্চর্যান্বিত হলাম। আমতা আমতা করে বললাম, ‘না, তা পারবেন না কেন? আসলে এত দূরের, ওভারনাইট জার্নি তো কেউ সাধারণত একা একা করে না, তাই...

     -      কিন্তু আপনিও তো দেখছি একা। তাহলে? – ওনার আবার সটান প্রশ্ন।

আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লাম। বললাম, ‘আমার মত জীবন কারুর হোক তা আমি যেমন চাই না, তেমনটা কারুর থেকে আশাও করি না। আমার কথা ছাড়ুন। আমি তো একটা ব্যতিক্রম।আমার কথাগুলো একটা দীর্ঘায়িত দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল।

উনি কি বুঝলেন জানি না। বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘আসলে কালকে খবর পাই, মালদায় আমার এক কাকা হঠাৎই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেবয়সও অনেক। তাই তাকে দেখতেই যাচ্ছি। তড়িঘড়ি সব ব্যবস্থা করতে হয়েছে, তাই ফ্যামিলির অন্য কেউই যেতে পারেনি।

-              কাকাকে নিয়ে উদ্বেগ বুঝি কেবল আপনার একার?’ আমি একটা খোঁচা দিলাম।

-              হয়ত তাই। আর কে আছে ভাববার?

আমি বললাম, ‘কেন, আপনার স্বামী?

উনি একটা বাঁকা হাসি হেসে বলেন, তাহলেই হয়েছে আর কি।

আমি কিছু একটা বলতে গিয়েও আটকে গেলাম। ওনার পরিবার, ওনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি আর নাক গলাতে চাইলাম না। কিন্তু আমার যে এতে কোনরকম কৌতুহল ছিল না তাও নয়। কিন্তু পাছে আমারও ব্যক্তিগত ব্যাপারও কথাপ্রসঙ্গে বেরিয়ে পড়ে, আমার কোন দূর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়, আমি আর এগোলাম না। ওনার সাথে তো শুধু এই ট্রেনের দেখাটুকু। ব্যস, তারপরে কে কার?

কিন্তু উনি দেখলাম নিজে থেকেই বলতে শুরু করলেন, ‘জানেন, একটা স্বপ্ন ছিল। নিজের মত করে বাঁচব। স্বামী, ছেলে থাকুক তাদের জন্য করেও নিজের কিছু কিছু ইচ্ছা, খেয়ালী শখ মেটাব। ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াব, শপিং করব, বাইরে বন্ধুদের সাথে... বলতে বলতে উনি দেখলাম বাচ্চাদের মত খিলখিল করে হেসে উঠলেন। তারপর বেশ গম্ভীর হয়ে উঠলেন, ‘কিন্তু কিচ্ছু হল না

আমি বলি, ‘কেন? আপনার কি স্বামী নেই?’

উনি আবার আগের মত বাঁকা হাসি হাসলেন, ‘থাকবে না কেন?’ তারপর মুখের ডানদিকটা দেখিয়ে বললেন, ‘না থাকলে, এমনটা হল কি করে?’

কথাটা আমায় যেন সপাটে একটা চড় মেরে গেল। আমি ভাবতেও পারিনি এমন উত্তরটা আমায় পেতে হবে। উত্তেজিত হয়ে বললাম, ‘কিন্তু কেন?’

-              রাস্তায় একা বেরিয়েছিলাম বলে, . . . না, ঠিক তা নয়। আসলে প্যান্ট শার্ট পরে বেরিয়েছিলাম। আমার এক বন্ধু আমায় জিন্সের প্যান্ট আর লাল টপ গিফট দিয়েছিল। সেই একদিন আমায় বলল কি, ‘, সাউথ সিটি থেকে কিছু শপিং করে আসিআমিও নাচলাম ওর কথায়। বাড়ির লোক বারণ করেছিল একা একা ওভাবে বেরোতে। কিন্তু আমি ওদের কথা শুনিনি আর কেনই বা যাব না আমি। অন্যায় তো কিছু নেই এতে। বেরিয়ে গেলাম ওর সাথেতারপর কিছুক্ষণ থেমে উনি আবার বললেন, ‘তারপর, বাড়িতে আসতেই ফলটা পেলাম। কি আর বলব? হাঃ হাঃউনি কিছুটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতেই হেসে উঠলেন।

আমার বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। শুধুমাত্র এইটুকু একটা কারণে একজন মানুষের সাথে কেউ এমন আচরণ করতে পারে? পরক্ষণেই মনে হল, আচ্ছা এখন তো উনি দিব্যি একা বেরিয়েছেন। তাতে তো কেউ কিছুই বলল না। রাত্তিরে উনি যে এই একা একা চলেছেন, ওনার স্বামী তাতে রাজীই বা হলেন কি করে?

উনি দেখি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘কি ভাবছেন? এখন একা একা কি করে বেরিয়েছি?’ আমার মনের কথা পড়ার ক্ষমতা দেখে মনে মনে ওনার তারিফ না করে পারলুম না। উনি বললেন, ‘এখন আর ওসব নিয়ে ভাবি না জানেনঅন্য অনেক কিছু রয়েছে ভাববার

আর কোন প্রশ্ন করার মত পরিস্থিতি তখন আমার মনের ছিল না। আমি চুপ করলাম। পরবর্তী কথাটা উনিই বললেন, ‘আপনি কোথায় চলেছেন জানতে পারি?’

আমি মুখে ঈষৎ হাসি টেনে এনে জানালাম, ‘আমি যাচ্ছি এক বন্ধুর বাড়ি। মালদায়দুদিন সেখানে থেকেই ফিরে আসব

-              কি কোন পার্পাসে বুঝি?

-              না, স্রেফ বেড়াতেআমি এখানেই ভুল করে ফেললাম।

-              বেড়াতে? তাহলে একা কেন? বাড়ির কেউ যেতে চায়নি?

আমি সামান্য হাসবার বৃথা চেষ্টা করে মুখ নামিয়ে নিই। তারপর বলি, ‘নাঃ, কেউই আসতে চায়নিতারপরে প্রসঙ্গ পালটে ফেলি, ‘আচ্ছা, এবার আমার খাওয়ার সময় হয়ে গেছে, আপনি খাবেন তো?’

উনি জানান যে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব উনি স্টেশনেই সেরে এসেছেন। এখন আর খাবেন না।

আমি আর সময় নষ্ট না করে ওপরের বার্থে উঠে গেলাম। ব্যাগ হাতড়ে একটা ছোট্ট কৌটোয় দুটো বিস্কুট খুঁজে পেলাম। খিদেটা লেগেছিল জোর। গোগ্রাসে দুটোকেই নিমেষে সাবড়ে দিলাম। জলের বোতলটা সবে ধরেছি, উনি বলে উঠলেন, ‘আপনার স্ত্রী কেমন? আপনাকে সারারাত ট্রেনে কাটাতে হবে জেনেও দুটোর বেশি বিস্কুট দেয়নি?’

আমি খাওয়ায় ব্যস্ত ছিলাম, তাই খেয়াল করিনি। আমার খাওয়ার সময় উনি মন দিয়ে আমাকেই লক্ষ্য করছিলেন। আমায় ওনার কথার উত্তর জোগাতে হয়, ‘আসলে আমার স্ত্রী বাড়িতে নেই, বাপের বাড়ি কোন্নগরে আছে। তাই...’

-              আপনার বুঝি লাভ-ম্যারেজ?

এরকম অবান্তর প্রশ্নে আমার বেশ একটু খটকা লাগল। এই মহিলা তখন থেকে আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে। নিজের কথা যেচে বলেছে, ঠিক আছে, কিন্তু আমার কথা কেন জানতে চাওয়া বাপু? আমি ছোট্ট করে উত্তর করলাম, ‘নাতারপরে, কেন জানি না, আরো জুড়ে দিলাম, ‘তবে তার মানে এই নয় যে আমরা অসুখীকিন্তু কথাটা বলেই মনে হল শেষ কথাটা আলাদা করে বলবার কোন দরকারই ছিল না।

এরপর উনি অদ্ভুতরকম নির্দ্বিধায় বলে উঠলেন, ‘কিন্তু এরকম একটা ছেঁড়াখোঁড়া ব্যাগ দিয়ে, এমন জামাকাপড়ের ছিরি এভাবে আপনার বন্ধুর কাছে নিশ্চয়ই আপনার স্ত্রী যেতে দিল কি করে? বাপের বাড়ি যাওয়ার আগেও অন্তত তার সবরকম গুছিয়ে দেওয়াই উচিত ছিল।

আমি এর বিরুদ্ধে আরও অনেক অজুহাত আনতে পারতাম। কিন্তু অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই আমি হাল ছেড়ে দিলাম। মিথ্যেকে প্রশ্রয় দিয়ে লাভ কি? বললাম, ‘ও তাই বুঝি? কিন্তু আমি আমার বিবাহিত জীবনে সুখী কি অসুখী তা দিয়ে আপনার কি যায় আসে?’

কথাটা শুনে উনি যেন চমকে উঠলেন। তারপর একটু আহতভাবে বললেন, ‘না। এমনিই বলছিলাম আর কি। সরি

-              না না। এতে সরি বলবার কিছু নেই। আমি আপাতত নিজের ফ্যামিলি, ওয়াইফ এসব নিয়ে ভাবতে চাইছি না।

উনি আমার কথার মাঝখান থেকে একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে বলে উঠলেন, ‘জীবনে কাউকে ভালবেসেছিলেন?’

ওনার ঐ কথাটুকুর মধ্যে একটা মোহাবেশ ছিল। যার ছোঁয়াচ লাগল আমার ভেতরেও। টের পেলাম, আমি যেন নিজেকে নিয়ে পিছিয়ে চলেছি আরো পাঁচটা বছর আগে। আমাদের নৈহাটির আর.বি.সি কলেজ, আর ছোট্টখাট্টো গোলগাল চেহারার এক তরুণী। নাম সায়িস্তা মকসুদ।

আমি বললাম, ‘সেরকমই কাউকে মনে পড়ছে

-ভালই যদি বেসেছিলেন, জানাননি কেন তাকে?

কে বলল জানাইনি? সবই তো জানতাম আমরা। শুধু আমরা কেন, গোটা ক্লাসরুম জুড়ে ঢি ঢি পড়ে গিয়েছিল, ছি ছি-কার পড়ে গিয়েছিল। বস্তুত, আমাদের এই সম্পর্কের জের মোটেই ভাল দিকে যায়নি, আমাদের ধর্ম যেহেতু আলাদা। প্রথমে ওর বাড়ি থেকে ওকে ধমকেছিল। শেষের দিকে সেটা এমন জায়গায় পৌছোয় যে ভয়ে ও আমার সাথে দেখাও করতে সাহস করত না। আমাদের কথাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিল। তবু নমাসে ছমাসে যে একবার দুবার দেখা সাক্ষাত হত, সেটা পর্য্যন্ত ভাল চোখে দেখেনি সায়িস্তার বাড়ি থেকেআসলে ওর বাবা ছিল গোঁড়া মুসলমান। সায়িস্তাকে নিয়ে বাড়িতে ওদের অশান্তিও চলছিল খুবআর ওর দুই দাদারও, যতদূর শুনেছি, চরিত্র ভাল না। এদিকে জগদ্দল, যেখানে ওরা থাকত, সেই জায়গাটাও তো খুনী গুণ্ডাদের আখড়া।

যাই হোক, কলেজজীবনটা কাটল যেমন-তেমন। আমি আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে প্রচ্ছন্ন মদতও পেয়েছিলাম সেসময়ে। কিন্তু একটা সময়ে তারাও থামতে বাধ্য হল। আমাদের বাড়িতে  হুমকি চিঠি এল সেদিনএকবার নয়, দুবার। চিঠির বক্তব্য আমাদের এই সম্পর্ক টিকে থাকলে তার পরিণাম ভাল হবে নাঅগত্যা বাবা আমায় একদিন বলেই দিল, ‘শোন, ঐ মেয়েটার সাথে মেলামেশাটা এবার পুরোপুরি বন্ধ কর। যদিও তোকে এ ব্যাপারে বারণ করাটা আমার পক্ষে অনৈতিক। তবুও তোর স্বাধীন ইচ্ছায় বাধ্য হয়েই আমাকে বাধা দিতে হচ্ছে। কারণ আমি চাই না, আমাদের পরিবারের কোন ক্ষতি হোক।

আমার বাবা ছিল ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু সে একা কি করবে? সে বেশিরভাগ সময়ে বাড়িতে থাকে না, অফিসের কাজে থাকে, আমার বোন টিউশন ব্যাচ থেকে রাত করে ফেরেআমি চাই না, আমার কোন কাজের খেসারত তাদের দিতে হয়। নাই বা হল আমার স্বপ্নপূরণ, কিই বা এসে যায় তাতে? কিন্তু এখন মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানেন, সেইদিনই যদি হঠকারীতার বশেও সায়িস্তাকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারতাম, আজ হয়ত তাহলে অনেকটা অন্যরকম হত।

ভদ্রমহিলা আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলেন। এবার উনি মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘কিস্যু অন্যরকম হত না। আপনারা পালাতে পারতেন ভেবেছেন? ওরা আপনাদের ঠিক খুঁজে বের করতই। তারপর আপনি বা আপনার স্ত্রী কেউই বাঁচতেন না অথচ দূর্ভাগ্য এমনই, সেই মেয়েটাই যদি কোন লম্পট স্বামীর হাতে গিয়েও পড়ে, তবে সেটাও তাকে মেনে নিতে হবে। কারণ সে যে মুসলমান আর আপনি হিন্দু কিছুক্ষণ থেমে উনি আবার বললেন, ‘অবশ্য আপনি মুসলিম হলে হয়ত এত অসুবিধা হত না। তারা হিন্দু মেয়ে বিয়ে করলে হয় লাভ জিহাদ। আর মুসলিম মেয়েদের....তাদের বোধহয় কোন ইচ্ছাই থাকতে নেই। তাদের শুধু ঘরের কোণে পড়ে থাকাটাই যেন ভবিতব্য’ 

এরপর একটা দীর্ঘক্ষণ নিস্তব্ধতা। ট্রেনের ঘুমপাড়ানিয়া গান বেজে চলেছে ঝিকির ঝিকির। অন্যান্য কম্পার্টমেন্টের লোকজন এতক্ষণে সব শুয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ জায়গাতেই নাইটল্যাম্প জ্বলছে। শুধু এখানে এক নারী আর এক পুরুষের মন নিজেদের স্মৃতি হাতড়ে চলেছে তাদের না-মেটা কোন তৃষ্ণাকে আলিঙ্গন করতে।

ওনার অ্যাসিডপোরা মুখের দিকে আমার চোখদুটো আবারও চলে গেল। কিন্তু এবার ভারী কষ্ট হল আমার ওকে দেখে। আহা রে! মানুষকে কেউ এভাবে কষ্ট দিতে পারে? তার হাত কাঁপে না?

লক্ষ্য করলাম, উনি আমার দিকে তাকালেন একবার, দুবার। তারপর বললেন, ‘চলুন, শুয়ে পড়ি। রাত অনেক হলআমি ব্যাগটাকে মাথার কাছে রেখে টানটান হয়ে পড়লাম। উনি আলো নিভিয়ে দিলেন।

সারারাত আমার ঘুম এল না। নিজের জন্য চিন্তা ছিল, উদ্বেগ ছিল। তার ওপরে ভদ্রমহিলার কথাও মনে হতে লাগল আমার। ওর জীবন, ওর সংসার আমার ভেতরে একটা অস্পষ্ট ছবি এঁকে দিয়ে যেতে লাগল। নানা চিন্তার রাশি ঘুরে ফিরে এসে এসে মনকে ভারাতুর করে তুলল। তারপর ক্লান্ত চোখদুটো একসময় আপনিই বুজে এল।

*                                         *                                                    *

   মালদা আসতে আর বেশিক্ষণ নেই। উঠবেন না?

আমি চমকে উঠলামধড়ফড় করে উঠে বসলাম সিটের ওপর। সকাল হয়ে গেছে। ঘড়ি বলছে ছটা বেজে পাঁচ মিনিট। ভদ্রমহিলার দিকে চোখ পড়তে দেখলাম জানালা দিয়ে দিন-শুরুর নরম আলো এসে পড়েছে ওর ডানগালে। তিক্ত যন্ত্রণাক্লিষ্ট ক্ষতস্থানটাকে সে যেন তার কমনীয় স্পর্শে সুস্থ করে তুলতে চাইছে। ওর চোখদুটো তখন উদাসী, বাইরে দূরে কোন অনির্দেশ্যের সন্ধানে রত। কই, এখন তো দিনের এই অমল আলোয় মোটেই ওকে আগের মত কুৎসিত দেখাচ্ছে না। বরং সেখানে যে আজ ফুটে উঠেছে সুললিত সৌন্দর্যের এক অপরূপ সুষমা। কেন এই তফাত? তবে কি কাল সন্ধ্যেরাতের অন্ধকার আমার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিল? ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। কালকে যে আমার এই চেহারা দেখেই ঘেন্না লেগেছিল, তার জন্য আজ মনে মনে অনুশোচনা হতে লাগল।

ওপরের বার্থ থেকে নেমে এলাম সিটে। রাতের আলাপনগুলো মনে পড়ল আমার। কাল উনি যেভাবে লাভ জিহাদের প্রসঙ্গ এনেছিলেন, তাতে মনে হল, মুসলিম পুরুষতন্ত্রকে উনি কিছুটা ব্যঙ্গ করতে চেয়েছিলেন। যদিও এটা আমার একটা অনুমান বৈ তো নয়। আমি বললাম, ‘আপনার কি ইসলাম ধর্মের প্রতি কোন বিদ্বেষ আছে?’ তার সাথেই এটাও পরিষ্কার করে দিলাম, ‘মানে, কাল আপনার মুখে ঐ লাভ জিহাদের কথাটা শুনে মনে হচ্ছিল আর কি

     উনি প্রথমে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রূকুটি করলেন। তারপর পূর্বপরিচিত বাঁকা হাসি হেসে বলে উঠলেন, ‘আমার নাম রোশনারা বেগমটের পেলাম ওনার ঐ কথাটা বলার মধ্যে একটা আভিজাত্যমণ্ডিত গর্ববোধ ফুটে উঠল।

     কিন্তু আমার শুনে ভারী অদ্ভুত লাগল। বললাম, ‘তাহলে আপনি আপনার ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বললেন যে?’

-            কোথায় বললাম? যা সত্যি, তাই তো শুধু বলেছি। এর সাথে ধর্মেরই বা সম্পর্ক কি আর বিরুদ্ধাচারণই বা কোথায় হল?’

ওনার গলায় একটা সরল নির্ভীকভাব খুঁজে পেলাম। আমি এ নিয়ে আর এগোবার মত সময়ে পেলাম না। আর বসারও অবকাশ নেই। মালদা টাউন এসে গেছে।

স্টেশনে নেমে রোশনারা আমায় জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি কি এবার গাড়ি ধরবেন?’ আমি চলতে চলতে কতকটা অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলাম, ‘নাঃ, গাড়ি ধরে যেতে হবে না। যেখানে যাচ্ছি, হেঁটেই যেতে পারবএরপর ওর কাছ থেকে মৌখিক বিদায় নিয়ে আমি স্টেশন ছেড়ে রাস্তায় এসে নামলাম। এক পা, দু পা করে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম। কাঁধ থেকে ঝুলছে ছেঁড়া ব্যাগ। মনে হতে লাগল, রোশনারার কথা। কতটুকুই বা দেখা, পরিচয়ই বা মাত্র কতখানি। অথচ  নিজের কথাগুলো কত সহজেই না বলে ফেললাম। এটা কি ঠিক হল? একজন অপরিচিত মানুষের কাছে, এভাবে নিজেকে খুলে দেওয়াটা কি ভাল? কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হল, ‘এ নিয়ে এখন আর ভেবেই বা কি হবে? যাক, যা হয়েছে, তা হয়েছে

     চলতে চলতে লক্ষ্য করলাম, সামনে একটা মোড়। রাস্তাটা সেখানে দুভাগ হয়ে গেছে। একটা চলে গেছে জনবহুল শহর এলাকার দিকে। আর অন্য রাস্তাটা অপেক্ষাকৃত অনুন্নত, গ্রাম্য এলাকার ভেতরে ঢুকেছে। আমি দ্বিতীয় রাস্তাটা বাছলাম। একটানা হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ পার হয়ে এলাম। আশেপাশের দোকানপাট, পাকা ঘর-বাড়ি, মোটরসাইকেল সব কোথায় চলে গেল, এসে পড়লাম দিগন্তবিস্তৃত একটা মাঠের সামনে। রাস্তার দুদিকে মাঠ। মাঠের ওধারে ঘন কালো উঁচু নীচু বন আকাশ আর মাটির সীমানাকে ঘিরে রেখেছে। আমি হাতের ব্যাগটা রাস্তার ওপর ফেলে সেখানেই বসে পড়লাম। আমার সামনে ছোট ছোট ঝোপ, তাতে ছোট ছোট পোকা খেলা করে বেড়াচ্ছে, উড়ে এসে আমার গায়ে বসছে, আমার সেদিকে খেয়াল নেই। বেলা বাড়ছে, রোদের তেজ এসে লাগছে গায়ে, পিঠের ওপর। আমার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। হাওয়াটা আজ কেমন যেন বেখেয়ালে বইছে। দিকভ্রান্তের মত একবার এদিক, একবার ওদিক করে চলেছে। তাতে গাছের পাতাগুলো অসহায়ের মত মর্মর করে উঠছে বারবার। একটা টুনটুনি সুতীক্ষ্ণ স্বরে কাছেই ডেকে চলেছে নিরন্তর। আর আমি ঠায় বসে আছি আমার সামনে একটা বিশাল ও বিরাট শূন্যের দিকে তাকিয়ে।

     হঠাৎ পিঠে এসে লাগে একটা নরম হাতের স্পর্শ। আমি পেছনে তাকিয়ে চমকে উঠি, ‘রোশনারা!’ আমি অবাক বিস্ময়ে চোখে সহস্র প্রশ্নের ভিড় নিয়ে চেয়ে আছি। রোশনারা মুচকি হেসে বললেন, ‘এটাই বুঝি আপনার বন্ধুর বাড়ী?’ ওনার তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গটা আমায় খোঁচা মারল।

     তবু আমি হঠাৎ কোন জবাব জোগাতে পারি না, আমতা আমতা করি, ‘না...মানে ইয়ে। কিন্তু আপনিই বা এখানে কেন? আপনার কাকার বাড়ি কোথায়?

-      আপনার বন্ধুর বাড়ি যেখানে।

-      মানে?

-      আমার মনে হয়, আমরা দুজনেই দুজনকে ঠকিয়েছি। সত্যি করে বল তো, কি করতে এখানে এসেছ?’ ওর এই আপনিথেকে তুমিতে উত্তরণ আমার নজর এড়ায় না।

আমি আর না বলে থাকতে পারি না, ‘জানি না, কি করতে এখানে এসেছি আমিএকটু থেমে আমি আবার বলি, ‘জানো রোশনারা, আমার স্ত্রী আমায় ছেড়ে চলে গেছে

ও চমকে ওঠে, ‘সে কি? কেন?

-      আসলে ও অন্য কাউকে ভালবাসত। সোনার দোকানের সামান্য কর্মচারী আমি, সকাল হতেই বেরিয়ে যাই, ফিরতে ফিরতেও হয়ে যায় অনেক রাত। অনেক দিন তো কাজের চাপে সারা রাতই দোকানে কাটাতে হয়। তাই ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি দর্শনার ভাল লাগা আর আমাতে নেই। তা অন্য কারুর কাছে সে সঁপে দিয়েছেব্যথায় যন্ত্রণায় আমি চুপ করে  গেলাম।

রোশনারা বলে, ‘তারপর?’

-ডিভোর্স। গত সোমবারই আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেল, আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড়াছাড়িও হয়ে গেলমা, বাবা আগেই চলে গেছিল, এখন নিজের বৌও...

- বাচ্চাকাচ্চা নেই?

আমি মাথা নাড়িয়ে জানাই, না। তারপর বলি, ‘এখন ঐ বাড়ির কথা মনে করতে গেলেই আমার কেমন ভয় করে। মনে হয় যেন বাড়িটা আমায় গিলে খেতে আসছে। কেউ নেই একটা কথা বলবার, কেউ নেই বিপদের সময়ে পাশে আসবার, একা, শুধু একা। এভাবে বাঁচা যায়?

      কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। একটা নাম-না-জানা পাখি ট্যা ট্যা করে কাছেই ডেকে চলেছে অবিরত। রোশনারাই প্রথম মুখ খুলল, ‘তাহলে এখানে কি মনে করে আসা হয়েছিল?’

-      জানি না। হয়ত হারিয়ে যেতে। নিজের শহর ছেড়ে, পরিচিতজনেদের ছেড়ে যতদূর পারি চলে এসেছি আমি। আমায় আর কেউ যেন খুঁজে না পায়

-      তাই বলে বাড়ি ছেড়ে চলে এলে? আত্মীয়স্বজনদের কাছে থাকলেও তো পারতে। বিপদের সময়ে তাদের তো পাশে পেতে। তোমার কি বন্ধুবান্ধবও নেই?

-      নেই, সেকথা বলব না। তবে কি জানো তো, এখন সবাই ব্যস্ত। যারা নিজের বাড়ির জন্যই সময় দিতে পারে না, তারা দেখবে আমার মত অকর্মণ্য লোককে?

-      কিন্তু এভাবে বাড়ি ছেড়ে আসাটা তো কোন সমাধান হতে পারে না। এখন কি করবে, কিভাবে বাঁচবে তুমি?

-      যেভাবে হোক, কোন একটা উপায় বের করতেই হবে। তবে আগের জীবনে আর ফিরে যেতে চাইছি না। চাইছি একটা নতুন জীবন পেতে যার সাথে আগের দিনগুলোর কোন যোগ থাকবে না।

কিছুক্ষণ পরিপূর্ণ নিস্তব্ধতা। আমি এরপর বলি, ‘আচ্ছা আমার কথাই তো শুধু শুনলে, এবার তোমার কথা শুনি। তুমিই বা কি করতে এখানে এসেছ?’

      রোশনারা কিছুটা ভাবালুতার মধ্যে থেকে বলে ওঠে, ‘আমারও যে একই অবস্থা। আমিও  বাড়িতে টিকতে পারলাম না। সারাটা দিন ঘরের চৌহদ্দির মধ্যে কাটাই। তবু কি করছি, কেন করছি সমস্ত কিছুর জবাবদিহি করতে হয় আমাকে। যেন আমার কোন স্বাধীন ইচ্ছা থাকতে নেই। প্রতিক্ষেত্রে, প্রতিটা কাজে বাধা, সন্ধানী চোখগুলো যেন সর্বদা আমার ওপর ঘুরঘুর করছে। এটা যেন ওদের স্বাভাবিক অধিকার। যেন আমি ওদের বাড়ির আসবাবপত্রের মতই একটা কেনা বস্তু। আমাকে নিয়ে যেই যাই করুক, কেউ কিছুই বলার নেই। শ্বশুর শ্বাশুড়ী, স্বামী সবাই একআর সব শেষে এই অ্যাসিড মারনিজেকে প্রশ্ন করলাম, ‘এরা আমার কে? ঘরের লোক? এরা যদি আমার ঘরের লোকই হয়, তাহলে আমার সে ঘরে না থাকাই ভাল। তাই সব ছেড়ে, ঘর ছেড়ে, আত্মীয়-পর সবাইকে ছেড়ে পালিয়ে এলাম

      আমি ওর কথাগুলো তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। বললাম, ‘কিন্তু এর জন্য তুমি পুলিশে অভিযোগ জানালে না কেন? তোমার স্বামী যে অপরাধটা করল তার শাস্তি তো সে কিছুই পেল না। বরঞ্চ তুমিই মাঝখান থেকে পালিয়ে এসে এই অপরাধটাকে মেনে নিলে। তাই না?

       কিছুক্ষণ ও থেমে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘কি হত পুলিশে জানালে? বড়জোর একটা কঠিন শাস্তি হত। কয়েক বছরের জেল হত ওর। আমার স্বামীর ওসব ঘোরা আছে। ওর ওতে আলাদা কোন শাস্তি হত না। ও শাস্তি হল এটাতেই। ও ভাবত, আমার ওপরে ওদের সমস্ত অধিকার। তাই আমি নিজে ওদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে চলে এলাম। আমি এটাই চেয়েছিলাম

       আমি একটা প্রশ্ন করলাম, ‘তোমার কি লাভ ম্যারেজ?’

      রোশনারা মৃদু হেসে বলে, ‘ নাঃ, এ আমার লাভ ম্যারেজ হলে নিজেকে আমি কোনদিন ক্ষমা করতে পারতাম না

      আমি ওরই সুরে বলে উঠলাম, ‘জীবনে কাউকে ভালবেসেছিলে?’

      ওর মনের ভেতর তখনই হঠাৎ কোন স্মৃতির উদ্রেক হল কিনা জানি না। তবে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে নজরে এল, মুখটা কষ্টে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে, ওর চোখদুটো সরু হয়ে কোন ফেলে আসা দিন হাতড়ে বেড়াচ্ছে। ও প্রথমে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠল, ‘থাক না, যে পর্ব চুকে গেছে তাকে নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভাল। ওসব চিন্তা ছাড়।

      তারপর খানিক চুপ করে থাকার পর ও-ই মুখ খুলল, ‘খিদে পেয়েছে খুব। তোমার পায়নি?

      আমিও একটু ইতস্তত করে বলে উঠি, ‘হ্যাঁ, তা পেয়েছে। কিন্তু খাব কোথায়?’ একটু ভেবে নিয়ে বলি, ‘আচ্ছা চল, কোন হোটেল থেকে খেয়ে আসি

-      তোমার কাছে টাকা আছে?

-      হ্যাঁ, যা আছে তাতে আপাতত তিন চারদিনের খাওয়া আর থাকার খরচ চলবে। কিন্তু তারপর?

-      তারপর কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

           আমি বললাম, ‘ঠিক বলেছ, একটা কাজ ধরতে হবেতুমি-আমি দুজনেই কাজ করব কেমন?’

           ও প্রথমে মৃদু হাসল, তারপরই গম্ভীর হয়ে গেল বলল, ‘দেখি’।

কোন মন্তব্য নেই: